যুদ্ধে ‘বিজয়’ দাবি ইরানের, ১৪ দফা সমঝোতায় যেসব সুবিধা পেল তারা
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা ও সংঘাতের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ১৪ দফার সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সামনে এসেছে। যদিও এখনো কোনো পক্ষ চুক্তির পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশ করেনি এবং ইরানও আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন সংস্করণের সত্যতা নিশ্চিত করেনি, তবু প্রকাশিত খসড়ার বিভিন্ন ধারা বিশ্লেষণ করে তেহরান এটিকে নিজেদের জন্য বড় কূটনৈতিক ও কৌশলগত সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে। বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞা শিথিল, জব্দ সম্পদ অবমুক্ত, তেল রপ্তানির সুযোগ এবং ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন পরিকল্পনার মতো বিষয়গুলোকে ইরান গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখছে।
বুধবার (১৭ জুন) মার্কিন প্রশাসনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুদ্ধ বন্ধে ইরানের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা স্মারকের ১৪ দফা প্রকাশ করেন। এতে যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা, ইরানের ওপর আরোপিত বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে প্রত্যাহার, জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করা এবং পারমাণবিক অস্ত্র না তৈরির বিষয়ে ইরানের অঙ্গীকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই সমঝোতার শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যকার ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’। চুক্তি জনসমক্ষে প্রকাশ না করায় যে সমালোচনা তৈরি হয়েছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতেই যুক্তরাষ্ট্র খসড়ার বিষয়বস্তু প্রকাশ করেছে বলে জানা গেছে।
ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের দাবি, গত তিন মাসের সংঘাতে দেশটি সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার সক্ষমতা দেখিয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’সহ বিভিন্ন সামরিক অভিযানের মুখেও ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়েনি। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হারানোর পরও দ্রুত নেতৃত্ব পুনর্গঠন এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখাকে তারা নিজেদের বড় সাফল্য হিসেবে দেখছে।
ইরানের মতে, মার্কিন ও ইসরায়েলি অবস্থানের বিরুদ্ধে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে কৌশলগত চাপ সৃষ্টি বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে, যা শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করেছে। একই সঙ্গে পশ্চিমা চাপ সত্ত্বেও নিজেদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত অক্ষুণ্ন রাখাকেও তারা কৌশলগত অর্জন হিসেবে উল্লেখ করছে।
সমঝোতার আওতায় ইরানের জন্য যে সুবিধাগুলোর কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো যুক্তরাষ্ট্রে আটকে থাকা প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ অবমুক্ত করার উদ্যোগ। পাশাপাশি যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কমপক্ষে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের আন্তর্জাতিক সহায়তা পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নৌ অবরোধ প্রত্যাহার শুরু করবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে তা সম্পূর্ণভাবে তুলে নেওয়ার কথা রয়েছে। এর ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হবে।
তেল খাতেও বড় ধরনের সুবিধা পাচ্ছে ইরান। সমঝোতা কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের অপরিশোধিত তেল, পেট্রোলিয়াম পণ্য এবং সংশ্লিষ্ট সেবা রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র দেবে। এতে ব্যাংকিং, বীমা, পরিবহন এবং আর্থিক লেনদেনের সুযোগও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার ১৪ দফা প্রকাশ, কী আছে এতে, কে বেশি সুবিধা পেল
প্রকাশিত ১৪ দফার প্রথম ধারায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং বর্তমান যুদ্ধে জড়িত তাদের মিত্ররা লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান তাৎক্ষণিক ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করবে। তারা একে অপরের বিরুদ্ধে নতুন কোনো সামরিক অভিযান চালাবে না এবং শক্তি প্রয়োগ কিংবা শক্তি প্রয়োগের হুমকি থেকেও বিরত থাকবে।
দ্বিতীয় ধারায় দুই দেশ একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান দেখানো এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার অঙ্গীকার করেছে।
তৃতীয় ধারায় সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে বাড়ানো যেতে পারে।
চতুর্থ ধারায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার পাশাপাশি চূড়ান্ত চুক্তির ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের নিকটবর্তী এলাকা থেকে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি সরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
পঞ্চম ধারায় ইরান ৬০ দিনের জন্য পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর পর্যন্ত বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ ও বিনামূল্যে চলাচল নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ প্রশাসন ও সামুদ্রিক সেবা নিয়ে ওমান এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালাবে।
ষষ্ঠ ধারায় ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কমপক্ষে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক অংশীদাররা।
সপ্তম ধারায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংশ্লিষ্ট প্রস্তাব, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কিছু সিদ্ধান্ত এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক ও গৌণ নিষেধাজ্ঞাসহ বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে।
অষ্টম ধারায় ইরান পুনরায় নিশ্চিত করেছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ করবে না। তবে বিদ্যমান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা দুই দেশের আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। এ ক্ষেত্রে আইএইএর তত্ত্বাবধানে ইউরেনিয়াম নিম্নমাত্রায় রূপান্তরের বিষয়টিও আলোচনায় থাকবে।
নবম ধারায় চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান অবস্থা বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে। এ সময়ে ইরান তাদের বর্তমান পারমাণবিক কর্মসূচি অপরিবর্তিত রাখবে এবং যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ বা অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করবে না।
দশম ধারায় ইরানের জ্বালানি খাতে তাৎক্ষণিক ছাড় দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। একাদশ ধারায় ইরানের জব্দকৃত অর্থ ও সম্পদ ব্যবহারের পূর্ণ সুযোগ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
দ্বাদশ ধারায় সমঝোতা বাস্তবায়ন তদারকির জন্য একটি নির্বাহী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গঠনের কথা বলা হয়েছে। ত্রয়োদশ ধারায় নির্দিষ্ট কয়েকটি শর্ত বাস্তবায়নের পর বাকি বিষয়গুলো নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
চতুর্দশ ও শেষ ধারায় বলা হয়েছে, ভবিষ্যৎ চূড়ান্ত চুক্তিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদন দেওয়া হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, খসড়ায় বর্ণিত বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হলে ইরান অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সুবিধা পাবে। তবে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর এবং তা বাস্তবায়নের আগ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি অনিশ্চয়তার মধ্যেই থাকবে।