০৭ মার্চ ২০২৬, ০৯:১৯

বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করে মালয়েশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে গেছে এফবিআই, নেপথ্যে কী?

মালয়েশিয়া থেকে গ্রেপ্তার করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে গেছে এফবিআই  © সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক শিশু যৌন নিপীড়নের চক্র পরিচালনার অভিযোগে জোবাইদুল আমিন (২৮) নামের এক বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তারের পর মালয়েশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে গেছে মার্কিন কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই। বর্তমানে তাকে যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কায় নেওয়া হয়েছে। সেখানে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের শুনানি চলছে। শুক্রবার এফবিআইয়ের পরিচালক কাশ প্যাটেল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, এফবিআই ও যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদার সংস্থাগুলোর সমন্বিত অভিযানে জোবাইদুল আমিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি ২০২২ সাল থেকে পলাতক ছিলেন। গ্রেপ্তারের পর তাকে মালয়েশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কায় নিয়ে আসা হয়েছে, এখানে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের মুখোমুখি হবেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পরে প্রকাশ করা হবে বলেও জানান তিনি। তদন্ত ও গ্রেপ্তা
রে সহযোগিতার জন্য মালয়েশিয়া সরকারসহ যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় অংশীদারদের ধন্যবাদ জানান এফবিআইয়ের পরিচালক।

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের ওয়েবসাইটে গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক শিশু যৌন নিপীড়নের চক্র পরিচালনার অভিযোগে ৫ মার্চ আলাস্কার ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে এক বাংলাদেশিকে হাজির করার বিষয়টি নির্ধারিত রয়েছে।

তদন্ত নথি অনুযায়ী, জোবাইদুল আমিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে অপ্রাপ্তবয়স্কদের টার্গেট করতেন। ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাটসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তিনি ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করতেন এবং অনেক সময় নিজেকে কিশোর হিসেবে পরিচয় দিয়ে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে যৌনতামূলক ছবি ও ভিডিও পাঠাতে প্রলুব্ধ করতেন। পরে এসব ছবি–ভিডিও প্রকাশ করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে তাদের আরও ছবি ও ভিডিও পাঠাতে বাধ্য করতেন। অনেক ক্ষেত্রে তিনি এসব ছবি ভুক্তভোগীদের বন্ধু ও পরিবারের কাছেও পাঠানোর হুমকি দিতেন।

২০২২ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল গ্র্যান্ড জুরি আলাস্কাসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থান ও বিদেশে শত শত শিশুকে নিপীড়নের সঙ্গে সম্পর্কিত অভিযোগে জোবাইদুল আমিনকে অভিযুক্ত করে। অভিযোগপত্রে বলা হয়, তিনি সাইবারস্টকিং, শিশু পর্নোগ্রাফি তৈরি ও ছড়ানো এবং তার জালিয়াতির মতো অপরাধে জড়িত ছিলেন।

তদন্তের সূত্রপাত হয় আলাস্কার এক ১৪ বছর বয়সী কিশোরীর অভিযোগ থেকে। ওই কিশোরী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানান, তিনি জোবাইদুলের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিলে জোবাইদুল তার পাঠানো নগ্ন ছবি বন্ধু ও অনুসারীদের কাছে পাঠিয়ে দেয়। পরে তদন্তকারীরা একাধিক তল্লাশি পরোয়ানা ও সমন জারি করে তার পরিচয় শনাক্ত করেন এবং জানতে পারেন, তিনি একই ধরনের কৌশলে শত শত অপ্রাপ্তবয়স্ককে ফাঁদে ফেলেছিলেন।

তদন্ত নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়, জোবাইদুল ভুক্তভোগীদের বলতেন—আরও ছবি পাঠানোর দাবি বন্ধ করতে হলে তাদের অন্য ভুক্তভোগী সংগ্রহ করতে হবে। প্রসিকিউটরদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শত শত অপ্রাপ্তবয়স্ক ভুক্তভোগীর নগ্ন ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেন এবং অন্য অপরাধীদেরও একই কাজ করতে উৎসাহিত করেন। এমনকি তিনি দাবি করতেন, তার কারণে অনেক ভুক্তভোগী আত্মহত্যাপ্রবণ হয়ে পড়েছিল বা আত্মক্ষতির পথে গিয়েছিল।

আরও পড়ুন: কিশোরীকে যৌন নির্যাতন করেছিলেন ট্রাম্প, নথি প্রকাশ করল মার্কিন বিচার বিভাগ

অভিযোগ আনার আগে জোবাইদুল মালয়েশিয়ায় বসবাস করছিলেন এবং সেখানে চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়াশোনা করছিলেন। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে মালয়েশিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ও তাকে শিশু পর্নোগ্রাফি সংরক্ষণ ও তৈরির অভিযোগে অভিযুক্ত করে।

তদন্তকারীরা জানান, যুক্তরাষ্ট্রে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার পর তাকে প্রত্যর্পণের চেষ্টা করা হলেও তা ব্যর্থ হয়। পরে এফবিআইয়ের সহযোগিতায় মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে স্থানীয় অভিযোগ আনে। বিচারিক প্রক্রিয়ার সময় তিনি জামিনে মুক্ত ছিলেন। পরে মালয়েশিয়া থেকে তাকে বহিষ্কার করা হলে এফবিআই তাকে হেফাজতে নেয় এবং আলাস্কায় নিয়ে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ৪ মার্চ তাকে মালয়েশিয়া থেকে আলাস্কায় নেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার আলাস্কার অ্যাঙ্কোরেজে প্রাথমিক আদালত শুনানিতে তিনি নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাজিস্ট্রেট বিচারক কাইল রিয়ারডন মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া চলাকালে তাকে কারাগারে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।

এদিকে এফবিআই পরিচালক কাশ প্যাটেল এক বিবৃতিতে বলেন, “আমাদের শিশুদের যৌন শোষণ থেকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি অপরিবর্তিত। অপরাধী যুক্তরাষ্ট্রে থাকুক বা বিদেশে—আইনের আওতায় আনার জন্য আমরা কাজ চালিয়ে যাব।”

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জোবাইদুল আমিন দোষী সাব্যস্ত হলে তার ২০ বছর থেকে শুরু করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে।