ঢাবি অধ্যাপক সাদেকা হালিমকে স্থায়ী বহিষ্কারের সুপারিশ, ছয় অধ্যাপককে অব্যাহতি
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতা গ্রহনের পর থেকে ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সব নিয়োগ পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেট। একই সঙ্গে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ এক অধ্যাপককে স্থায়ী বহিষ্কারের সুপারিশ এবং ছয় জনকে অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। নীল দলকে নিষিদ্ধের বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠনসহ আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে সভায়।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, সিন্ডিকেট সভায় অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিমের বিরুদ্ধে আগের তদন্ত কমিটির স্থায়ী বহিষ্কারের সুপারিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখাসহ বিভিন্ন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে তদন্ত পরিচালিত হয়েছিল। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাইব্যুনাল।
অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক। তিনি ২০২২ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। এছাড়া তিনি এর আগে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এ বিষয়ে এ বিষয়ে অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আমি বিষয়টি সম্পর্কে কিছুটা জেনেছি। আমার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটির সুপারিশ ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়েছে। তবে ট্রাইব্যুনালের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’
একই সভায় বিভিন্ন অভিযোগে ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি ও ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. আবদুল মুহিত, ফার্মাসিউটিক্যাল টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক আবু সারা শামসুর রউফ, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন, পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. রফিক শাহরিয়ার, নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক আফরোজা শেলী এবং অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলামকে প্রশাসনিক দায়িত্ব ও ক্লাস নেওয়া থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
গত মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) রাতে সিন্ডিকেট সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, অব্যাহতি পাওয়া এসব শিক্ষক আওয়ামী ও বামপন্থী নীল দলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য জানতে শাস্তি পাওয়া শিক্ষকদের মধ্যে একজন অধ্যাপককে ফোন দেওয়া হলেও তিনি কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।
একই সভায় জুলাইয়ে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিশ্বব্যাংক ও ইউজিসির অর্থায়নে পরিচালিত হেকেপ প্রকল্পের গবেষণা কার্যক্রম খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। নিয়োগ পর্যালোচনার জন্য উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালামকে আহবায়ক এবং অনুষদগুলোর ডিনদের সদস্য করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অন্যদিকে, হেকেপ প্রকল্পের গবেষণা তহবিলের সঠিক ব্যবহার খতিয়ে দেখতে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানীকে আহ্বায়ক করে আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়।
এ ছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া শিক্ষকদের চিহ্নিত করতে উপাচার্য, দুই উপ-উপাচার্য এবং সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক মোর্শেদ হাসান খানের সমন্বয়ে চার সদস্যের একটি বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী শিক্ষকবৃন্দ’ প্ল্যাটফর্মের জমা দেওয়া ২৩১ জন শিক্ষকের তালিকা পর্যালোচনা করবে। অভিযুক্ত শিক্ষকরা কোনো শিক্ষক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলে ওই সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত রয়েছে।
অন্য খবর: জরুরি সিন্ডিকেট সভা আজ, অচলাবস্থা কাটানোর অপেক্ষায় খুবি
বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক ড. তাজমেরি এস এ ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, জুলাই নিয়ে কটূক্তি করা এবং জুলাইবিরোধী অবস্থান নেওয়ার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাদের অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক সব ধরনের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এ ধরনের অভিযোগে আরও অনেক শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে অভিযোগের সত্যতা মিললে তাদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কমিটিগুলো দ্রুত কাজ শেষ করবে জানান তিনি।
ঢাবি আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন নীল দলকে ‘নিষিদ্ধ’ করার দাবি ওঠার পর সিন্ডিকেটে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে প্রশাসন। গত সোমবার বিকেলে ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী শিক্ষকবৃন্দের’ ব্যানারে বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষক উপাচার্যের কাছে একটি স্মারকলিপি দেন। এ সময় তারা জুলাই আন্দোলনের বিরুদ্ধে ও ফ্যাসিবাদের পক্ষে থাকা আওয়ামী ও বামপন্থী ২৩১ জন শিক্ষকের তালিকা হস্তান্তর করে তাদের শাস্তি ও নীল দল নিষিদ্ধের দাবি জানান।
স্মারকলিপি দেওয়ার সময় বিএনপি ও জামায়াতপন্থী শতাধিক শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিগত সরকারের সময়ে বিতর্কিত ও ছাত্রবিরোধী ভূমিকা পালনকারী শিক্ষকের বিষয়ে তদন্ত করতে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে নেতৃত্ব দেবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম।