৩০ মে ২০২৬, ১৫:২৬

হুদা হাউজ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল

হুদা হাউজ ও বর্তমান রোকেয়া হল  © টিডিসি সম্পাদিত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি সুপরিচিত নাম রোকেয়া হল। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নির্মিত প্রথম আবাসিক হল। তবে শুরু থেকেই এই হলটি বর্তমান পরিচয়ে ছিল না। ১৯৫৬ সালে ছোট্ট দুই আবাসিক ভবন ‘হুদা হাউজ’ ও ‘চামেরি হাউজ’ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী নিবাস ‘উইমেন স্টুডেন্টস রেসিডেন্স’ (ডব্লিউএসআর) এর যাত্রা শুরু হয়। পরে এর নামকরণ হয় ‘উইমেন্স হল’।

সবশেষ ১৯৬৪ সালে নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় ‘রোকেয়া হল’। হুদা হাউজ থেকে শুরু হয়ে আজকের রোকেয়া হলে রূপান্তরের রয়েছে এক দীর্ঘ ইতিহাস; যা অনেকেরই অজানা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক আয়শা বেগমের ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: ‍স্মৃতি নিদর্শন’ বই তে হলটির বিস্তৃত ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।

১৯৬৩ সালে নতুন ছাত্রী নিবাস প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৬৪ সালের ২১ নভেম্বর বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের নামানুসারে ‘উইমেন্স হল' এর নতুন নামকরণ করা হল ‘রোকেয়া হল’। সে সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষা খাতে সহায়তার জন্য অনুদান দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র সরকার। এ অর্থ ব্যয়ে নির্মাণ হয়েছিল রোকেয়া হলে প্রথম পূর্ণাঙ্গ ভবন ‘শাপলা’। অবকাঠামোগত বৈচিত্র্যের কারণে ওই সময়ে স্থাপনাটি হয়ে উঠেছিল বিশ্ববিদ্যালয়টির সবচেয়ে আকর্ষণীয় ভবন।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল খুবই কম। এই মুষ্টিমেয় নারী শিক্ষার্থীরা প্রথমদিকে ছাত্রদের হলের সঙ্গে যুক্ত থাকতেন। নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকায় তাদের জন্য পৃথক আবাসিক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৫৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর দুটি ছোট আবাসিক ভবন—‘হুদা হাউজ’ ও ‘চামেরি হাউজ’ নিয়ে ডব্লিউএসআর চালু করা হয়। প্রথম প্রভোস্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন আখতার ইমাম। পরে এর নামকরণ হয় ‘উইমেন্স হল’।

চামেরি হাউজ

অনেক চড়াই উত্রাই পার হয়ে ১৯৬৩ সালে নতুন ছাত্রী নিবাস প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৬৪ সালের ২১ নভেম্বর বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের নামানুসারে ‘উইমেন্স হল' এর নতুন নামকরণ করা হল ‘রোকেয়া হল’। সে সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষা খাতে সহায়তার জন্য অনুদান দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র সরকার। এ অর্থ ব্যয়ে নির্মাণ হয়েছিল রোকেয়া হলে প্রথম পূর্ণাঙ্গ ভবন ‘শাপলা’। অবকাঠামোগত বৈচিত্র্যের কারণে ওই সময়ে স্থাপনাটি হয়ে উঠেছিল বিশ্ববিদ্যালয়টির সবচেয়ে আকর্ষণীয় ভবন। 

রোকেয়া হলের গোড়াপত্তন করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় উপাচার্য অধ্যাপক জর্জ হ্যারি ল্যাংলি। ১৯২৬ সালে রমনা এলাকার ১৭ নম্বর বাংলোয় ‘চামেরি হাউজ’ নাম দিয়ে তিনি সেখানে ছাত্রীদের থাকার ব্যবস্থা করেন। এরপর দীর্ঘ পথপরিক্রমায় সেই ছাত্রী নিবাস রূপ পেয়েছে হলের। চামেরি হাউজে প্রথম আবাসিক ছাত্রী হিসেবে থাকার সুযোগ পান ঢাবি শিক্ষার্থী ফজিলাতুন্নেসা। তখন মোট আবাসিক ছাত্রীর সংখ্যা ছিল ছয়। পরবর্তী সময়ে চামেরি হাউজের জন্য স্থান নির্ধারণ করা হয় হুদা হাউজে।

প্রাচীন এ জমিদার বাড়িটি ছিল কাঠের কারুকার্যমণ্ডিত। ছাত্রী হোস্টেলটি এরপর অনেকের কাছে ‘হুদা হাউজ’ কিংবা ‘চামেলী হাউজ’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। বর্তমানে রোকেয়া হলের অফিস কক্ষটি যেখানে অবস্থিত, আগে সেখানেই ছিল পুরনো ছাত্রী হোস্টেলটি, যা ১৯৫৬ সালের সেপ্টেম্বরে ‘উইমেন্স হল’ নামে নারী শিক্ষার্থীদের হলরূপে স্বীকৃতি পায়। একসময় শিক্ষাবিদ শামসুন্নাহার মাহমুদ ও সুফিয়া কামাল হলটির নাম পরিবর্তন করে উপমহাদেশে নারী জাগরণ ও শিক্ষার অগ্রদূত রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের নামে নামকরণ করার আহবান জানান।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৬৪ সালের ২ নভেম্বর হলের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘রোকেয়া হল’। পরবর্তীতে ১৯৬৮ সালে ২১ নভেম্বর ছাত্রীনিবাসটি বর্তমান নব নির্মিত ভবনে স্থানান্তরিত হয় এবং প্রবেশপথের শীর্ষে নামটি লেখা হয়।

হলের সাবেক শিক্ষার্থীরা

বইটির তথ্যানুযায়ী, হুদা হাউজের কক্ষটি ছিল ছোট, অপরিসর ও দীনহীন। উইমেন্স হলে পরিণত হওয়ার পর হুদা হাউজের তেমন কোন পরিবর্তন ঘটেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে পুরাতন ছাত্রী নিবাসের আদি অবয়ব ছিল ভিন্ন যার সাথে আজকের রোকেয়া হলের কোন মিল নেই। হলে ঢুকতেই বিরাট আকৃতির টিনের চালা ঘর ছিল, যেখানে ছাত্রীরা তাদের আত্মীয় পরিজনের সাথে দেখা সাক্ষাতে মিলিত হতো। হুদা হাউজে প্রভোস্ট অফিসের স্থান সংকুলান হয়নি।

দোতলা এবং নিচতলায় ছাত্রীরাই থাকতেন। নিচের পূর্বদিকের ঘরটি সুপারের থাকার জন্য বরাদ্দ ছিল। এ কারণে এক পর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যাললয়েয় পুরানো আর্টস বিল্ডিং (যা এখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগ) প্রাঙ্গণে প্রভোস্টের অফিস স্থানান্তরিত করা হয়। কলাভবনের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত অনুচ্চ দোতলা ভবনের নিচতলায় উত্তর দিকে প্রান্তিক শেষ কক্ষটি ছিল উইমেন্স হলের প্রভোস্টের কার্যালয়।

হলের প্রবেশ পথটি ছিল অপরিসর। কয়েকটি পুরাতন কাঠের টুকরা সম্বলিত গেটটি শুধু নামেই ছিল গেট; শক্তিতে দুর্বল ও উচ্চতায় ছিল খর্বাকৃতির। এই প্রবেশ পথটি আদিতে ছিল হুদা হাউজের গেট। এ ঐতিহ্যপূর্ণ গেটটি দুর্বল বিবেচনায় পরবর্তীকালে সুদৃঢ় প্রাচীর এবং সুরক্ষা ব্যবস্থা সম্বলিত প্রবেশ পথ নির্মাণে উৎসাহ পরিলক্ষিত হয়।

অথচ, পঞ্চাশের দশকে সহজ সরলভাবে নির্মিত দুর্বল দেয়াল ও গেট ছাত্রীদের নিরাপত্তা ও সম্ভ্রম রক্ষার জন্য কোনো হুমকির কারণ হয়নি; কিংবা বাইরে থেকে কোনো বিরুদ্ধ শক্তির আক্রমণের আশঙ্কা দেখা দেয়নি। কালের পরিবর্তনে সমাজের চরিত্র বদলে যায়। আর তাই কাঠের দুর্বল আদি প্রবেশপথ ও কাঁটাতারের পাঁচিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় অপারগ হয়ে দাঁড়ায়। 

রোকেয়া হলের পুরনো গেট

ছাত্রী হলকে নিরাপদ আবাসিক অঙ্গন তৈরির জন্য দেয়াল নির্মাণের আবশ্যকতা দেখা দেয়। আদিতে ছাত্রীনিবাসের প্রাঙ্গণের প্রবেশপথের বাইরে একটি বিরাট পুকুর ছিল। পুকুরের উত্তর পার্শ্বে ছিল ছো খোলা মাঠ, হলে প্রবেশের পথ ছিল এ পুকুরের পাশ দিয়ে। পুকুর পাড়ের বড় বড় কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া ও মেঘ শিরীষ গাছের ছায়াতলে শুয়ে বসে বিশ্রাম নিত পথিকেরা। অষ্টপ্রহর জনসমাগমের হাত থেকে রক্ষাকল্পে পাঁচিল নির্মাণের সময় পুকুর ও ছোট মাঠ ছাত্রী হলের কম্পাউন্ডের মধ্যে নিয়ে নেয়া হয়েছিল। তখন থেকে পুকুর ও মাঠ ছা নিবাসের সম্পত্তি বলে পরিগণিত হতে থাকল।

কালক্রমে কাঁটাতারের পাঁচিল ছাত্রীহলের নিরাপত্তা রক্ষায় অপারগ হয়ে পড়ে। কিন্তু ছাত্রী হল দেয়াল দিয়ে ঘিরে দেওয়ার বিরুদ্ধে ছাত্রীরা প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে। তারা হলকে কারাগারের ন্যায় অবরুদ্ধ করতে দিতে রাজি ছিল না। অবশেষে অনতি উচ্চ আড়াই থেকে তিন ফুট উঁচু দেয়াল নির্মাণে ছাত্রীদের সম্মতি পাওয়া যায়। শেষ পর্যন্ত ছাত্রীদের দাবি অগ্রাহ্য করে ছয় ফুট উঁচু করে বেষ্টনী প্রাচীর দেওয়া হয়, সেই সঙ্গে যুক্ত হয় উঁচু লোহার প্রবেশদ্বার এবং এর এক পার্শ্বে ক্ষুদ্রাকৃতির দর্শনার্থীদের কক্ষ অন্য পার্শ্বে একই পরিসরের দারোয়ানের কক্ষ। রোকেয়া হল সব হল থেকে পৃথক এবং অবয়বে স্বতন্ত্র। সেই থেকে এ পর্যন্ত রোকেয়া হলে নানা পরিবর্তন হয়ে চলেছে অনবরত।

রোকেয়া হলের সেই পুকুর (বর্তমানে বিলুপ্ত)

রোকেয়া হলের প্রবেশ পথ থেকে প্রায় ৩০ ফুট ভিতরে অবস্থিত ছিল পুকুরটি; বর্তমানে দণ্ডায়মান বড় আকৃতির কড়ই গাছের কাছে থেকে অনার্স বিল্ডিং পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এটি। পুকুরের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ২৬৫ ফুট আর প্রস্থ ছিল প্রায় ১৯৫ ফুট; উত্তর দিকের পাড় অপেক্ষা দক্ষিণ দিকের অংশ ছিল বেশি দীর্ঘ। চামেলী হাউজের সম্মুখে পুকুরটিতে বাঁধানো ঘাট ছিল না। প্রাধ্যক্ষ আখতার ইমাম পুকুরের পাড়ে বসে মেয়েদের চিত্তবিনোদনের জন্য শান বাঁধানো ঘাট তৈরি করে দেন। এ ঘাট থেকে নিম্নমুখী পানির তলা পর্যন্ত সিঁড়িপথ সংযুক্ত ছিল।

আরও পড়ুন: প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে বিতর্ক, শিক্ষা-গবেষণায় নিজেদের অবস্থান জানাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বাঁধান ঘাটের দুটি বিধ্বস্ত ভিত্তি বেদী অতীত স্মৃতি বহন করে চলেছে। এখানে মেয়েরা মনের সুখে সাঁতার শিখত ও সাঁতার কাটত। কখনো বা নৌকায় চড়ে আনন্দ উপভোগ করত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্যাল এডুকেশন বিভাগের পরিচালক কর্নেল মতিউর রহমান সে সময়ে কয়েকটি ছোট আকৃতির নৌকা (বোট) যোগাড় করে দেন ছাত্রীদের এই পুকুরে চালাবার জন্য। লাল-সাদা শাপলা ও বেগুনী রঙের কলমি ফুল ফুটে থাকত টলটলে পুকুরটিতে। ছাত্রীরা ছিপ ফেলে মাছও ধরত।

মাঝে-মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জাল ফেলে মাছ ধরার ব্যবস্থা করতো। পুকুরের ধারে শিরীষ গাছের তলায় মেয়েরা প্রায়ই গানের আসর বসাত। ১৯৭৫-৭৬ সালে উপাচার্য অধ্যাপক ফজলুল হালিম চৌধুরীর সময়ে ছাত্রীদের খেলার মাঠ নির্মাণের জন্য পুকুরটি ভরাট করা হয়। বর্তমানে এটি ছাত্রীদের খেলার মাঠ।

নতুন ছাত্রীনিবাস তৈরির পর হুদা হাউজের ছাত্রীদের নতুন ভবনে স্থানান্তরিত করা হয়। পুরাতন দ্বিতল বিল্ডিং অনার্স ও এম এ শ্রেণির ছাত্রীদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। বর্তমানে রোকেয়া হলে শাপলা ভবন ছাড়াও চামেলী ভবন, অপরাজিতা ভবন ও ৭ মার্চ ভবন রয়েছে। ২০১৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর ১১ তলা বিশিষ্ট আধুনিক সুবিধা সম্বলিত ৭ মার্চ ভবন উদ্বোধন করা হয়।  

রোকেয়া হলের ভবনস্মূহ

রোকেয়া হল প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ ৫৫ বছর পর ‘রোকেয়া হল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন’ ২০১১ সালের ২২ জানুয়ারি আনন্দঘন পরিবেশে পুনর্মিলনী উদযাপন করে। এ মহীয়সী নারীর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে ছাত্রীনিবাসটির প্রধান ভবনের সম্মুখে রোকেয়ার পূর্ণ দেহ দণ্ডায়মান ভাস্কর্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। হলে প্রবেশ করলে প্রথমেই দেখা যাবে শিল্পী হামিদুজ্জামান খানের তৈরি বিমূর্ত ভাস্কর্য- 'শান্তির ফলক'। এছাড়া পাঁচ তলা বিশিষ্ট এ ছাত্রী নিবাসের মূল ভবন ও অফিসের মাঝখানে রয়েছে আরেকটি উলম্ব বিমূর্ত ‘হ্যাপি স্মৃতি ভাস্কর্য’ নিদর্শন।

প্রতি বছর আনুষ্ঠানিকভাবে তার জন্ম দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে পালন করা হয় এবং ছাত্রীদের মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে বেগম রোকেয়া পদক ও পুরস্কার ছাত্রীদের মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রদান করা হয়ে থাকে।  

হলের প্রবেশপথে বেগম রোকেয়ার ভাস্কর্য