২৮ মার্চ ২০২৬, ২১:০৮

কোটি টাকার অডিট আপত্তি উপেক্ষা করে ‘বৈধতা’, ড. ফায়েজ প্রশাসনের শেষ সিদ্ধান্ত ঘিরে বিতর্ক

ইউজিসি  © ফাইল ছবি

শেষ সময়ে এসে ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজের এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত সামনে এসেছে। অভিযোগ— নিয়োগে স্পষ্ট অনিয়ম ও অডিট আপত্তি থাকা সত্ত্বেও তা সংশোধনের পরিবর্তে ‘বৈধতা’ দিতে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার সময়ের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) প্রশাসন। সর্বশেষ ১৭৭তম পূর্ণ কমিশন সভায় সংস্থাটির পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) জেসমিন পারভীন এবং পিআরএল ভোগরত উপ-পরিচালক জামাল উদ্দিনের বিষয়ে নেওয়া ওই সিদ্ধান্ত ঘিরে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ কেবল প্রশাসনিক অনিয়ম নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অনিয়মকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিরল দৃষ্টান্ত।

অডিট সূত্র ও সভার কার্যবিবরণী পর্যালোচনায় দেখা যায়, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত ভঙ্গ করে বয়সসীমা অতিক্রম করা দুই কর্মকর্তা মোছা. জেসমিন পারভীন ও মো. জামাল উদ্দিনকে ঘিরে দীর্ঘদিনের আপত্তি এখনো ঝুলে আছে। শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর একাধিক অর্থবছরে এ বিষয়ে আপত্তি তুলেছে। আপত্তির বিষয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা নিজেদের স্বপক্ষে সাফাই দিলেও সেটি গ্রহণযোগ্য নয় জানিয়ে আপত্তি নিষ্পত্তি করেনি শিক্ষা অডিট। তবে ইউজিসি অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠে।

জানা গেছে, বর্তমানে ইউজিসির আর্ন্তজাতিক সহযোগিতা বিভাগের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত)-এর দায়িত্ব পালন করছেন জেসমিন পারভীন। সহকারী পরিচালক (৭ম গ্রেড) পদে নিয়োগের সময় তার বয়স ছিল ৩৬ বছর ১০ মাস ২২ দিন; যেখানে বিজ্ঞপ্তিতে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ছিল ৩৫ বছর। এই স্পষ্ট অনিয়মের বৈধতা দিনে কমিশন তার অতিরিক্ত ১ বছর ১০ মাস ২২ দিনের বয়সকে ভূতাপেক্ষিকভাবে পরিমার্জন করে অনুমোদন দিয়েছে।

অর্থাৎ, নিয়োগের সময় যে শর্ত ভঙ্গ করা হয়েছিল, সেটিকে পরবর্তীতে বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে অডিট আপত্তির এক কোটি ৩০ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হবে না জেসমিন পারভীনকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি কার্যত অডিট আপত্তি মুছে ফেলার প্রশাসনিক কৌশল; যার মাধ্যমে অনিয়মকে আইনি রূপ দেওয়া হচ্ছে।

এসব সিদ্ধান্তের ফলে সরকারের বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। জেসমিন পারভীনের ক্ষেত্রে বেতন, ভাতা ও পদোন্নতিজনিত সুবিধা মিলিয়ে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকার ক্ষতির হিসাব উঠে এসেছে।

সভায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, জেসমিন পারভীন ২০০৫ সালে অস্থায়ীভাবে ইউজিসিতে নিয়োগ পান। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে স্থায়ী পদে নিয়োগ লাভ করেন। তবে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত অনুযায়ী তার বয়সসীমা তখনই অতিক্রম করেছিল। বিষয়টি ২০২২-২৩ এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে অডিট আপত্তি হিসেবে উত্থাপিত হয়। জেসমিন পারভীনকে এই সময় নেওয়া বেতন-ভাতার এক কোটি ৩০ লাখ টাকা ফেরতের নির্দেশনাসহ অডিট অধিদপ্তরকে অবহিত করতে বলা হয়।

অডিট অধিদপ্তরের এমন আপত্তির পরও অনিয়ম সংশোধনের পরিবর্তে কমিশনের চাকরি প্রবিধানমালা, ১৯৮৭-এর ৯(৩) ধারা ব্যবহার করে তাকে ‘রক্ষা’ করা হয়েছে। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধারা নিয়োগের আগে প্রযোজ্য, পরে নয়। ফলে এ ধরনের ভূতাপেক্ষিক অনুমোদন আইনগতভাবে দুর্বল এবং প্রশ্নবিদ্ধ।

এদিকে অবসরে যাওয়া ইউজিসি কর্মকর্তা মো. জামাল উদ্দিনকে ঘিরে আরও বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। শাখা কর্মকর্তা পদে নিয়োগের সময় তার বয়স ছিল ৩৯ বছর ১০ মাস ২২ দিন, যেখানে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ছিল ৩২ বছর। অর্থাৎ নিয়োগের সময় নির্ধারিত বয়সের চেয়ে প্রায় ৮ বছর বয়স বেশি ছিল জামাল উদ্দিনের। বিষয়টি নিয়েও অডিট আপত্তি ওঠে।

জামাল উদ্দিনের বিষয়টি সমাধানে শুধু ফুল কমিশনের অনুমোদন নয়; বরং পুরো নিয়োগ বিধি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, একজন ব্যক্তির নিয়োগকে বৈধ করতে নীতিমালা পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি প্রশাসনিক নীতির চরম অপব্যবহার এবং ক্ষমতার অপপ্রয়োগের শামিল।

ইউজিসি কর্মকর্তা মো. জামাল উদ্দিনকে ঘিরে আরও বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। শাখা কর্মকর্তা পদে নিয়োগের সময় তার বয়স ছিল ৩৯ বছর ১০ মাস ২২ দিন, যেখানে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ছিল ৩২ বছর। অর্থাৎ নিয়োগের সময় নির্ধারিত বয়সের চেয়ে প্রায় ৮ বছর বয়স বেশি ছিল জামাল উদ্দিনের। বিষয়টি নিয়েও অডিট আপত্তি ওঠে।

ফুল কমিশনের সভায় আরও বলা হয়, এ ধরনের আরও ‘কেস’ থাকলে একইভাবে পরিমার্জনের সুযোগ রাখা হবে। এই সিদ্ধান্তকে সবচেয়ে উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এটি ভবিষ্যতে অনিয়মকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার পথ খুলে দেবে।

আরও পড়ুন: মেধা ও যোগ্যতার মূল্য দিলেই বিশ্ববিদ্যালয় বাঁচবে, দেশ বাঁচবে

অডিট সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এসব সিদ্ধান্তের ফলে সরকারের বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। জেসমিন পারভীনের ক্ষেত্রে বেতন, ভাতা ও পদোন্নতিজনিত সুবিধা মিলিয়ে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকার ক্ষতির হিসাব উঠে এসেছে। 

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘অডিট আপত্তি উঠলে সেটি তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। কিন্তু এখানে উল্টো অনিয়মকে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে। এটি শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জন্যও হুমকি।’

শিক্ষা খাত বিশ্লেষকরাও বিষয়টিকে গভীর উদ্বেগের সঙ্গে দেখছেন। তাদের মতে, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা না থাকলে যোগ্য প্রার্থীরা বঞ্চিত হন এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়। একজনের জন্য বয়সসীমা বাড়ানো, আরেকজনের জন্য বিধি পরিবর্তনের ঘটনা নজিরবিহীন। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে নিয়ম মানার কোনো প্রয়োজনই থাকবে না।

তারা বলছেন, পুরো বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় এনে দায়ীদের চিহ্নিত করতে হবে এবং অডিট আপত্তির সুষ্ঠু নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় এ ধরনের অনিয়ম শুধু ইউজিসিতেই নয়, অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিষয়টি জানতে অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি। পরে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আমি নতুন যোগ দিয়েছি। বিষয়গুলো আমার জানা নেই, জানার কথাও না। আপনি আমাদের জনসংযোগ শাখায় কথা বলে দেখুন।’

জনসংযোগ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচালক মোহাম্মদ জামিনুর রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘প্রশাসনের  সাথে কথা বলে এটা নিয়ে বলতে পারবে। তবে সেক্ষেত্রে সময় সাপেক্ষ হয়ে যাবে বিষয়টি।’