ঢাবির ‘খ’ ইউনিটের প্রস্তুতি হোক পরিকল্পিত

ঢাবির ‘খ’ ইউনিটের প্রস্তুতি হোক পরিকল্পিত
লেখক ও ঢাবির লোগো  © শেখ শাকিল হোসেন

প্রিয় ভর্তিচ্ছু ভাই-বোনেরা, শুভেচ্ছা নিও। বর্তমান করোনা পরিস্থিতি ও আসন্ন ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে তোমাদের চিন্তিত থাকাটাই স্বাভাবিক। তবুও ভর্তিযুদ্ধে টিকে থেকে নিজের পরিচয় তৈরীর জন্য ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। তোমরা ইতোমধ্যে অবগত আছো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘খ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা আগামী ২২ মে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সুতরাং, হাতে সময় খুবই কম। এই কম সময়ের মধ্যেও কিভাবে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া যায় সে বিষয়েই আজকে আলোচনা করবো।

এবার ভর্তি পরীক্ষার মানবন্টনে পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। এমসিকিউ পরীক্ষার নম্বর ৭৫ থেকে ৬০ নম্বর করা হয়েছে। অন্যদিকে লিখিত পরীক্ষার মোট নম্বর থাকবে ৪০। এমসিকিউ ও লিখিত পরীক্ষার জন্য আলাদাভাবে ৪৫ মিনিট বরাদ্দ থাকবে। সুতরাং, সময় ব্যবস্থাপনা ও সঠিক পরিকল্পনা অনুযায়ী পরীক্ষা দিতে পারাটা জরুরি।

‘খ’ ইউনিটে চান্স পাওয়াটা অনেকের কাছে সহজ মনে হতে পারে কারণ আসন তুলনামূলক একটু বেশি যা, ২ হাজার ৩৬৩টি বর্তমানে। কিন্তু এই ইউনিটে চান্স পাওয়াই অনেক কঠিন। কারণ, পরীক্ষার্থীকে এমসিকিউ ও লিখিত অংশে আলাদা আলাদা ভাবে পাস করতে হবে ও মোট ৪০ নম্বর অবশ্যই পেতে হবে।

তবে, শুধু পাস করলেই হবে না মেধাক্রম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পাস মার্কের থেকে আরো বেশি কিছু মাকর্স অবশ্যই ভালো মেধাক্রম নিশ্চিত করবে। দিকনির্দেশনা পর্ব শেষে এখন প্রস্তুতি পর্বে যাওয়া যাক। বিষয়ভিত্তিক আলোচনায় প্রথমে আসে বাংলা তাই বাংলা দিয়েই শুরু করি।

বাংলা
বাংলায় ১৫টি প্রশ্নের জন্য ১৫ নম্বর এবং পাস মার্ক ন্যূনতম ৫। ‘খ’ ইউনিটে প্রশ্ন বরাবরই একটু বইয়ের ভেতর থেকে আসে কিছুটা অনুধাবনমুলক ধরনের। তাই ভালো করতে পাঠ্যবইয়ের বিকল্প নেই। এই মুহুর্তে, প্রত্যেকটা গদ্য, পদ্য ভালোভাবে রিভাইস দিতে হবে। যেহেতু সময় কম তাই প্রতিদিন কমপক্ষে ২টি গদ্য-পদ্য রিডিং পড়ে শব্দার্থ-টিকা ও সংশ্লিষ্ট এমসিকিউ পড়ে ফেলতে হবে। কোন টপিক বিস্তারিত পড়ার সময় আগেই শেষ তাই যত দ্রুত সম্ভব এমসিকিউ সহ টপিকটা আয়ত্ত করার চেষ্টা করো। লেখক পরিচিতি, পাঠ পরিচিতি থেকে প্রশ্ন থাকবে তাই এগুলোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অংশের জন্য একটি নোট খাতা বানিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাল ও চুম্বক তথ্যগুলো লিখে ফেললে ভালো হয় যাতে পরীক্ষার আগের দিন এক নজর দেখলেই মনে পড়ে। নাটক-উপন্যাস থেকে ২/৩টা প্রশ্ন হতে পারে। তাই এগুলোর ভূমিকা অংশ ও প্রত্যেকটি চরিত্র সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে। ভিতরের ছোট ছোট তথ্যগুলোর জন্যও আলাদা  নোট রাখা জরুরি। সে ক্ষেত্রে পৃষ্ঠাভিত্তিক নোট করা যেতে পারে আবার বইয়ের পাশে পেন্সিল দিয়ে তথ্যগুলো লিখে রাখতে পারো।এগুলো সবই তোমাদের সময় বাঁচাবে বলে আশা করি। ব্যাকরণের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ টপিক থেকে প্রতি বছরই প্রশ্ন আসে। সমাস, বাগধারা, সন্ধি ও এককথায় প্রকাশ অন্যতম। এগুলোর উপরে ভালো দখল রাখতে হলে ৯ম-১০ম শ্রেণির ‘বাংলা ভাষার  ব্যাকরণ ও নির্মিতি’ নামক বইটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই বই থেকে ভর্তি পরীক্ষার টপিকগুলোর বেসিক ধারণা নেওয়ার সাথে সাথে উদাহরণগুলো ও পড়তে হবে  আর মনে রাখতে হলে লিখে লিখে পড়বে যা লিখিত পরীক্ষায়ও কাজে আসবে ইনশাআল্লাহ।

ইংরেজি
ইংরেজিতে ‘খ’ ইউনিটের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক খারাপ করে। তার কারণ হতে পারে এই বিষয়ের প্রতি ভীতি। তবে, ইংরেজিতে ভয়ের কোন কারণ নেই। মাধ্যমিকে টপিকগুলো সংক্ষিপ্ত আকারে থাকলেও ভর্তি পরীক্ষার সময় সেগুলোই বিস্তারিত আকারে থাকে। সাথে নতুন কিছু যুক্ত হলেও খুব কঠিন কিছু না। তবে প্রথমেই বলি, ২০১৯-২০ সেশনে, পাঠ্যবইয়ের কবিতা ও Passage থেকে প্রশ্ন হয়েছিলো। এ বছর ও ঢাবি পাঠ্যবইয়ের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিবে বলেই জানা যায়। তাই কবিতার চুম্বক তথ্যগুলো নোট খাতায় বা বইয়ের পাশে লিখে রাখতে পারলে ভালো। কবিতার লাইনের ব্যাখ্যা বুঝে তথ্য পড়তে হবে। Passage এর অর্থ বুঝে শব্দার্থ ও Synonym-Antonym একসাথেই পড়ে ফেলা যায় যা লিখিত অংশেও ভালো করতে সাহায্য করবে। এবার গ্রামার অংশ বলতে গেলে Right form of Verb, Conditional sentence, Voice-Narration, Verb-Adverb, Tense, Article এর সাথে Subject-Verb agreement ও আসতে পারে। তাই এগুলো বেশি করে অনুশীলন করতে হবে। সে ক্ষেত্রে Cliff's TOEFL ও Barron's TOEFL থেকে অনুশীলন করা যেতে পারে। অনেকের প্রশ্ন থাকে Vocabulary মনে থাকেনা। এটা খুবই স্বাভাবিক তবে হাল ছেড়ে দিলে চলবে না।  এ ক্ষেত্রে বইয়ের Vocabulary গুলো আগে পড়তে হবে যেনো আসলে মিস না হয়। বাইরের গুলো আমাদের কারো পক্ষেই জানা সম্ভব না তবে, বিগত বছরের প্রশ্নের সবগুলো Vocabulary শিখে ফেললে আর Vocabulary এর সাগরে ডুবে যাবার ভয় থাকবে না আবার কমন পেয়েও যেতে পারো। Vocabulary মনে রাখার জন্য রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ও সকালে ঘুম থেকে উঠে কমপক্ষে, ১৫/২০ টা করে নতুন শব্দ অর্থ ও Synonym-Antonym সহ পড়বে কারণ, এই সময়ের পড়া মনে থাকে ভালো। প্রশ্ন খুবই বেসিক থেকে হয় তাই ভয় না পেয়ে অনুশীলন চালিয়ে গেলে প্রশ্ন দেখেই বুঝে যাবে এটা কোন টপিক থেকে এসেছে। আর ইংরেজিতেও ১৫টি প্রশ্নে ১৫ নম্বর আর পাস মার্ক ৫।

সাধারণ জ্ঞান
সাধারণ জ্ঞানে মোট নম্বর থাকবে ৩০ আর পাস মার্ক ১০। এখানে ২ টি অংশ থাকে বাংলাদেশ এবং সমগ্র বিশ্ব। খ ইউনিটে গতানুগতিক ধারার প্রশ্ন বা বেসিক থেকে আসলেও গত বছরে সাম্প্রতিক ঘটনাবলী থেকে অধিক প্রশ্ন আসতে দেখা গিয়েছে। তাই এই বছরেও সাম্প্রতিক থেকে বেশি প্রশ্ন আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রস্তুতি ভালোভাবে নিতে হলে প্রত্যেক মাসের কারেন্ট এফেয়ার্স সংগ্রহ করতে হবে এবং প্রথম পৃষ্ঠা বিশেষ গুরুত্ব পাবে। সূচিপত্র থেকে ঘটনার এক লাইনে ধারণা নিতে হবে (যাকে বলে At a Glance)। ভিতরে এখন বিস্তারিত পড়ার সময় নেই কিন্তু তারিখ ও স্থানগুলো মনে রাখা জরুরি তাই এগুলো শর্ট নোট করে ফেলো। সাম্প্রতিক ঘটনার ক্ষেত্রে আরো ভালো দখল নিতে পারো প্রতিদিন কমপক্ষে ১ ঘন্টা খবর দেখে বা পত্রিকা পড়ে। পরীক্ষার কিছুদিন আগের পত্রিকার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য লিখে রাখবে খাতায় ও আগের দিন দেখে যাবে। এবার আসি গতানুগতিক বা বেসিক ধারার প্রশ্নে। এই প্রশ্নগুলোর জন্য বিগত বছরের আসা প্রশ্নগুলো বার বার পড়তে হবে। সে ক্ষেত্রে কমন পেতেও পারো। আর বাংলাদেশের কিছু গুরুত্বপূর্ণ টপিক হলো নদী, স্থাপনা, মানচিত্র, সংবিধানের কিছু ধারা, জাতীয় প্রতীক, মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, চুক্তি, কালজয়ী কিছু বই ও লেখক।

আর আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও কারেন্ট এফেয়ার্স পড়তে হবে আর গুরুত্বপূর্ণ টপিকগুলো হলো বিশ্বযুদ্ধ, আন্তর্জাতিক সংগঠন (বিশেষ করে বাংলাদেশ যেগুলোর সদস্য), শান্তি চুক্তি, জাতিসংঘ ও সাথে মহাসচিবের নাম, দেশ-মুদ্রা-রাজধানী, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, বিভিন্ন দেশের ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী। সাধারণ জ্ঞানে মানবিক বিভাগে উচ্চমাধ্যমিকে যার যে বিষয় ছিলো অর্থাৎ, অর্থনীতি, পৌরনীতি, সমাজবিজ্ঞান, সমাজকর্ম, মনোবিজ্ঞান, ইসলাম শিক্ষা, ইসলামের ইতিহাস, যুক্তিবিদ্যা, ভূগোল এগুলোর বিষয়ভিত্তিক প্রস্তুতি নিতে হবে। সে ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব, বিষয়ের জনক, বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অবদানকারীদের নাম প্রাধান্য পাবে। আইসিটির কিছু বেসিক ধারণাও রাখতে হবে। বাজারে অনেক মোটা মোটা বই পাওয়া যায় সাধারণ জ্ঞানের উপর।

এসব দেখে ভয় পাওয়ার কিছু নেই যে কিভাবে শেষ করবো? সব তো পড়তে পারলাম না। মনে রাখবে এটি ভর্তি পরীক্ষা। সব পড়তে হবেনা আর সব আসবেও না। গুরুত্বপূর্ণ টপিক থেকেই প্রশ্ন হবে। আর একটা প্রশ্নব্যাংক কিনে নিজে নিজে অনুশীলন করতে পারো প্রস্তুতি যাচাইয়ের জন্য। এটি আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। এভাবে প্রস্তুতি নিতে পারো এই কয়দিনের জন্য।

এখন ঘড়ি ধরে নয় বরং পড়া না হওয়া পর্যন্ত পড়তে থাকো। অনুশীলন ধরে রাখার ক্ষেত্রে যা পড়ছো লিখে রাখার চেষ্টা করো। শরীরের যত্ন নাও আর অবশ্যই সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করো। মেধাবী হলেই হবে না তোমাকে হতে হবে কঠোর পরিশ্রমী তাহলেই সফলতা আসবে। সর্বোপরি, তোমাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি।

লেখক: শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ