০৭ জুন ২০২৬, ০৯:৪৯

সন্তানের মানসিক বিকাশে বড় বাধা অতিরিক্ত শাসন

সন্তানকে শাসন  © সংগৃহীত

সন্তানকে সঠিক পথে রাখতে শাসন প্রয়োজন হলেও অতিরিক্ত শাসন, বকাঝকা, মার বা কঠোর আচরণ শিশু ও কিশোরদের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। অনেক সময় অভিভাবকেরা শৃঙ্খলা শেখানোর উদ্দেশ্যে কঠোরতা অবলম্বন করলেও দীর্ঘমেয়াদে তা সন্তানের আত্মবিশ্বাস, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক আচরণের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

চলুন জেনে আসি কী কী প্রভাব পড়তে পারে—

আত্মবিশ্বাস কমে যেতে পারে
বারবার সমালোচনা, বকাঝকা বা অপমানজনক কথা শুনতে শুনতে অনেক শিশু নিজের সক্ষমতা নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ে। তারা মনে করতে পারে যে তারা যথেষ্ট ভালো নয় বা সবসময়ই ভুল করছে। এর ফলে আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়ার পাশাপাশি নতুন কিছু শেখার আগ্রহও হ্রাস পেতে পারে।

কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট ও সহযোগী অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘অতিরিক্ত শাসন সন্তানের মানসিক বিকাশে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সন্তান কী চাইছে আর বাবা-মা কী চাইছেন, সেই জায়গায় কার্যকর যোগাযোগ না থাকলে দূরত্ব তৈরি হয়। এই দূরত্ব স্বাস্থ্যকরভাবে সমাধান না করে বলপ্রয়োগ করা হলে সন্তান আরও জেদি হয়ে উঠতে পারে এবং তার আত্মবিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’

ভয় ও উদ্বেগ বাড়তে পারে
কঠোর শাসন বা সবসময় মারপিঠ করা এমন পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুদের মধ্যে ভয়, দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ বেশি দেখা যেতে পারে। অনেক শিশু অভিভাবকের প্রতিক্রিয়ার ভয়ে নিজের কথা বা অনুভূতি প্রকাশ করতে চায় না। এতে পরিবারে খোলামেলা যোগাযোগের পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি হতে পারে
শিশুরা সাধারণত বাবা-মায়ের কাছেই নিরাপত্তা খোঁজে। কিন্তু যদি অভিভাবকের সঙ্গে সম্পর্ক সবসময় শাসন ও ভয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে সন্তান ধীরে ধীরে নিজের অনুভূতি গোপন করতে শুরু করতে পারে। এমনকি মিথ্যা বলার প্রবণতাও দেখা দিতে পারে। কিশোর বয়সে এই দূরত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।

রাঙামাটি সদর হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. নাসরিন নাহার বলেন, ‘অনেক সন্তান বাবা-মাকে সম্মান করলেও নিজের সমস্যা, ব্যর্থতা বা মানসিক কষ্টের কথা তাদের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। কারণ তারা আশঙ্কা করে, তাদের কথা শোনার পরিবর্তে আবারও বকাঝকা করা হবে। এতে পারিবারিক যোগাযোগ কমে যায় এবং সন্তান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিবার থেকে দূরে সরে যেতে পারে।’

আরও পড়ুন: ছোট ছোট অভ্যাস পরিবর্তনেই কমতে পারে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি

আক্রমণাত্মক আচরণের ঝুঁকি
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত কঠোর আচরণের শিকার হয়, তাদের কেউ কেউ পরবর্তীতে একই ধরনের আচরণ অন্যদের প্রতি প্রদর্শন করতে পারে। অর্থাৎ পরিবারে যে আচরণ তারা দেখে বা অনুভব করে, সেটিই সামাজিক সম্পর্কে প্রতিফলিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

এ বিষয়ে ড. আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘মাত্রাতিরিক্ত শাসনের ফলে সন্তানের সামাজিক দক্ষতার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। বড় হয়ে তারা সম্পর্ক গড়তে ও ধরে রাখতে সমস্যায় পড়ে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তারাও পরবর্তী সময়ে অবচেতনভাবে একই ধরনের কঠোর আচরণ নিজের সন্তানদের সঙ্গে করতে শুরু করে, যা একটি আন্তঃপ্রজন্ম দুষ্টচক্র তৈরি করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব তরুণ দম্পতি ছোটবেলায় শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন কিংবা অবহেলার শিকার হয়েছেন, তাদের অনেকেই পরবর্তী জীবনে নিজেদের সম্পর্কেও একই ধরনের নেতিবাচক আচরণ করছেন।’

সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে
যেসব শিশু সবসময় কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে, তারা অনেক সময় নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে পারে না। ফলে ভবিষ্যতে সমস্যা সমাধান, নেতৃত্ব বা স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

ডা. নাসরিন নাহার বলেন, ‘প্রতিনিয়ত সমালোচনা বা কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকা শিশুরা অনেক সময় নিজের সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। ফলে তারা নতুন কিছু করতে ভয় পায় এবং সবসময় অন্যের অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।’

আবেগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দিতে পারে
রাগ, হতাশা বা দুঃখের মতো অনুভূতি কীভাবে স্বাস্থ্যকরভাবে প্রকাশ করতে হয়, তা শিশুরা পরিবার থেকেই শেখে। যদি তারা নিয়মিত কঠোর প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হয়, তাহলে আবেগ প্রকাশের পরিবর্তে তা চেপে রাখা বা হঠাৎ বিস্ফোরণমূলক আচরণ করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।

শিশুদের ওপর কঠোর শাসনের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা UNICEF। সংস্থাটির ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে ৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ৪০ কোটি শিশু নিয়মিত মানসিক আগ্রাসন বা শারীরিক শাস্তির মুখোমুখি হয়। অর্থাৎ বিশ্বে ৫ বছরের কম বয়সী প্রতি ১০ শিশুর মধ্যে প্রায় ৬ জন নিয়মিত মানসিক বা শারীরিক শাস্তির মুখোমুখি হয়।  ইউনিসেফের মতে, এমন আচরণ শিশুর আত্মমর্যাদাবোধ ও স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। একই সঙ্গে সংস্থাটি ইতিবাচক অভিভাবকত্ব, খোলামেলা যোগাযোগ এবং ভালোবাসাপূর্ণ শাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। 

এমতাবস্তায় কি করা উচিত 
বিশেষজ্ঞদের মতে, শাসনের লক্ষ্য হওয়া উচিত সন্তানকে ভয় দেখানো নয়, বরং দায়িত্বশীল আচরণ শেখানো। এজন্য স্পষ্ট নিয়ম, ধৈর্য, প্রশংসা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং খোলামেলা যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ডা. নাসরিন নাহার দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘সন্তানের আচরণ সংশোধন করতে গিয়ে বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় ভুল হলো আচরণের কারণ না বুঝে সরাসরি শাস্তির পথে যাওয়া। একটি শিশু কেন মিথ্যা বলছে, কেন পড়াশোনায় মনোযোগ দিচ্ছে না বা কেন রাগান্বিত আচরণ করছে, তা বোঝার চেষ্টা না করে শাস্তি দিলে মূল সমস্যার সমাধান হয় না। অন্য সন্তানের সঙ্গে তুলনা করাও বড় একটি ভুল। এতে শিশুর মধ্যে হীনমন্যতা, হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হতে পারে। প্রতিটি শিশুর দক্ষতা ও বিকাশের গতি আলাদা, তাই তুলনার বদলে তার নিজস্ব অগ্রগতির দিকে নজর দেওয়া উচিত।’

এ বিষয়ে ড. আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘বেশি শাসন করলে সন্তান ভালো মানুষ হয় এই ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। সন্তান কোনো যন্ত্র নয় যে তাকে জোর করে ঠিক করতে হবে। বরং তার জন্য এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে সে নিজের কথা বলতে পারে এবং পরিবারে আলাপ-আলোচনার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।’

আরও পড়ুন : গরম খাবার ফুঁ দিয়ে খেলে কী ক্ষতি হয়?

তার মতে, ‘বর্তমানে অনেক বাবা-মা সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপে থাকেন। সেই চাপের প্রভাব অনেক সময় সন্তানের ওপর পড়ে। কিন্তু বাবা-মায়ের মানসিক চাপের দায় সন্তানের নয়। তাই সন্তানের মনস্তত্ত্ব বুঝে ধৈর্য ও সহমর্মিতার সঙ্গে তার সঙ্গে আচরণ করা প্রয়োজন।’

প্রসঙ্গত, শিশুর মানসিক বিকাশে পরিবারের পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ইতিবাচক যোগাযোগ, ভালোবাসা এবং সহানুভূতিশীল আচরণ শিশুর আত্মবিশ্বাস ও মানসিক সুস্থতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। তাই শাসনের প্রয়োজন থাকলেও তা যেন কখনোই অতিরিক্ত চাপ বা ভয়ের কারণ হয়ে না দাঁড়ায়, সেদিকে খেয়াল রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।