এআই দিয়ে গবেষণায় বাড়ছে মানবসৃষ্ট মহামারির শঙ্কা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত অগ্রগতি, জীববিজ্ঞানে যুগান্তকারী আবিষ্কার, উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ গবেষণা, উচ্চ-পুরস্কারের গবেষণার আধিক্য, ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্তঃসারশূন্য জনস্বাস্থ্য খাত; এই সবকিছু মিলিয়ে একটি উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ভবিষ্যতে দুর্ঘটনাবশত বা ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষের তৈরি প্রাণঘাতী জীবাণু বা ভাইরাসের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের সাবেক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘এআইয়ের অগ্রগতি সীমিত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদেরও জটিল গবেষণা বা পরীক্ষায় সফল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে উন্নত প্রযুক্তির সুবিধা যেমন বাড়ছে, তেমনি এর অপব্যবহারের আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।’
অথচ এই ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশ্ব যথেষ্ট প্রস্তুত নাও থাকতে পারে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে এ উদ্বেগ উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মধ্যে অবশ্য এ ঝুঁকি কতটা গুরুতর, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিকে যে প্রযুক্তি ত্বরান্বিত করছে, একই প্রযুক্তি গবেষণাগারে দুর্ঘটনা বা জীবাণুর অপব্যবহারের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কোভিড-১৯ মোকাবিলা সমন্বয়কারী আশীষ ঝা বলেন, ‘কোনো একটি রোগকে লক্ষ্য করে চিকিৎসা করা এবং সেই লক্ষ্যে জিন থেরাপি তৈরি করা থেকে শুরু করে একটি ভাইরাসকে আরও অনেক বেশি ক্ষতিকর কিছুতে পরিণত করার মধ্যে খুব সামান্যই পার্থক্য।’
পরে আশীষ ঝা উদীয়মান জৈবিক হুমকি শনাক্ত করার লক্ষ্যে একটি প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলেছেন। তার মতে, সবচেয়ে বড় উদ্বেগ কোনো রাষ্ট্রের পরিকল্পিতভাবে জৈব অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নয়; বরং কোনো পরিকল্পিত কর্মসূচি থেকে দুর্ঘটনাবশত প্রাণঘাতী জীবাণু ছড়িয়ে পড়া।
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মহামারির পর বিশ্ব আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলেও বিষয়টি হয়তো যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে না। গেইন অব ফাংশন গবেষণা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও এ ধরনের গবেষণা পরিচালনাকারী গবেষণাগারের সংখ্যা কমেনি। বরং বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প প্রশাসনের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের সাবেক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
এ উদ্বেগ আরও বেড়েছে স্ট্যানফোর্ড নেতৃত্বাধীন একদল গবেষকের সাম্প্রতিক সাফল্যে। গবেষকেরা জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে এমন সিন্থেটিক ভাইরাস তৈরি করেছেন, যা প্রকৃতিতে আগে দেখা যায়নি। এসব ভাইরাস ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত ও ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য এর সম্ভাবনা বড় হলেও একই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে আরও জটিল জীব তৈরিতে ব্যবহৃত হতে পারে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অবশ্য এআই দিয়ে জীবাণু তৈরির ক্ষেত্রে এখনো বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। গবেষণার বড় একটি অংশে হাতে-কলমে পরীক্ষাগারের কাজ করতে হয়। অ্যাসোসিয়েশন ফর লং টার্ম এক্সিস্টেন্স অ্যান্ড রেজিলিয়েন্সের প্রতিষ্ঠাতা ডেভিড ম্যানহাইম বলেন, ‘এআই এই বাস্তবতা এড়াতে পারে না যে, সেখানে এমন কিছু উপাদান রয়েছে, যেগুলোর ভৌত যাচাই-বাছাই প্রয়োজন।’ তিনি জানান, ব্যাকটেরিয়াকে লক্ষ্য করে ভাইরাস তৈরি করা আর মানুষকে লক্ষ্য করে ভাইরাস তৈরি করা এখনো এক নয়; দ্বিতীয়টির জন্য আরও অনেক ধাপ পেরোতে হবে।
তবে যেভাবে এআইয়ের প্রভাব দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে ভবিষ্যতের ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। আশীষ ঝা বলেন, ‘যেহেতু এখন এত মানুষ এসব নিয়ে কাজ করছে, আগামী পাঁচ বছরে যে কেউই সফল হবে না, তার সম্ভাবনা কতটুকু?’
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর চলতি বছরের বার্ষিক হুমকি মূল্যায়নেও এ ধরনের উদ্বেগের কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন, উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার প্রচলিত জৈব জীবাণু ও বিষ উৎপাদন এবং ব্যবহারের জ্ঞান ও সক্ষমতা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ন্যানোপ্রযুক্তি ও জিনোম সম্পাদনার মতো ক্ষেত্রে অগ্রগতি নতুন জৈবিক হুমকি তৈরি করতে পারে কিংবা অনিচ্ছাকৃতভাবে রোগজীবাণু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
আরও দেখুন: দীর্ঘদিন ধরে কানে শোঁ শোঁ বা গুনগুন শব্দ শুনছেন? জেনে নিন কী কারণ হতে পারে
তবে ছবির অন্য দিকও রয়েছে। একই এআই প্রযুক্তি জৈবিক হুমকি মোকাবিলায় কাজে লাগানো যেতে পারে। গুগল ডিপমাইন্ড গত জুলাইয়ে এমন একটি বায়োরেজিলিয়েন্স কর্মসূচি চালুর ঘোষণা দিয়েছে, যার লক্ষ্য এআই ব্যবহার করে জৈবিক হুমকি প্রতিরোধ, শনাক্ত ও মোকাবিলা করা।
ট্রাম্প প্রশাসনের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের সাবেক ওই কর্মকর্তা জানান, এ জায়গায় আশাবাদের কারণও আছে। ২০২০ সালের তুলনায় আজ একটি মহামারির মোকাবিলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত জীববিজ্ঞান এবং জৈবপ্রযুক্তি আমাদের আরও ভালো সুযোগ করে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগও বলেছে, উদীয়মান জনস্বাস্থ্য হুমকি মোকাবিলা ও জনগণকে সুরক্ষায় দেশটি পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে। হান্টাভাইরাস-সংশ্লিষ্ট ক্রুজ জাহাজের প্রাদুর্ভাব এবং আফ্রিকায় ইবোলা স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থায় নেওয়া পদক্ষেপকে এর উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে বিভাগটি।
এদিকে, জুলাইয়ে অ্যাক্সিওসের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় সব শীর্ষ এআই বিশেষজ্ঞ ও নেতার কাছে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়গুলোর একটি হলো এমন প্রাণঘাতী জীবাণু, যা খুব দ্রুত ও নীরবে ছড়িয়ে পড়তে পারে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, এআই ও জীববিজ্ঞানের অগ্রগতি যেমন নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে, তেমনি যথাযথ সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে এই প্রযুক্তিই ভবিষ্যতের জৈবিক হুমকি শনাক্ত ও প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তথ্যসূত্র: অ্যাক্সিওস।