২২ জুলাই ২০২৬, ১২:৫৬

বার্ধক্যজনিত সংকট মোকাবিলায় এআইয়ের ওপর ভরসা জাপানের

প্রতীকি ছবি  © এআই সম্পাদিত ছবি

দ্রুত বয়স্ক হয়ে ওঠা জনসংখ্যা ও সংকুচিত কর্মশক্তির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ওপর বড় ধরনের বাজি ধরেছে জাপান। অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে শিল্প উৎপাদন, জ্বালানি ও স্বাস্থ্যসেবা বিভিন্ন খাতে এআই ব্যবহার করে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং দক্ষ জনবল সংকট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে দেশটি।

জাপানের রাজধানী টোকিওর ওতেমাচি এলাকার ভূগর্ভস্থ তাপ ও শীতলীকরণ নেটওয়ার্কে ইতোমধ্যে এআইভিত্তিক একটি প্রকল্প চালু হয়েছে। মারুনোচি হিট সাপ্লাই কোম্পানি প্রায় ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন নেটওয়ার্ক পরিচালনায় টোকিওভিত্তিক এআই প্রতিষ্ঠান প্রিফার্ড নেটওয়ার্কসের তৈরি প্ল্যান্টপাইলট নামের একটি এআই সিস্টেম ব্যবহার করছে।

ঐতিহাসিক পরিচালন তথ্য ও অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের দক্ষতার ভিত্তিতে প্রশিক্ষিত এ সিস্টেম সেন্সরের তথ্য বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির পূর্বাভাস দেয় এবং পরিচালনাগত সিদ্ধান্তে সহায়তা করে। কোম্পানির লক্ষ্য ২০২৭ সালের মধ্যে আরও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনায় যাওয়া।

মারুনোচির উন্নয়ন ও প্রকৌশল বিভাগের সহকারী মহাব্যবস্থাপক হিদেতাকা ইয়াগি বলেন, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দক্ষ কর্মী ধরে রাখা। অভিজ্ঞ কর্মীরা অবসরে গেলে তাদের দীর্ঘদিনের প্রযুক্তিগত জ্ঞান হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এআই সেই জ্ঞান সংরক্ষণ করে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে সহায়ক হতে পারে।

বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক জনসংখ্যার দেশগুলোর একটি জাপান। জনসংখ্যা কমে যাওয়ায় উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থা, জ্বালানি ও স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন খাতে শ্রমিক সংকট বাড়ছে। এ কারণে অনেক দেশের মতো কর্মী প্রতিস্থাপনের পরিবর্তে জাপান এআইকে মানুষের সহযোগী হিসেবে কাজে লাগানোর কৌশল নিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাপানের লক্ষ্য প্রকৌশলী বা দক্ষ কর্মীদের বাদ দেওয়া নয়; বরং মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে এআইয়ের বিশাল তথ্য বিশ্লেষণের সক্ষমতা যুক্ত করে দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করা।

তবে জাপানের এআই পরিকল্পনা শুধু শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় সীমাবদ্ধ নয়। বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে ব্যবধান কমানোর চেষ্টাও করছে দেশটি।

প্রযুক্তিখাতে দীর্ঘদিনের সুনাম থাকলেও বৈশ্বিক ডিজিটাল কোম্পানি তৈরিতে জাপান পিছিয়ে রয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৬৯০টি এবং চীনে প্রায় ১৬০টি ইউনিকর্ন স্টার্টআপ থাকলেও জাপানে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা মাত্র আটটি।

এই চিত্র বদলাতে কাজ করছে টোকিওভিত্তিক স্টার্টআপ সাকানা এআই। এক বছরের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির কর্মী সংখ্যা প্রায় ৫০ থেকে বেড়ে ১৫০ জনে পৌঁছেছে। গবেষণার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি সাকানা চ্যাট, সাকানা মার্লিন ও সাকানা ফুগুসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক পণ্য বাজারে এনেছে।

সাকানা এআইয়ের চেয়ারম্যান রেন ইতো বলেন, ‘এআইয়ে নেতৃত্ব দিতে জাপানের উচিত নয় যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালিকে হুবহু অনুসরণ করা। বরং বাস্তব সমস্যার সমাধানে নতুন ধারণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করতে হবে।’

তার মতে, জাপানের লক্ষ্য ওপেনএআইয়ের আরেকটি সংস্করণ তৈরি করা নয়; বরং এআইকে ব্যবহার করে বাস্তব সমস্যার কার্যকর সমাধান বের করা।

আরও পড়ুন : ফের ইরানে মার্কিন হামলা, যুদ্ধ ব্যয় ৩৭.৫ বিলিয়ন ডলার: হেগসেথ

এআই খাতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনাও নিয়েছে জাপান সরকার। ২০৪০ সালের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর ও উন্নত গবেষণায় সরকারি ও বেসরকারি খাত মিলিয়ে প্রায় ৩৭০ ট্রিলিয়ন ইয়েন (প্রায় ২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার) বিনিয়োগের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বিনিয়োগ করলেই হবে না। গবেষণা অবকাঠামো উন্নয়ন, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা এবং নতুন প্রজন্মের গবেষক ও উদ্ভাবকদের গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একা জাপানের জনসংখ্যাগত ও অর্থনৈতিক সংকটের সম্পূর্ণ সমাধান দিতে না পারলেও উৎপাদনশীলতা, প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এটি দেশটির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। তথ্যসূত্র : আল জাজিরা।