ব্লুটুথের বদলে আবারও কেন তারযুক্ত হেডফোনে ফিরছেন ব্যবহারকারীরা?
একসময় ধারণা করা হয়েছিল, স্মার্টফোন থেকে ৩.৫ মিলিমিটার হেডফোন জ্যাক তুলে দেওয়ার পর তারযুক্ত হেডফোনের যুগও শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। উন্নত শব্দমান, সহজ ব্যবহার এবং পুরোনো প্রযুক্তির প্রতি নতুন আগ্রহের কারণে আবারও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে তারযুক্ত হেডফোন।
২০১৬ সালে অ্যাপল আইফোন ৭ থেকে হেডফোন জ্যাক সরিয়ে দেওয়ার পর ধীরে ধীরে গুগলসহ অন্যান্য নির্মাতাও একই পথে হাঁটে। এরপর ব্লুটুথ হেডফোনই বাজারে আধিপত্য বিস্তার করে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভোক্তাদের একটি বড় অংশ আবারও তারযুক্ত হেডফোনে ফিরে আসছেন।
বিক্রিতে বড় উল্লম্ফন
বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান সার্কানার তথ্য অনুযায়ী, টানা পাঁচ বছর বিক্রি কমার পর ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে তারযুক্ত হেডফোনের বিক্রি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে শুরু করে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় সপ্তাহেই এ খাতের আয় প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
কেন বাড়ছে জনপ্রিয়তা?
অডিও রিভিউ ওয়েবসাইট সাউন্ডগাইজের সম্পাদক ক্রিস থমাসের মতে, একই দামে তারযুক্ত হেডফোনে সাধারণত ব্লুটুথের তুলনায় ভালো মানের শব্দ পাওয়া যায়।
তিনি জানায়, ব্লুটুথ হেডফোনের মান আগের চেয়ে উন্নত হলেও সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া, ডিভাইসের সঙ্গে সামঞ্জস্য সমস্যা বা অডিও কমপ্রেশনের কারণে অনেক সময় প্রত্যাশিত অভিজ্ঞতা পাওয়া যায় না। অন্যদিকে তারযুক্ত হেডফোনে শুধু প্লাগ ইন করলেই ব্যবহার করা যায়।
শুধু শব্দ নয়, প্রযুক্তি ক্লান্তিও কারণ
যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগনের বাসিন্দা আরিন গ্রুসিন বলেন, ‘প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে মানুষ ক্রমেই ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। অনেকেই এখন এমন প্রযুক্তি খুঁজছেন, যা সহজ, নির্ভরযোগ্য এবং অতিরিক্ত ঝামেলামুক্ত। তারযুক্ত ইয়ারফোন ব্যবহারে এক ধরনের স্বস্তি পাওয়া যায় এবং এটি মানুষকে ডিজিটাল নির্ভরতা থেকে কিছুটা দূরে থাকার অনুভূতি দেয়।’
ফ্যাশন ট্রেন্ডেও জায়গা করে নিয়েছে
তারযুক্ত হেডফোন এখন শুধু প্রযুক্তিপণ্য নয়, ফ্যাশনেরও অংশ হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওয়্যার্ড ইট গার্লস নামে জনপ্রিয় একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে তারযুক্ত হেডফোন ব্যবহারকারী সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে আরিয়ানা গ্রান্ডে ও চার্লি এক্সসিএক্সের মতো তারকাদের ছবি নিয়মিত প্রকাশ করা হয়।
রবার্ট প্যাটিনসন ও লিলি-রোজ ডেপসহ অনেক তারকাকেও সম্প্রতি তারযুক্ত ইয়ারবাড ব্যবহার করতে দেখা গেছে।
ব্লুটুথ নিয়ে বাড়ছে বিরক্তি
অভিনেত্রী জোয়ে ক্রাভিটজ সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, শুধু হেডফোন নয়, সামগ্রিকভাবে ব্লুটুথ সংযোগই অনেক সময় নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করে না। গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া বা ডিভাইস পেয়ারিংয়ের ঝামেলা ব্যবহারকারীদের বিরক্ত করছে।
এ ছাড়া ব্লুটুথ ইয়ারবাডের ব্যাটারি শেষ হয়ে যাওয়া, ছোট হওয়ায় হারিয়ে ফেলা এবং বারবার চার্জ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও অনেককে তারযুক্ত বিকল্পে ফিরিয়ে আনছে।
আরও পড়ুন : দেশের ৪ জেলায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতির আভাস
পুরোনো প্রযুক্তির প্রত্যাবর্তন
বিশ্লেষকদের মতে, তারযুক্ত হেডফোনের জনপ্রিয়তা আসলে পুরোনো প্রযুক্তির প্রতি মানুষের নতুন আগ্রহেরই অংশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডিভিডি, ক্যাসেট, টিউব টিভি, টাইপরাইটার এমনকি ফিল্ম ক্যামেরার প্রতিও আগ্রহ বাড়ছে। এদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও অতিরিক্ত ডিজিটাল নির্ভরতার যুগে মানুষ আবারও তুলনামূলক সরল ও বাস্তব অভিজ্ঞতার দিকে ঝুঁকছেন।
অ্যাপলও এখনও বিক্রি করছে
আইফোন থেকে হেডফোন জ্যাক সরিয়ে দিলেও অ্যাপল এখনও তারযুক্ত ইয়ারপডস বিক্রি করে। কয়েক বছর আগে কোম্পানির প্রধান নির্বাহী টিম কুকও স্বীকার করেছিলেন, এখনও অনেক মানুষ তারযুক্ত হেডফোন কিনছেন।
বর্তমানে ইউএসবি-সি বা লাইটনিং সংযোগযুক্ত তারযুক্ত হেডফোনের পাশাপাশি অ্যাডাপ্টারের (ডংগল) মাধ্যমে ৩.৫ মিলিমিটার জ্যাকের হেডফোনও ব্যবহার করা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্লুটুথ হেডফোনের সুবিধা অস্বীকার করার সুযোগ না থাকলেও উন্নত শব্দমান, সহজ ব্যবহার এবং নির্ভরযোগ্যতার কারণে তারযুক্ত হেডফোনের চাহিদা আবারও বাড়ছে। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের মধ্যেও পুরোনো এই ডিভাইসটি নতুন করে জায়গা করে নিচ্ছে ব্যবহারকারীদের দৈনন্দিন জীবনে। তথ্যসূত্র: বিবিসি।