সমুদ্রের ৭ কিলোমিটার নিচে তিমির ‘সমাধি’, জানা গেল ৫০ লাখ বছরের পুরোনো রহস্য
দক্ষিণ-পূর্ব ভারত মহাসাগরের গভীরে, যেখানে সূর্যের আলো কখনও পৌঁছায় না, সেখানে লুকিয়ে ছিল এক বিস্ময়কর জগত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭ হাজার মিটার নিচে গবেষকদের একটি ডুবোযান উন্মোচন করেছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও গভীর তিমির সমাধিক্ষেত্র। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে কয়েক হাজার ফুট নিচে, মৃত বা মুমূর্ষু তিমিরা এক বিশাল সমাধিক্ষেত্রে সামনে এসেছে, যেখানে প্রায় ৭৪৬ মাইল (১,২০০ কিলোমিটার) দীর্ঘ একটি এলাকাজুড়ে তাদের হাড়গুলো একে অপরের সাথে মিশে গেছে।
সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার 'নেচার' জার্নালে একদল গবেষক জানিয়েছে, জীবাশ্মগুলোর বয়সের উপর ভিত্তি করে সবচেয়ে পুরোনো হাড়গুলোর পাশাপাশি আধুনিক কঙ্কালও পাওয়া গেছে, যা থেকে বোঝা যায় যে তিমির দেহাবশেষ অন্তত ৫০ লক্ষ বছর ধরে এই স্থানে অবিচ্ছিন্নভাবে জমা হয়ে আছে। অধিকাংশ দেহাবশেষই ঠোঁটওয়ালা তিমির, যাদের খুলি ডলফিনের মতো সরু থুথনির দিকে ক্রমশ সরু হয়ে আসে।
এ তিমিরা গভীর জলে ডুব দেয় এবং উপরিভাগের কাছাকাছি খুব কম সময় কাটায়, তাই এদের খুব কমই দেখা যায় এবং এদের অভ্যাস সম্পর্কেও খুব কমই জানা যায়। গবেষকরা সেখানে এমন কিছু তিমির মৃতদেহ পেয়েছেন যেগুলো তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। এসব মৃতদেহে তখনও ভিড় করেছিল নানা ধরনের শবভোজী প্রাণী।
‘হোয়েল ফলস’ নামে পরিচিত এই মৃতদেহগুলো গভীর সমুদ্রের বিভিন্ন জীবগোষ্ঠীর জীবনধারণে সহায়তা করে, যার মধ্যে রয়েছে হাড়খেকো কৃমি, শামুক, লম্বা বাহুযুক্ত ভঙ্গুর তারামাছ এবং দ্বিকপাটী ঝিনুক, যারা কেমোসিন্থেসিস—অর্থাৎ রাসায়নিক শক্তি ব্যবহার করে খাদ্য উৎপাদনের মাধ্যমে বেঁচে থাকে। গবেষণার লেখকরা জানিয়েছেন, এই প্রজাতিগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই বিজ্ঞানের কাছে নতুন হতে পারে।’
একটি অ্যান্টার্কটিক মিঙ্কে তিমির মৃতদেহেই ২৬ প্রজাতির অমেরুদণ্ডী প্রাণীর উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের ধারণা, এসবের অনেকগুলোই বিজ্ঞানের কাছে সম্পূর্ণ নতুন প্রজাতি হতে পারে।
অপ্রত্যাশিত কিছু বিষয়
অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত ডায়ামান্টিনা ফ্র্যাকচার জোনে গবেষণা চালায় আন্তর্জাতিক একদল বিজ্ঞানী। এ গবেষণার অংশ হিসেবে ২০২৩ সালে ৩২টি ডুব অভিযান পরিচালনা করা হয়। ‘ফেনদৌঝে’ নামের একটি গভীর সমুদ্র ডুবোযান ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা ৪৩টি জীবাশ্ম সংগ্রহ করেন এবং শত শত হাড়ের অবস্থান নথিভুক্ত করেন। অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন চীনের ইনস্টিটিউট অব ডিপ-সি সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের গবেষক পেং ঝোউ।
তিনি বলেন, ‘যদিও এটি একটি বিশাল তিমির সমাধিক্ষেত্র, এর গভীরতার কারণে সেখানে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু আমরা যখন প্রথম স্থানটি দেখি, সেটি সবার জন্যই সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল।’
আরও পড়ুন : হরমোন নাকি মানসিক চাপ—নারীদের মুড সুইংয়ের আসল কারণ কী?
১ কোটি তিমির দেহাবশেষের সম্ভাবনা
গবেষকদের সবচেয়ে বিস্মিত করেছে জীবাশ্মের ঘনত্ব। কিছু এলাকায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৭৬০টি জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। পেং ঝোউর ভাষায়, ‘আমাদের হিসাব অনুযায়ী, এই খাদের সমুদ্রতলে এক কোটিরও বেশি তিমির দেহাবশেষ থাকতে পারে। তবে তিনি মনে করেন, সমুদ্রতলের পলির নিচে চাপা পড়ে থাকা আরও অসংখ্য জীবাশ্ম এখনো আবিষ্কারের অপেক্ষায় রয়েছে।’
মিলল নতুন প্রজাতির সন্ধান
এই অভিযানে বিজ্ঞানীরা পূর্বে অজানা একটি বিলুপ্ত তিমি প্রজাতির জীবাশ্মও শনাক্ত করেছেন। নতুন প্রজাতিটির নাম দেওয়া হয়েছে Tasmacetus diamantinai। গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার ঠোঁটওয়ালা তিমিদের বিবর্তন সম্পর্কে নতুন তথ্য দেবে এবং প্রমাণ করে যে অত্যন্ত বিশেষায়িত এসব তিমির বিকাশ বহু আগেই ঘটেছিল।
কেন এই জায়গাতেই জড়ো হয় এত তিমি?
গবেষকদের ধারণা, ডায়ামান্টিনা অঞ্চলের ভি-আকৃতির ভূসংস্থান এই রহস্যের উত্তর লুকিয়ে রেখেছে। এলাকাটি গভীর সমুদ্রে বিচরণকারী ঠোঁটওয়ালা তিমিদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল ও পরিযায়ী পথ। তিমিগুলো যখন অত্যন্ত গভীরে ডুব দেয়, তখন ক্লান্তি বা ডিকম্প্রেশন সিকনেসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। মৃত্যুর পর তাদের দেহ ওই খাদ বরাবর নিচে নেমে আসে এবং হাজার হাজার বছর ধরে একই অঞ্চলে জমা হতে থাকে। গভীর সমুদ্রের ধীরগতির পরিবেশ ও খনিজ পদার্থের আস্তরণ পরে হাড়গুলোকে জীবাশ্মে পরিণত করে।
আরও পড়ুন: মেডিকেল ভর্তির প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে পুলিশের সঙ্গে বিমান ও আধাসেনা মোতায়েন, নজরবন্দি শিক্ষকরা
বিজ্ঞানীদের মতে, ডায়ামান্টিনা অঞ্চলের এই ‘তিমির নেক্রোপলিস’ বা সমাধিক্ষেত্র শুধু অতীতের জীবনের দলিল নয়; এটি গভীর সমুদ্রের বর্তমান বাস্তুতন্ত্রেরও এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, যেখানে মৃত্যু থেকেই জন্ম নিচ্ছে নতুন জীবনের গল্প। ঠোঁটওয়ালা তিমি পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় সামুদ্রিক স্তন্যপায়ীদের একটি।
আন্তর্জাতিক তিমি সংরক্ষণ সংস্থা ও গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ঠোঁটওয়ালা তিমি (Beaked Whale) পৃথিবীর সবচেয়ে কম পরিচিত সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীগুলোর একটি। বর্তমানে এদের প্রায় ২৪টিরও বেশি প্রজাতি শনাক্ত করা হয়েছে। এরা জীবনের বেশিরভাগ সময় গভীর সমুদ্রে কাটায় বলে বিজ্ঞানীরা এদের আচরণ সম্পর্কে এখনও সীমিত তথ্য জানেন।
প্রসঙ্গত, আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ও সামুদ্রিক বিজ্ঞানীদের মতে, ঠোঁটওয়ালা তিমি পৃথিবীর সবচেয়ে কম পরিচিত সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীগুলোর মধ্যে অন্যতম। এরা ৩ হাজার মিটারেরও বেশি গভীরে ডুব দিতে পারে এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানির নিচে অবস্থান করতে সক্ষম।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডায়ামান্টিনা অঞ্চলে আবিষ্কৃত এই বিশাল তিমি সমাধিক্ষেত্র শুধু একটি জীবাশ্মভাণ্ডার নয়; এটি কোটি বছরের সামুদ্রিক বিবর্তন, গভীর সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্র এবং জলবায়ুর ইতিহাস সম্পর্কে নতুন তথ্য উন্মোচনের সুযোগ তৈরি করেছে। NOAA Fisheries, UNESCO এবং Nature-এ প্রকাশিত গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের অধিকাংশ গভীর সমুদ্র এখনও অনাবিষ্কৃত থাকায় ভবিষ্যতে এই অঞ্চল থেকে আরও নতুন প্রজাতি ও গুরুত্বপূর্ণ জীবাশ্ম আবিষ্কারের সম্ভাবনা রয়েছে।