ঢাবি ছেড়ে জাবির আইনে ভর্তি, প্রথমবারেই সিভিল জজ সাবিকুন নাহার
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ১১৮তম হয়ে ইংরেজি পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন সাবিকুন নাহার। তবে বড় ভাইয়ের পরামর্শে সেই সুযোগ ছেড়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিচার বিভাগে ভর্তি হন তিনি। বিচারক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে শুরু করা সেই পথচলায় প্রথমবার বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় অংশ নিয়েই ১০৬তম হয়ে সিভিল জজ পদে নিয়োগের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন জাবির ৪৮তম আবর্তনের এই শিক্ষার্থী।
সাবিকুন নাহারের নিজ জেলা ময়মনসিংহ। তবে মায়ের সরকারি চাকরির সুবাদে কুমিল্লায় তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। ময়মনসিংহকে নিজের শিকড় মনে করলেও কুমিল্লার সঙ্গে তার শৈশবের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে।
বিজিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সিভিল জজ হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার অনুভূতি জানিয়ে সাবিকুন নাহার বলেন, ‘এই অনুভূতি আসলে ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আমার এবং আমার পরিবারের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। সবচেয়ে বড় আনন্দ হলো, বাবা-মা ও পরিবারের মুখে হাসি ফুটাতে পেরেছি। এই অনুভূতিটাই আমার কাছে সবচেয়ে বেশি মূল্যবান।’
বড় ভাইয়ের পরামর্শেই আইন পড়া
বিচারক হওয়ার স্বপ্নটা সাবিকুন নাহারের আগে দেখেছিলেন তার বড় ভাই। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সময় বড় ভাইয়ের সেই পরামর্শই তার সিদ্ধান্ত বদলে দেয়।
সাবিকুন নাহার বলেন, ‘২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় আমার অবস্থান ছিল ১১৮তম। সেখানে আমার বিষয় হিসেবে ইংরেজি এসেছিল। অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ২২তম হয়ে আইন বিষয়ে পড়ার সুযোগ পাই। ফলে কোন বিষয়ে পড়ব, তা নিয়ে দ্বিধায় ছিলাম। তখন আমার বড় ভাই পরামর্শ দেন, আমি যেন আইন পড়ি এবং ভবিষ্যতে বিচারক হওয়ার চেষ্টা করি। বড় ভাইয়ের পরামর্শেই আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হই। মূলত বিচারক হওয়ার উদ্দেশ্য ও স্বপ্ন নিয়েই আমার আইন পড়ার যাত্রা শুরু। আল্লাহর রহমতে আজ সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।’
পরিবার ও শিক্ষকদের অবদান
নিজের সাফল্যের পেছনে পরিবারের পাশাপাশি শিক্ষকদের অবদানের কথাও উল্লেখ করেন সাবিকুন নাহার। তার বাবা-মা ও দুই ভাই বিভিন্নভাবে তাকে উৎসাহ ও সহযোগিতা করেছেন বলে জানান তিনি।
আরও দেখুন: সপ্তাহের সেরা ১৫ সরকারি চাকরি
সাবিকুন নাহার বলেন, ‘আমার এই পথচলায় আমার পরিবার ও শিক্ষকদের সবারই অবদান রয়েছে। আমার পরিবার সবসময় আমার প্রতি অত্যন্ত সহযোগিতাপূর্ণ ছিল। আমার বাবা-মা, আমার দুই ভাই বিভিন্নভাবে আমার পাশে থেকে আমাকে উৎসাহ ও সহযোগিতা করেছেন এবং কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সাহায্য করেছেন।’
নিজের ও পরিবারের স্বপ্ন পূরণের প্রবল ইচ্ছার পাশাপাশি একজন বিচারক হিসেবে দেশ ও সমাজের জন্য ইতিবাচক অবদান রাখার সুযোগও তাকে অনুপ্রাণিত করেছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের যে সুযোগ একজন বিচারকের রয়েছে, সেটিও আমাকে বিচারক হওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করেছে। এই লক্ষ্য, পরিবারের সমর্থন এবং নিজের পরিশ্রম—সবকিছু মিলেই আমাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।’
দিনে গড়ে ৮ ঘণ্টা পড়াশোনা
মাস্টার্স শেষ করার পর হল ছেড়ে বাসায় চলে যান সাবিকুন নাহার। এরপর ২০২৫ সাল থেকে গুরুত্ব দিয়ে বিজেএসের প্রস্তুতি শুরু করেন তিনি। এ সময় গড়ে প্রতিদিন প্রায় আট ঘণ্টা পড়াশোনা করেছেন।
প্রস্তুতির ধরন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বিজেএসের সিলেবাস অনুযায়ী প্রতিটি বিষয় পরিকল্পনা করে পড়েছি। বিগত বছরের প্রশ্নগুলো বিশ্লেষণ করে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো চিহ্নিত করেছি এবং সেগুলোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়ে প্রস্তুতি নিয়েছি।’
পরিকল্পিত ও সুনির্দিষ্ট প্রস্তুতিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। সাবিকুন বলেন, ‘আমি মূলত প্রিসাইস প্রেপারেশনে বিশ্বাসী। অগোছালোভাবে অনেক কিছু পড়ার চেয়ে পরিকল্পিত ও সুনির্দিষ্টভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ভালোভাবে প্রস্তুত করাকে বেশি কার্যকর মনে করি।’
আইনের ক্ষেত্রে মূল আইন বা বেয়ার অ্যাক্ট এর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত রিভিশন এবং পরীক্ষা দেওয়ার অভ্যাসও রেখেছিলেন তিনি।
আরও দেখুন: স্ত্রীকে হত্যা করে মাটিচাপা দিয়েছিলেন সাবেক স্বামী, ৭ দিন পর উদ্ধার করল পুলিশ
প্রথমবারের ভাইভাতেই সাফল্য
বিজেএসের ভাইভায় এবারই প্রথম অংশ নিয়েছিলেন সাবিকুন নাহার। প্রথমবারেই সফল হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি এই প্রথমবার বিজেএসের ভাইবা দিয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমাকে প্রথমবারেই সফল করেছেন।’
ভাইবার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়েছে, ভাইবা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। কারণ এই পরীক্ষার মাধ্যমে শুধু একজন প্রার্থীর আইনের জ্ঞান যাচাই করা হয় না; বরং তার দেশ ও বিশ্ব সম্পর্কে ধারণা, ব্যক্তিত্ব, কথা বলার ধরন, আচরণ এবং মানসিক পরিপক্বতাও লক্ষ্য করা হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ ছাড়া প্রার্থী কেন বিচারক হতে চান, তার মূল্যবোধ কেমন, দায়িত্বশীলভাবে বিচারিক দায়িত্ব পালন করার মানসিকতা ও সক্ষমতা আছে কি না এসব বিষয়ও বিভিন্ন প্রশ্নের মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করা হয়।’
ভাইবার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে শুধু আইন পড়লেই হবে না বলে মনে করেন সাবিকুন। তার মতে, দেশ ও বিশ্বে কী ঘটছে, সে সম্পর্কেও ধারণা রাখতে হবে। এজন্য নিয়মিত পত্রিকা পড়া ও খবর দেখার অভ্যাস গড়ে তোলার পরামর্শ দেন তিনি।
বোর্ডের সামনে স্বাভাবিক ও হাসিমুখে থাকার পরামর্শ দিয়ে সাবিকুন নাহার বলেন, ‘বিনয়ের সঙ্গে প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে এবং কোনো প্রশ্নের উত্তর জানা না থাকলে অপ্রয়োজনীয়ভাবে কিছু না বলে তা স্বীকার করাই ভালো। সবশেষে, নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বোর্ডের মুখোমুখি হতে হবে।’
নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে
বিচারক হতে আগ্রহীদের উদ্দেশ্যে নিজের ওপর বিশ্বাস রাখার পরামর্শ দিয়েছেন সাবিকুন নাহার। তিনি বলেন, ‘প্রথমেই নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে যে আমি পারব। এই আত্মবিশ্বাসটা খুবই জরুরি। যেকোনো সরকারি চাকরির প্রস্তুতিতে ধৈর্য ও মানসিক প্রস্তুতির গুরুত্ব অনেক। গোছানো ও স্মার্ট প্রেপারেশন নিতে হবে। সততা, নিষ্ঠা ও ধৈর্যের সঙ্গে নিয়মিত পরিশ্রম করতে হবে। নিজের দুর্বলতা চিহ্নিত করে সেগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করতে হবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, দীর্ঘ প্রস্তুতির সময় হতাশ না হয়ে নিজের লক্ষ্যের প্রতি স্থির থাকা।’
আরও দেখুন: স্নাতকোত্তর ও পিএইচডিতে স্কলারশিপের সুযোগ দেবে অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়
সিভিল জজ হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেলে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে মানুষের পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন সাবিকুন নাহার।
তিনি বলেন, ‘সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে আমার জ্ঞান, মেধা ও অভিজ্ঞতাকে যেন দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাতে পারি এবং বিচারপ্রার্থী মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল থেকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে পারি, সেই চেষ্টা সবসময় থাকবে ইনশাআল্লাহ।’