২৩ জুলাই ২০২৬, ০০:৪৯

‘আমি জগন্নাথের শের’— বলে জবি শিক্ষার্থীর ওপর ছাত্রদল নেতার হামলার অভিযোগ

অভিযুক্ত শের আলী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ছাত্রদলের লোগো   © টিডিসি সম্পাদিত

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) এক শিক্ষার্থী, তার ছোট ভাই ও হবু স্ত্রীর ওপর হামলা, মারধর, প্রাণনাশের হুমকি এবং হবু স্ত্রীকে হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মডার্ন ল্যাঙ্গুয়েজেস (আইএমএল) শিক্ষার্থী ও জবি শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য শের আলীর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে সুষ্ঠু বিচার ও নিজের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী।

জানা গেছে, ভুক্তভোগী হাসানান আল আবিত (সাবায়েত) বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের (১৮ ব্যাচ) শিক্ষার্থী। অভিযুক্ত শের আলী ও আবিদ হাসান বাঁধন ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের (১৮ ব্যাচ) যথাক্রমে ইংরেজি এবং ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষার্থী।

প্রক্টর বরাবর দেওয়া লিখিত অভিযোগে আবিত উল্লেখ করেন, গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত আনুমানিক ১২টার পর তিনি তার ছোট ভাই, হবু স্ত্রী ও ছোট ভাইয়ের এক বন্ধুকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন। একপর্যায়ে হবু স্ত্রীর সঙ্গে সামান্য মনোমালিন্য হলে তিনি ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যেতে চান। তখন তার ছোট ভাই ও বন্ধু তাঁকে শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন।

অভিযোগে বলা হয়, এ সময় মোটরসাইকেলে করে ঘটনাস্থলে এসে কোনো কিছু না জিজ্ঞেস করেই শের আলী তার ছোট ভাই ও বন্ধুকে মারধর শুরু করেন। তখন আবিতের হবু স্ত্রী তাদের থামানোর চেষ্টা করে জানান, তারা সবাই একই পরিবারের সদস্য। কিন্তু এরপরও হামলা থামেনি। বরং শের আলী অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন।

শোরগোল শুনে আবিত ঘটনাস্থলে গেলে তাকেও ধাক্কা দেওয়া হয় এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, একপর্যায়ে শের আলী পাশের একটি চায়ের দোকান থেকে পেরেকযুক্ত কাঠের তক্তা এনে তাকে মারধর করেন এবং বলেন, ‘আমি জগন্নাথের শের, তোকে আজ মেরেই ফেলব।’

অভিযোগে আরও বলা হয়, এ ঘটনায় ১৮তম ব্যাচের শাওন, ২০তম ব্যাচের রাব্বিসহ আরও কয়েকজন অংশ নেন। হামলার সময় ভুক্তভোগীর হবু স্ত্রীকে মানসিকভাবে হেনস্তা করা হয় এবং তাকে পেরেকযুক্ত তক্তা দিয়ে আঘাতের চেষ্টাও করা হয়।

এ বিষয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী হাসানান আল সাবায়েত বলেন, ঘটনার সময় আমি আমার ছোট ভাই জায়েম ও বাগদত্তাকে নিয়ে ক্যাম্পাসে ছিলাম। একপর্যায়ে আমার বাগদত্তা চলে যেতে চাইলে আমার ছোট ভাই তাঁকে বুঝিয়ে ফেরানোর চেষ্টা করছিল। তখন শের আলী ও আবিদ হাসান বাঁধন কোনো কারণ ছাড়াই আমার ছোট ভাইকে মারধর করে। 

তিনি আরও বলেন, আমি প্রতিবাদ করলে শের আলী আমাকে হুমকি দেয়। পরে ক্যাম্পাস থেকে বের হওয়ার সময় ভিক্টোরিয়া পার্কসংলগ্ন এলাকায় কয়েকজনকে নিয়ে আমার ওপর হামলা চালানো হয়। পেরেকযুক্ত কাঠ দিয়ে আঘাত করায় আমার মাথা, ঘাড়, হাতসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত লাগে এবং আমার ছোট ভাইও আহত হয়।

শের আলীর ফেসবুক পোস্টের বিষয়ে সাবায়েত বলেন, ‘আমাকে ও আমার বাগদত্তাকে নিয়ে নেশাগ্রস্ত থাকা বা আপত্তিকর অবস্থায় থাকার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করলেই প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে। আমি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দোষীদের বিচার এবং আমার ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি।’

ভুক্তভোগীর হবু স্ত্রী দিঘী বলেন, ‘ঘটনার পর থেকেই বিচার পাওয়ার জন্য চেষ্টা করছি। প্রথমে সুত্রাপুর থানায় গেলেও পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দেই। আমাদের বিরুদ্ধে নেশাগ্রস্ত থাকা বা আপত্তিকর অবস্থায় থাকার অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আমি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শের আলী বলেন, ‘ঘটনাটি নিয়ে আমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্য দিয়েছি। প্রশাসন সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করলেই প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট হবে। অভিযোগে যে হামলা ও হেনস্তার কথা বলা হয়েছে, তা সঠিক নয়। সাবায়েতই আমাকে ধাক্কা দিয়ে মারধর করেন। আমি তদন্তে সহযোগিতা করব।’

আরও পড়ুন: যোগ্যতা ছাড়াই এমপিও, জাল সনদে চাকরি—কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম আছাদনগর ফাজিল মাদ্রাসায়

ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা অভিযুক্ত আবিদ হাসান বাঁধন বলেন, ‘বহিরাগত এক ছেলে ও এক মেয়ের পরিচয় জানতে চাইলে বাকবিতণ্ডা হয়। পরে সাবায়েত এসে শের আলীকে ধাক্কা দেন। আমরা পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করি। পরে ক্যাম্পাসের বাইরে উভয় পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি হয় এবং উভয় পক্ষই আঘাতপ্রাপ্ত হয়।’

এ বিষয়ে জবি শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল বলেন, ‘সাংবাদিকদের মাধ্যমে বিষয়টি জেনেছি। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে যদি শের আলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, ‘অভিযোগকারী লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন এবং সেটি প্রশাসন আমলে নিয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের ডেকে তাদের বক্তব্য নেওয়া হবে। এ ঘটনায় উপস্থিত অন্য ব্যক্তিদের বক্তব্যও শোনা হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অভিযুক্ত শের আলীকে তলব করা হয়েছে। তার বক্তব্য শোনার পর প্রশাসন বিষয়টি নিয়ে বসে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রয়োজন হলে সিসিটিভি ফুটেজসহ অন্যান্য তথ্য-প্রমাণও পর্যালোচনা করা হবে।’