প্রতিকূলতার মধ্যেই টিউশনি করে প্রস্তুতি, শিক্ষার পর কৃষি ক্যাডার সোহেলের বিসিএস জয়ের গল্প
শৈশব কেটেছে একাধিক জায়গায়। পারিবারিক প্রতিকূলতাও কম ছিল না। কখনো নিজের খরচ চালাতে টিউশনি করেছেন। তবু থেমে থাকেননি সোহেল হোসেন বিপ্লব। সেই পথচলায় প্রথমে ৪৪তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। এবার ৪৫তম বিসিএসে কৃষি ক্যাডারের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে গেজেটও পেয়েছেন তিনি।
নিজের সাফল্যের অনুভূতি জানাতে গিয়ে সোহেল বলেন, ‘সৃষ্টিকর্তার নিকট অসংখ্য শুকরিয়া যে চেষ্টা করেছিলাম এবং একটি কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছাতে পেরেছি। আমার ১ম বিসিএস ৪৪তম ছিল এবং শিক্ষা ক্যাডার পাই। পরবর্তী বিসিএস ৪৫তমতে কৃষি ক্যাডারের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদে সুপারিশ ও গেজেটেড হই। খুবই সুন্দর অনুভূতি, সর্বদা যেন সাফল্যের ধারা রাখতে পারি, সে জন্য চেষ্টা করব।’
সোহেলের শৈশব কেটেছে খুলনা শহর, পিরোজপুরের গ্রাম ও কুমিল্লায়। জায়গা বদলের সঙ্গে বদলেছে তার চারপাশের পরিবেশও। তবে শৈশবের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল পারিবারিক পরিস্থিতি। ব্রোকেন ফ্যামিলির সন্তান হিসেবে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠতে হয়েছে তাকে। তারপরও পরিবারের সদস্য ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতা এবং নিজের চেষ্টায় সামনে এগিয়ে গেছেন।
কুমিল্লায় উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনার সময় গ্রামে থেকে টিউশনি করিয়ে নিজের খরচ চালাতেন সোহেল। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনেও পড়াশোনার পাশাপাশি নানা কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন। বিতর্ক, নাচ, কবিতা ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকার পাশাপাশি বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দময় সময় কাটিয়েছেন।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম বর্ষ থেকেই বিভিন্ন ক্যারিয়ারবিষয়ক সেমিনারে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান সোহেল। শুরুতে দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৬তম বিসিএসে নিয়োগপ্রাপ্ত সিনিয়রদের দেখে বিসিএসের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়।
বিসিএসের প্রস্তুতি অবশ্য একদিনে শুরু হয়নি। প্রথম দিকে একেক বছর একটি করে বই কিনেছেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষে পাঁচ বন্ধু মিলে গণিত ও ইংরেজিতে গ্রুপ স্টাডি শুরু করেন। করোনাকালে প্রস্তুতিতে আরও মনোযোগী হন তিনি।
সোহেল বলেন, ‘পরবর্তীতে করোনা লকডাউনের শেষের দিকে কুমিল্লা থেকে খুলনায় যাই এবং টিউশনির পাশাপাশি বিসিএস পড়া শুরু করি। শেখার আগ্রহ থাকায় সবার কাছ থেকেই যেভাবে পেরেছি পড়াশোনায় কাজে লাগিয়েছি। শিক্ষক ও সিনিয়ররা সবসময় মোটিভেশন দিয়েছে।’
২০২১ সালের লকডাউনে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক চাপ তুলনামূলক কম থাকায় প্রস্তুতির জন্য বেশি সময় পেয়েছিলেন সোহেল। এ সময় নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি লাইভ এমসিকিউ অ্যাপে পরীক্ষা দেওয়া তার প্রস্তুতিতে সহায়ক হয়।
বিসিএসের মতো দীর্ঘ প্রস্তুতির ক্ষেত্রে সোহেল গুরুত্ব দিয়েছেন নিয়মিত পড়াশোনা ও শেখার আগ্রহকে। তার প্রস্তুতির মূলমন্ত্র ছিল ‘Learn with happiness’। অর্থাৎ আনন্দের সঙ্গে অল্প অল্প করে নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া।
তার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে সব বিষয়ে সমান দক্ষ হওয়ার চেষ্টা করার পাশাপাশি যেসব বিষয়ে দুর্বলতা রয়েছে, সেগুলো অন্যের সহযোগিতা নিয়ে বুঝে নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক ও সিনিয়রদের উৎসাহ তাকে প্রস্তুতির পথে এগিয়ে যেতে সহায়তা করেছে।
৪৪তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর ৪৫তম বিসিএসে কৃষি ক্যাডারের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হন সোহেল। তবে তার ক্যাডার পছন্দের তালিকায় বরাবরই প্রথমে ছিল পররাষ্ট্র ক্যাডার। এরপর প্রশাসন, শুল্ক ও আবগারি, নিরীক্ষা ও হিসাব, কর এবং কৃষি ক্যাডার রেখেছিলেন।
আন্তর্জাতিক বিষয়ে দেশে ও দেশের বাইরে কাজ করার আগ্রহ থেকেই পররাষ্ট্র ক্যাডারকে প্রথম পছন্দ হিসেবে রেখেছেন বলে জানান তিনি। ক্যাডার পছন্দের বিষয়ে সোহেলের পরামর্শ, নিজের আগ্রহ ও লক্ষ্যকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ক্যাডার সম্পর্কে বাস্তব ধারণা নিতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, যার যার পছন্দের ক্যাডার প্রথমে দেওয়া উচিত। অন্তত চেষ্টা করুন সর্বোচ্চ। এজন্য পছন্দক্রম দেওয়ার পূর্বে সিনিয়রদের থেকে বাস্তব অভিজ্ঞতা জানা জরুরি। বিসিএসের প্রস্তুতি নিতে হবে ধৈর্য ধরে। প্রতিযোগিতা বাড়ার পাশাপাশি প্রশ্নের ধরনেও পরিবর্তন আসছে। তাই শুধু মুখস্থনির্ভর প্রস্তুতি না নিয়ে জীবনের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
সোহেল বলেন, ‘বিসিএসে প্রতিযোগিতা বাড়ছে সঙ্গে প্রশ্নের ধরনও। তাই নিজেকে ধৈর্যের সঙ্গে তৈরি করুন। আসলেই পুরো জীবনের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার একটা নির্যাস বিসিএস ভাইভায় প্রতিফলিত হয়।’
তবে বিসিএসকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বানানোর পক্ষে নন তিনি। সোহেল বলেন, নিজের স্বপ্ন পূরণে বিকল্প পরিকল্পনাও থাকা প্রয়োজন। সোহেল বলেন, ‘বিসিএস একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। আপনার স্বপ্ন ও লক্ষ্যের জন্য এগিয়ে যেতে হবে। প্রয়োজনে প্ল্যান এ, প্ল্যান বি, প্ল্যান সি এভাবে সেট করুন। সময় গেলে সাধন হবে না। তাই শুধু বিসিএস নয়।’
সোহেলের পথচলায় পরিবারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পারিবারিক কঠিন সময়েও যেন পড়াশোনায় ব্যাঘাত না ঘটে, সে বিষয়ে পরিবারের সদস্যরা সচেষ্ট ছিলেন। তাদের সহযোগিতা ও সমর্থন তাকে নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকতে সাহায্য করেছে।
আরও পড়ুন: একই বাসায় বিসিএস প্রস্তুতি, বুয়েটের চার বন্ধুই প্রশাসন ক্যাডার
ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর পরিচিতজনদের কাছ থেকে প্রশংসা ও উৎসাহ পাচ্ছেন তিনি। আরও ভালো করার অনুপ্রেরণা জোগানোয় সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন সোহেল।
দুই বিসিএসে দুই ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা সোহেলের সামনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। তবে তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের মৃত্তিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করতে চান তিনি। একই সঙ্গে গবেষণার মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো এবং কৃষকের কাজ সহজ করার ক্ষেত্রে অবদান রাখতে চান।
বিসিএস পরীক্ষার অভিজ্ঞতা থেকে নিজের ভুল ও সতর্কতার জায়গাগুলোও মনে রেখেছেন সোহেল। প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফল নিয়ে সংশয়ে ছিলেন। লিখিত পরীক্ষায় মানসিক দক্ষতা অংশে রোল নম্বরের বৃত্ত পূরণ করতে গিয়ে ভুল হলেও পরে সঠিক বৃত্ত পূরণ করেন। এই অভিজ্ঞতা থেকে পরীক্ষার হলে আরও সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছেন তিনি।
প্রতিকূলতা, আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও দীর্ঘ প্রস্তুতির পথ পেরিয়ে সোহেলের অর্জন তাই শুধু দুটি বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার গল্প নয়; এটি নিজের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শেখার চেষ্টা, নিয়মিত পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখার গল্প। এবার সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে গবেষণার পথে এগিয়ে যেতে চান তিনি।