দীনেশচন্দ্র সেন স্মৃতি স্বর্ণপদকের স্বীকৃতি, কাব্যচর্চায় বিপ্লব রায়ের দীর্ঘ পথচলা
পুরস্কার, কাব্যগ্রন্থ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে পরিচিতি, তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে নিজেকে একজন মানুষ হিসেবেই দেখতে চান খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ডিসিপ্লিনের সহযোগী অধ্যাপক ও কবি বিপ্লব রায়। দুই দশকের বেশি সময় ধরে কবিতা লেখা, একাধিক কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ, শিক্ষকতা, গবেষণা ও সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শৈশবের স্মৃতি, পরিবারের প্রভাব, নিজের পছন্দের পথে এগিয়ে যাওয়ার সংগ্রাম এবং মানুষ হয়ে ওঠার নিরন্তর চেষ্টা।
সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৩ সালে তিনি বামিহাল তরুণ কবি পুরস্কার, ২০২৪ সালে ফুলকলি কবিতা পুরস্কার এবং ২০২৬ সালে ভারতের দীনেশচন্দ্র সেন স্মৃতি স্বর্ণপদক পেয়েছেন। তবে নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে পদবি, কর্মস্থল কিংবা পুরস্কারের তালিকা দিয়ে শুরু করতে চান না তিনি। তার কাছে পরিচয়ের প্রথম জায়গাটি মানুষ হওয়া।
নিজের পরিচয় ও সাহিত্যচর্চা সম্পর্কে জানতে চাইলে কবি বিপ্লব রায় দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আমার পরিচয় আমি হচ্ছি প্রথমত, একজন মানুষ। আর ভবিষ্যতে একজন মানুষ হতে চাই।’
দুই দশকের বেশি সময় ধরে সচেতনভাবে কবিতা লিখছেন তিনি। সময়ের সঙ্গে নিজের অনেক লেখাকেই তার কাছে দুর্বল মনে হয়েছে। কিছু লেখা হারিয়েও গেছে, আবার কিছু লেখা প্রকাশের উপযোগী মনে হয়নি। তারপরও কবিতা লেখা পুরোপুরি ছাড়েননি। তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে শামুকখোলে শিস, স্বরচিত ধানক্ষেত, ধর্মান্তরিত আগরবাতি, ব্রা-কেটে কিছু নেই এবং মেঘ, ময়ূরের নির্বাসন। ব্রা-কেটে কিছু নেই প্রকাশ করেছে বৈভব এবং মেঘ, ময়ূরের নির্বাসন প্রকাশ করেছে বৈতরণী।
প্রথম বই প্রকাশের অনুভূতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নিজের লেখা প্রথমবার মলাটবন্দি হয়ে হাতে পাওয়ার অনুভূতি একজন মানুষের প্রথম সন্তানের অনুভূতির মতো। দীর্ঘদিনের লেখা যখন বই হয়ে পাঠকের হাতে পৌঁছে যায়, তখন সেটি একজন লেখকের জন্য বিশেষ আনন্দের মুহূর্ত।’
সাহিত্যে পাওয়া পুরস্কার প্রসঙ্গে বিপ্লব রায় জানান, ২০২৩ সালে তিনি বামিহাল তরুণ কবি পুরস্কার, ২০২৪ সালে ফুলকলি কবিতা পুরস্কার এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালে ভারতের দীনেশচন্দ্র সেন স্মৃতি স্বর্ণপদক পেয়েছেন।
তার মতে, পুরস্কার একজন লেখকের পরিচিতি বাড়ায় এবং পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তবে পুরস্কারকে তিনি লেখালেখির শেষ গন্তব্য হিসেবে দেখেন না। বরং প্রতিটি স্বীকৃতির পর আরও ভালো লেখার দায় তৈরি হয়। একজন লেখকের মূল্যায়ন শুধু পুরস্কারের মাধ্যমে নয়। বরং তার লেখা কতটা মানুষের কাছে পৌঁছাল, কতটা মানুষকে ভাবতে বাধ্য করল এবং সময়কে কতটা ধারণ করতে পারল এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
বই, পরিবার ও শৈশবের ভিত
নিজের পারিবারিক পরিবেশ ও বেড়ে ওঠার কথা বলতে গিয়ে বিপ্লব রায় জানান, শৈশবের একটি বড় সময় তার খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলার দেবীতলা গ্রামে কেটেছে। বাবা-মা, ভাই সহ পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি যৌথ পরিবারের বড় পরিসরে বেড়ে উঠেছেন তিনি। কয়েকজন জ্যাঠা ও তাদের পরিবারকে ঘিরে ছিল তার শৈশবের পারিবারিক পরিমণ্ডল।
তার বাবা ব্যাংকে চাকরি করলেও বইয়ের প্রতি ছিল গভীর আগ্রহ। ছোটবেলায় বাবার হাত ধরেই বইয়ের জগতের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। একটি বই শেষ করলেই বাবা তাকে নতুন বই এনে দিতেন। কখনো বাবার সঙ্গে বইয়ের দোকানে যেতেন। তার পাশের বাড়ির একজন মাসি কবিতা লিখতেন। তার সাহিত্যচর্চা ছোটবেলায় বিপ্লব রায়কে প্রভাবিত করেছে।
শৈশবের দিনগুলো তার কেটেছে প্রকৃতি, নদী, মাঠ, বাগান, বন্ধুত্ব ও দুষ্টুমির মধ্যে। খুলনার লায়ন্স স্কুলে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন তিনি। স্কুলের আশপাশের পরিবেশ ছিল অনেকটাই গ্রামীণ। নদী, খেলার মাঠ ও বাগান তার শৈশবের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। নানাবাড়ির নদীময় গ্রামের স্মৃতিও তার কাছে বিশেষ। নদী পার হওয়া, গ্রামে যাওয়া-আসা এবং প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার অভিজ্ঞতা তার মধ্যে গ্রামের প্রতি টান তৈরি করেছে।
বন্ধুদের সঙ্গে স্কুলের ছাদে উঠে যাওয়া, আরও নানান দুষ্টুমি ছিল তার শৈশবের অংশ। এসবের জন্য বাবার কাছ থেকে শাসনও পেয়েছেন। পরিণত বয়সে এসে সেই শাসনকেও নিজের জীবন গঠনের অংশ হিসেবে দেখেন তিনি। তার মতে, শৈশব শুধু অতীতের স্মৃতি নয়। এই সময় মানুষের চিন্তা, অনুভূতি ও সৃষ্টিশীলতার ভিত তৈরি হয়। তার ক্ষেত্রেও শৈশবের অভিজ্ঞতাগুলো পরবর্তী জীবনের চিন্তা ও অনুভূতিতে প্রভাব ফেলেছে।
বই থেকে কবিতার পথে
বইয়ের প্রতি আগ্রহ কীভাবে তৈরি হয়েছিল জানতে চাইলে বিপ্লব রায় বলেন, ‘মূলত বাবার হাত ধরেই তার বই পড়ার অভ্যাস তৈরি হয়। ঢাকা, রাজশাহী কিংবা কুষ্টিয়া যেখানেই গেছেন, পুরোনো ও নতুন বই সংগ্রহের নেশা তার সঙ্গে থেকেছে। ইন্টারনেটের আগের সময়ে বইয়ের খবর পেতে লাইব্রেরি, বইয়ের দোকান কিংবা বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে ঘুরতে হতো। নতুন কী বই প্রকাশিত হয়েছে, কোথায় পাওয়া যায় এসব নিয়ে বন্ধুদের মধ্যেও এক ধরনের নেশা কাজ করত।’
বই সংগ্রহের জন্য কখনো স্কুল পালিয়ে শহরেও এসেছেন তিনি। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় বন্ধু তন্ময়ের সঙ্গে খেলার ছলে কবিতা লেখার সিদ্ধান্ত নেন। একজন একটি কবিতা লিখবেন, অন্যজনও একটি কবিতা লিখবেন এভাবেই তার সচেতন কবিতাচর্চার শুরু। পরবর্তী সময়ে বন্ধুদের নিয়ে স্কুলকেন্দ্রিক একটি পত্রিকাও প্রকাশ করেন। তিনি ছিলেন সেই পত্রিকার সম্পাদক। নিজেদের লেখা ও ছবি প্রকাশিত হওয়া তাঁদের কাছে তখন বড় আনন্দের বিষয় ছিল।
ক্রিকেট থেকে পড়াশোনায়, সেখান থেকে নিজের স্বপ্নে
কৈশোরে ক্রিকেট খেলার প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহের কারণে একসময় পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যায়। পরীক্ষার ফলাফলও খারাপ হতে থাকে। এসএসসির আগে প্রি-টেস্ট পরীক্ষায় ফল খারাপ হওয়ার পর নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেন। পড়াশোনায় মনোযোগ দেন এবং এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করেন। নিজ উপজেলায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন তিনি। এই ফলাফল তার নিজের প্রতি বিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। বুঝতে পারেন, চেষ্টা করলে তিনিও ভালো করতে পারেন।
এরপর তার বড় ভাই তাকে ঢাকায় নিয়ে যান কলেজে ভর্তি প্রস্তুতির জন্য। নটর ডেম কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলেও সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ ক্রমেই তীব্র হতে থাকে। নীলক্ষেত ও আজিজ মার্কেট থেকে বই কিনতেন। লেখক হুমায়ূন আজাদের লেখার সঙ্গে পরিচয় তার চিন্তার জগতে বিশেষ প্রভাব ফেলে।
নটর ডেম কলেজের রাইটার্স ক্লাবের সঙ্গেও যুক্ত হন তিনি। দেয়ালপত্রিকা ও বার্ষিক পত্রিকা প্রকাশ, লেখা ও সম্পাদনার পাশাপাশি বিভিন্ন সাহিত্যিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। সেখানেই শিক্ষক হওয়ার স্বপ্নও তৈরি হয় তার মধ্যে। সাহিত্য পড়বেন, লিখবেন এবং একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবেন এমন ভাবনা তখন থেকেই তাকে এগিয়ে নেয়।
আরও দেখুন: ডেঙ্গু ঝুঁকিতে ঢাকার বাইরের যে ৫ জেলা
বাংলা পড়ার সিদ্ধান্ত, পরিবারের আপত্তি
বিজ্ঞান থেকে বাংলা পড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে নিজের ভালোবাসাকেই প্রধান কারণ হিসেবে দেখেন বিপ্লব রায়। শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পড়ার লক্ষ্য ছিল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও সেখানে বাংলা না পেয়ে দর্শনে ভর্তি হন। পরে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিষয়ে সুযোগ পেয়ে সেখানে চলে যান।
বাংলা পড়ার সিদ্ধান্ত পরিবার সহজভাবে নেয়নি। পরিবারের প্রত্যাশা ছিল তিনি অন্য কোনো প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত পেশায় যাবেন। বাংলা বিষয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার মা তিন দিন তার সঙ্গে কথা বলেননি। তবে বাবা নীরবে তাকে সমর্থন করেছেন। নিজের পছন্দের পথে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাবার এই সমর্থন তার জন্য বড় শক্তি হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলা পড়াকে তিনি কখনো পিছিয়ে পড়া বিষয় হিসেবে দেখেননি। তার মতে, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য একটি জাতির চিন্তা, দর্শন ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি। বাংলা পড়েও বিসিএস, শিক্ষকতা, গবেষণা, সাংবাদিকতা ও লেখালেখিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফল হওয়া সম্ভব।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষকতার শ্রেণিকক্ষে
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা নিয়ে পড়ার সময় তার একাডেমিক ফলাফল ক্রমশ ভালো হতে থাকে। একই সঙ্গে সাহিত্যপাঠ ও লেখালেখিও চালিয়ে যান। তার মতে, পরীক্ষার জন্য যে পড়াশোনা করতে হয় এবং জানার জন্য যে পড়াশোনা করতে হয় দুটির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের আগ্রহ থেকে পড়াশোনাই তার চিন্তাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ডিসিপ্লিন চালু হলে সেখানে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। নিজের এলাকা ও পরিচিত পরিবেশের কাছাকাছি থেকে শিক্ষকতা করার আকাঙ্ক্ষাও তখন তৈরি হয়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের ভাইভা ছিল তার জন্য নতুন অভিজ্ঞতা। এর আগে কখনো ভাইভা দেননি। স্বভাবগতভাবে কিছুটা অন্তর্মুখী হওয়ায় বিষয়টি তার জন্য সহজ ছিল না। তার ওপর পদ ছিল সীমিত এবং প্রতিযোগীরাও ছিলেন যোগ্য।
ভাইভা দিতে যাওয়ার দিন তার বাবা তার সঙ্গে ছিলেন। বাবার এই উপস্থিতিকে তিনি জীবনের অন্যতম বড় সমর্থন হিসেবে দেখেন। দীর্ঘ সময় ভাইভা দেওয়ার পর চাকরির ফল প্রকাশের আগের সময়টা তার কাছে এক ধরনের ব্ল্যাক হোল ছিল। চাকরি না হলে ঢাকায় ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন। অনিশ্চয়তা, দুশ্চিন্তা ও একাকিত্বে সময়টা কঠিন ছিল। শেষ পর্যন্ত ফোনে চাকরির খবর পাওয়ার মধ্য দিয়ে তার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তব রূপ নেয়।
শিক্ষকতা, কবিতা ও সময়ের বাস্তবতা
শিক্ষকতাকে শুধু পেশা হিসেবে দেখেন না বিপ্লব রায়। তার মতে এই পেশার মধ্য দিয়ে পড়া, গবেষণা ও লেখালেখি চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়। শান্তভাবে পড়তে ও লিখতে চেয়েছেন বলেই শিক্ষকতাকে নিজের জন্য উপযুক্ত মনে করেন তিনি। ছাত্রজীবন থেকেই কবিতা লিখলেও সচেতনভাবে কবিতা লেখার বয়স দুই দশকের বেশি। সময়ের সঙ্গে কিছু লেখা তার নিজের কাছেই দুর্বল মনে হয়েছে, কিছু লেখা হারিয়েছে এবং কিছু লেখা প্রকাশের উপযোগী মনে হয়নি। তবু কবিতা লেখা থেকে পুরোপুরি সরে যাননি।
কবিতায় সমাজ ও সময়ের প্রভাব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘একজন কবির পক্ষে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা সম্ভব নয়। মানুষের দুঃখ, যন্ত্রণা, অপমান, অন্যায় ও আনন্দ একজন সংবেদনশীল কবিকে স্পর্শ করে। সেই অনুভূতিই কবিতার ভাষায় রূপ নেয়।’
কোভিড-পরবর্তী অস্থিরতা, অন্যায়-অবিচার ও রাজনৈতিক বাস্তবতাও তার লেখায় বিভিন্নভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তার কাছে কবিতা শুধু ব্যক্তিগত আবেগ প্রকাশের মাধ্যম নয়; একজন কবির নিজের ভেতরের জগতের পাশাপাশি সমাজ ও পৃথিবীর বাস্তবতাও লেখায় জায়গা পায়। কবিতার পাশাপাশি গল্পও লিখেছেন তিনি। তবে একজন সাহিত্যবোদ্ধার সমালোচনায় আঘাত পেয়ে একসময় গল্প লেখা থেকে সরে যান। গল্পে আবার ফিরে আসা তার সাহিত্যজীবনের একটি অপূর্ণতা। ভবিষ্যতে আবার গল্পে ফেরার ইচ্ছা রয়েছে তার।
বাংলা ভাষা, শিক্ষার্থী
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে তার দর্শনও স্পষ্ট। শুধু ফেব্রুয়ারি মাস এলেই বাংলা ভাষার প্রতি আবেগ দেখানো যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন তিনি। একটি জাতি যদি নিজের ভাষা ও সাহিত্যকে গুরুত্ব না দেয়, তাহলে তার নিজস্ব চিন্তা, দর্শন ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ও দুর্বল হয়ে পড়ে। বাংলা পড়লে ভবিষ্যৎ অন্ধকার এই ধারণাকে সম্পূর্ণ ভুল মনে করেন তিনি।
তার মতে, বাংলা পড়ার পর শিক্ষার্থীদের সামনে পৃথিবীর অসংখ্য দরজা খোলা থাকে। সাহিত্য নিয়ে গবেষণা, শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা, লেখালেখি, বিসিএসসহ নানা পেশায় যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থীদের সাফল্যকে তিনি ডিসিপ্লিনের বড় অর্জন হিসেবে দেখেন। তার অনেক শিক্ষার্থী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হয়েছেন।
কেউ বাংলা বিষয়ের শিক্ষক হয়েছেন, আবার কেউ অন্য পেশায় গেছেন। শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর ক্ষেত্রে একজন শিক্ষকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। বর্তমান সময়ে বাংলা ভালোভাবে জানা এবং সাবলীলভাবে ভাষা ব্যবহার করতে পারাকে বড় সম্পদ মনে করেন তিনি। সাংবাদিকতাসহ বিভিন্ন পেশায় ভালো ভাষাজ্ঞান ও লেখার দক্ষতার মূল্য রয়েছে।
নতুন প্রজন্ম
নতুন প্রজন্মকে পুরোনো প্রজন্মের মানদণ্ড দিয়ে বিচার করা ঠিক নয় বলেও মনে করেন তিনি। বিশেষ করে জেন-জি প্রজন্মকে বুঝতে হলে তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে।
আরও দেখুন: মাদক সেবন করিয়ে দিনের পর দিন ধর্ষণ, মানতে না পেরে চলে গেলেন তরুণী
তার মতে, প্রতিবাদ করতে হবে। তবে সেই প্রতিবাদের ভাষায় রুচি ও সংবেদনশীলতার পরিচয় থাকতে হবে। তরুণদের নিজেদের প্রতিবাদের শক্তিকে সাহিত্য, কবিতা, নাটক, গান ও অন্যান্য সৃজনশীল মাধ্যমে প্রকাশ করার পরামর্শ দেন তিনি। নতুন প্রজন্মের মধ্যে যে শক্তি রয়েছে, সেটিই ভবিষ্যৎকে এগিয়ে নেবে। তাই তাদের ভয় পাওয়ার নয়, বরং বোঝা, পাশে থাকা এবং তাদের সৃষ্টিশীল শক্তিকে সঠিক পথে এগিয়ে দেওয়া প্রয়োজন।
শেষ পর্যন্ত মানুষ হওয়ার পথেই
দীর্ঘ পথচলার দিকে ফিরে তাকালে বিপ্লব রায়ের অর্জনের তালিকাটি দীর্ঘ। বামিহাল তরুণ কবি পুরস্কার, ফুলকলি কবিতা পুরস্কার, ভারতের দীনেশচন্দ্র সেন স্মৃতি স্বর্ণপদক, একাধিক কাব্যগ্রন্থ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা এবং অসংখ্য শিক্ষার্থীর সাফল্য। তবু এসবের কোনোটিকেই নিজের পরিচয়ের শেষ কথা মনে করেন না তিনি। বাংলা পড়ার সিদ্ধান্ত থেকে শিক্ষকতা, শিক্ষকতা থেকে কবিতার পথে এগিয়ে চলা প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজের ভালোবাসার জায়গাটিকে ধরে রেখেছেন।
স্বীকৃতির এই পথ তার সাহিত্যিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলেও পুরস্কার তার কাছে গন্তব্য নয় বরং আরও ভালো লেখার নতুন দায়িত্ব। প্রতিটি স্বীকৃতির পর তিনি আবার ফিরে যান কবিতা, বই, শ্রেণিকক্ষ ও মানুষের কাছে। নিজের পরিচয় সম্পর্কে বলা সেই একটি বাক্যই যেন তার দীর্ঘ পথচলার সারাংশ, ‘আমার পরিচয় আমি হচ্ছি প্রথমত, একজন মানুষ। আর ভবিষ্যতে একজন মানুষ হতে চাই।’
পুরস্কার, কাব্যগ্রন্থ ও শিক্ষকতার পরিচয়ের আড়ালে তাই তার সবচেয়ে বড় গল্পটি মানুষ হয়ে ওঠার। পড়া, লেখা, শেখানো এবং মানুষকে বোঝার মধ্য দিয়ে সেই পথচলা এখনো অব্যাহত।