০১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১০

৪৯তম বিসিএস: বাদ পড়াদের বড় অংশই ঢাবির শিক্ষার্থী

৪৯তম (বিশেষ) বিসিএসের গেজেট থেকে বঞ্চিত হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী  © টিডিসি সম্পাদিত

৪৯তম বিসিএস (বিশেষ) পরীক্ষার চূড়ান্ত গেজেটে ৬১১ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে চূড়ান্ত ফলাফলে সাময়িকভাবে মনোনীত ৬৬৮ জনের মধ্যে ৫৭ জনের নাম বাদ গেছে। এর মধ্যে ৪৫ জন নিয়োগযোগ্য ছিলেন, যাদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। বাকি ১২ জনের মধ্যে ১০ জন স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেননি। আর দুজনকে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) বহিষ্কার করেছিল বলে জানা গেছে।

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) এ গেজেট প্রকাশ করা হয়। তবে গেজেটে ৫৭ জনকে কী কারণে বাদ দেওয়া হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি। স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করা ও বহিষ্কার হওয়া ১২ জন বাদে বাকি ৪৫ জন ভেরিফিকেশনে বাদ গেছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এর মধ্যে এ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই অন্তত ১৫ জনের নাম পাওয়া গেছে। তবে এ সংখ্যা ৩০ জনের বেশি হবে বলে বাদ পড়া একাধিক চাকরিপ্রার্থী জানিয়েছেন।

৪৯তম বিসিএস (বিশেষ) পরীক্ষায় হিসাববিজ্ঞানে প্রথম হয়েও চূড়ান্ত গেজেটে নাম না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আহমাদ উল্লাহ নাহিদ নামে এক প্রার্থী। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ৪৯তম বিসিএসের চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের পর নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি এ ক্ষোভের কথা জানান।

নাহিদ লিখেছেন, ‘যাই হোক, ভেবেছিলাম কিছু লিখবো না! কিন্তু সবার কল এবং ম্যাসেজের কারণে লিখতে বাধ্য হচ্ছি। ৪৯তম বিসিএসে হিসাববিজ্ঞানে প্রথম হয়েও আমার গেজেট হয়নি। কী কারণে তা আমি জানি না! ক্যাম্পাসের এবং গোপালগঞ্জের যারা আমাকে চেনেন, তারা আমার রাজনৈতিক ফিরিস্তি কমেন্ট বক্সে শেয়ার করে যাবেন।’

গেজেটে ৫৭ জনকে কী কারণে বাদ দেওয়া হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি। স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করা ও বহিষ্কার হওয়া ১২ জন বাদে বাকি ৪৫ জন ভেরিফিকেশনে বাদ গেছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এর মধ্যে এ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই অন্তত ১৫ জনের নাম পাওয়া গেছে। তবে এ সংখ্যা ৩০ জনের বেশি হবে বলে বাদ পড়া এক চাকরিপ্রার্থী জানিয়েছেন।

আহমদ উল্লাহ নাহিদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আমাকে বাদ দেওয়ার সঠিক কারণটা জানি না। এ দেশে বেশিরভাগই বাদ পড়ে রাজনৈতিক কারণে। আমার বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলায় হওয়ায় বাদ দেওয়া হতে পারে। কিন্তু আমার কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই। এরপরও কেন বাদ দিয়েছে জানি না। জেলার আরও ৯ জনকে বাদ দিয়েছে বলে জানতে পেরেছি।’

তিনি বলেন, ‘৪৫ জন প্রকৃত গেজেট হওয়ার মতো প্রার্থী বাদ পড়েছেন। এর মধ্যে ৩০ থেকে ৩৫ জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হতে পারে। কারণ সাড়ে ছয়শ এর মধ্যে সাড়ে অন্তত চারশর মতো প্রার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছিল। আর গোপালগঞ্জের বাদ পড়া ৯ জনের মধ্যে ৭ জনই ঢাবির বলে এ পর্যন্ত তথ্য পেয়েছি।’

৪৯তম বিসিএস (বিশেষ) পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলে ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিষয়ে মেধাক্রমে পঞ্চম হয়েও গেজেটে নাম না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. নূরনবী শেখ। তার দাবি, গোপালগঞ্জের বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও তিনি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না; বরং ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে সামনের সারিতে ছিলেন। এরপরও চূড়ান্ত গেজেটে তার নাম না থাকায় বিষয়টি মানতে পারছেন না তিনি।

বাদ পড়া ৫৭ জনের একজন নূরনবী শেখ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং বিজয় ৭১ হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। ৪৯তম বিশেষ বিসিএসে ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিষয়ের প্রভাষক পদে তিনি সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন বলে জানান।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে নূরনবী শেখ বলেন, ‘গোপালগঞ্জ বাড়ি হওয়ার পরেও কলেজ, হল বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের কোনো পদে আমি ছিলাম না। আমার পরিবার ও কোনো রাজনীতির সাথে যুক্ত না, এবং আমার নামে কোন ফৌজদারি বা দেওয়ানি মামলা নেই। ২০১৮ এর কোটা আন্দোলনের পক্ষে ছিলাম। ২০২৪ সালের কোটা আন্দোলনে সম্মুখভাগের একজন ছিলাম।’

জুলাই আন্দোলনে নিজের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে নূরনবী লেখেন, ‘আমি গোপালগঞ্জের মানুষ হয়েও আওয়ামী লীগের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে জুলাই আন্দোলনে সামনের সারিতে, এমনকি আন্দোলন পরবর্তী সময়ে ঢাকার নিরাপত্তা রক্ষার জন্য রাতভর পাহারা দিয়েছি। অথচ আজ ৪৯ তম বিসিএস এর গেজেটে আমার নাম আসেনি।’

বাদ পড়াদের এ তালিকায় রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল মামুন বেলাল। অথচ তিনি সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে সমাজকল্যাণে প্রথম হয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন। তবে গেজেটে অন্যদের মতো তারও বাদ পড়ার কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি।

বিষয়টি জানিয়ে ফেসবুক পোস্টে আব্দুল্লাহ আল মামুন বেলাল লিখেছেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গেজেট থেকে বঞ্চিত করার জন্য ধন্যবাদ। ৪৯তম বিসিএসে সমাজকল্যাণে ১ম হয়েও আমার গেজেটে নাম এলো না। জুলাইয়ে সক্রিয় ছিলাম। আমার অপরাধ কী বুঝতে পারলাম না। এটাই কী আমার অপরাধ?’

৫৭ জনের তালিকায় রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. জাহিদুল ইসলাম নাঈমও। অথচ তিনি সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে ইসলামিক স্টাডিজে মেধাক্রমে প্রথম ছিলেন বলে জানিয়েছেন। গেজেট বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি ফেসবুক পোস্টে জানিয়ে নাঈম লিখেছেন, ‘মো. জাহিদুল ইসলাম নাঈম, গেজেট বঞ্চিত, ৪৯তম (বিশেষ) বিসিএস, সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার, ইসলামিক স্টাডিজ মেধাক্রম: ০১।’

সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে প্রাণিবিদ্যা বিষয়ে মেধাক্রম ১৪ হয়েও গেজেট থেকে বাদ পড়েছেন  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাজমুল হোসাইন প্রান্ত। গেজেট থেকে বাদ পড়ার কারণ জানেন না বলে জানিয়েছেন তিনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে নাজমুল হোসেন লিখেছেন, ‘আমি কেনো গেজেটেড হইলাম না সেই উত্তর আমার কাছে নাই। এটাও হইতে পারে যে ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার এবং ২০২৪ এর জুলাই আন্দোলন করার গিফট পেয়েছি।’

‘১০ মাসের অপেক্ষার পর আজ যে দিনটিকে জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন ভেবেছিলাম, সেই দিনটিই যেন জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিন হয়ে এলো। যে স্বপ্নের জন্য গত এক বছর জীবনের সর্বস্ব দিয়ে লড়েছি, শেষ মুহূর্তে সেই স্বপ্নই হাতছাড়া হয়ে গেল। আজ গেজেট প্রকাশের দিনে আমার পাশে বসে অঝোরে কাঁদছে পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী। তার চোখের দিকে তাকানোর সাহসটুকুও আজ আমার নেই।’

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ৪৯ বিসিএস থেকে বাদ গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ছাত্র রেদওয়ান আহমদ তাহমিদ এভাবেই লিখেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র তিনি। ফেসবুকে তাহমিদ লিখেছেন, ‘আমার আশা ছিল, আল্লাহ আমার জন্য যে রিজিক লিখে রেখেছেন, তা থেকে আমি বঞ্চিত হব না। কিন্তু ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া ১০ মাস বিলম্বিত হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত আমাকে গেজেট থেকে বাদ দেওয়া হয়।’

চূড়ান্ত ফলে ইংরেজি বিষয়ে মেধাক্রমে ১৪তম হয়েও চূড়ান্ত গেজেটে নাম আসেনি বুশরা জাহান ঐশির। গেজেটে তাঁর আগের ও পরের মেধাক্রমের প্রার্থীদের নাম থাকলেও তাঁর নাম নেই বলে জানিয়েছেন তিনি। গেজেট প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন বুশরা জাহান ঐশি।

ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘৪৯তম (বিশেষ) বিসিএস এর গেজেট থেকে বঞ্চিত হলাম। ইংরেজিতে আমার মেধাক্রম ১৪, গেজেটে ১৩ আছে,১৫ আছে, কিন্তু ১৪ নাই। আল্লাহ তাআলা সাক্ষী, আমি বা আমার পরিবারের কেউ রাজনীতি করি নাই কোনোদিন। সারাজীবন একনিষ্ঠভাবে লেখাপড়ার প্রতি মনোযোগী ছিলাম। তবুও আমাকে কেন গেজেট বঞ্চিত করা হয়েছে, রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন রেখে গেলাম। আমার জন্য সবাই দোয়া করবেন।’

৪৯তম বিসিএস (বিশেষ) পরীক্ষায় শিক্ষা ক্যাডারের ইতিহাস বিভাগে প্রথম হয়েও চূড়ান্ত গেজেটে স্থান পাননি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মো. সোহেল রানা। জানা যায়, শিক্ষা ক্যাডারের ইতিহাস বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন নীলফামারী জেলা সদরের সোনারায় ইউনিয়নের কুখাপাড়া গ্রামের কৃতি সন্তান মো. সোহেল রানা। তিনি কৃষক আবু হোসেন ও গৃহিণী সাহিদা বেগমের চতুর্থ সন্তান। 

আরও খবর: প্রাথমিকে যোগদান আজ— কেউ হাসছেন, কেউ কাঁদছেন এখনও

সোহেল রানা ২০২০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে সিজিপিএ ৩.৫৪ পেয়ে স্নাতক এবং ২০২১ সালে একই বিভাগ থেকে সিজিপিএ ৩.৫৬ পেয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। এর আগে তিনি ২০১৪ সালে সোনারায় সংগলশী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ এবং ২০১৬ সালে রংপুরের ঐতিহ্যবাহী কারমাইকেল কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৪.৯২ পেয়ে উত্তীর্ণ হন।

নিজের এ অর্জন নিয়ে তখন প্রতিক্রিয়ায় সোহেল রানা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেছিলেন, ‘এই অর্জন শুধু আমার একার নয়—এটি আমার বাবা-মা, শিক্ষক ও পরিবারের সবার পরিশ্রমের ফল। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল শিক্ষক হয়ে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার। আমি বিশ্বাস করি, মনোযোগ, পরিশ্রম ও ধৈর্য থাকলে গ্রাম থেকে উঠে এসেও বড় কিছু করা সম্ভব।’

প্রার্থীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গোপালগঞ্জ থেকে বাদ পড়া অন্যদের মধ্যে বিপ্লব বাড়ৈ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের এবং মেধাক্রমে পঞ্চম। শেখ আরাফাত কবির ইতিহাস বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের এবং মেধাক্রমে ১৫তম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের শফিকুল ইসলামের মেধাক্রম ২৫ এবং অর্থনীতি বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের মো. রাকিবুল ইসলামের মেধাক্রম ৩৭ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর বাইরে ফিন্যান্স ও ব্যাংকিংয়ের ৯ম মোহাম্মদ ইমতিয়াজ হোসেন, সোহাগ মন্ডল এবং পরিসংখ্যান বিভাগের এক শিক্ষার্থীর নাম গেজেটে আসেনি বলে জানা গেছে। তবে বাদ পড়া ৪৫ জনের সবার তথ্য যাচাই করা সম্ভব না হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়টি থেকে বাদ পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরও বেশি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।