০৬ জুলাই ২০২৬, ২১:৫২

ট্রাস্টি বোর্ড ভেঙে ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটিতে প্রশাসক নিয়োগ দিল সরকার

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মেজবাহ্-উল-ইসলাম, অধ্যাপক ড. মো. ইলিয়াস আল-মামুন ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মনজুরুল আলম।  © টিডিসি সম্পাদিত

সমাআলোচিত দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের (ইইউবি) বোর্ড অব ট্রাস্টিজ (ট্রাস্টি বোর্ড) ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এর পরিবর্তে আট শর্তে বোর্ড অব এডমিনিস্ট্রেশনস গঠন করেছে সরকার। রবিবার (৫ জুলাই) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মেজবাহ্-উল-ইসলামকে নতুন বোর্ড অব এডমিনিস্ট্রেশনসে চেয়ারম্যান হিসেবে রাখা হয়েছে।

সেখানে আরও তিনজনকে সেখানে সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে। তারা হলেন-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসিউটিক্যাল টেকনোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. ইলিয়াস আল-মামুন এবং বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) সেন্টার ফর হায়ার স্টাডিজ এন্ড রিসার্চ সেন্টারের সাবেক ডিন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মনজুরুল আলম। তাছাড়া রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োজিত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (যদি থাকেন) পদাধিকারবলে তিনিও সদস্য হিসেবে থাকবেন।

আরও পড়ুন: উল্টো পথে ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি, উদ্বিগ্ন শিক্ষার্থীরা

প্রজ্ঞাপনে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলরের অনুমোদনক্রমে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ এর ধারা ৩৫(৭) অনুযায়ী ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ঢাকা-এর অভ্যন্তরীণ বিরোধের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত ও শিক্ষার্থীদের ক্ষতিগ্রস্ত হবার আশঙ্কা পরিলক্ষিত হওয়ায়, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষার কার্যক্রম অব্যাহত রাখার স্বার্থে এই বোর্ড অব এডমিনিস্ট্রেশনস গঠন করা হয়েছে।

এদিকে, প্রজ্ঞাপনটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি হয়। বিষয়টি নিশ্চিতে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তারা। জানা গেছে, প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়-১ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব মো. নেছার উদ্দিন। আজ সোমবার (৬ জুলাই) রাতে তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, প্রজ্ঞাপনটি ঠিক আছে।

তবে ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটির উপাচার্য উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. গোলাম মরতুজা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানান, প্রজ্ঞাপনের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেখেছি। তবে মন্ত্রণালয় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমাকে কোনো কিছু জানানো হয়নি কিংবা কোনো চিঠিও পাঠানো হয়নি। যেহেতু সোশ্যাল মিডিয়ায় বোর্ড অব এডমিনিস্ট্রেশনস-এর বিষয়ে একটি প্রজ্ঞাপন দেখেছি, তাই আমরাও খোঁজ-খবর নিচ্ছি।

৮ শর্তে বোর্ড অব এডমিনিস্ট্রেশনস
প্রজ্ঞাপনে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ৮টি শর্তে বেঁধে দিয়ে বোর্ড অব এডমিনিস্ট্রেশনস গঠন করেছে। এরমধ্যে রয়েছে- 

১) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মেজবাহ্-উল-ইসলামকে সাময়িকভাবে বোর্ড অব এডমিনিস্ট্রেশনসের সভাপতি এবং অধ্যাপক ড. মো. ইলিয়াস আল-মামুন এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মনজুরুল আলমকে সদস্য হিসেবে ১ বছরের জন্য নিয়োগ প্রদান করা হলো। তবে মহামান্য রাষ্ট্রপতি এ নিয়োগ যেকোন সময় বাতিল করতে পারবেন;

২) বোর্ড অব এডমিনিস্ট্রেশনস বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সাথে পরামর্শক্রমে একটি নিয়মিত বোর্ড অব ট্রাস্টিজ পুনর্গঠনপূর্বক তা অনুমোদনের জন্য কমিশন মারফত রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলর এর নিকট প্রেরণ করবেন এবং রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলর পুনর্গঠিত বোর্ড অব ট্রাস্টিজ অনুমোদন করা মাত্র বোর্ড অব এডমিনিস্ট্রেশনস বিলুপ্ত বলে গণ্য হবে;

৩) অনিবার্য কারণবশত: বোর্ড অব এডমিনিস্ট্রেশনস ১ বছর সময়ের মধ্যে বোর্ড অব ট্রাস্টিজ পুনর্গঠন করতে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সুপারিশক্রমে রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলর বোর্ড অব এডমিনিস্ট্রেশনস এর মেয়াদ অনধিক ৬ মাস বৃদ্ধি করতে পারবেন;

আরও পড়ুন: ট্রাস্টি বোর্ডের ‘বৈধতা’ প্রশ্নে বাবা-ছেলের দ্বন্দ্বে ডুবতে বসেছে ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি

৪)  বোর্ড অব এডমিনিস্ট্রেশনস-এর সভাপতি ও অন্যান্য সদস্যগণ কমিশন প্রণীত নীতিমালা/নির্দেশনা ও ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ-এর বিধিমালা অনুযায়ী বৈঠক ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদি প্রাপ্ত হবেন;

৫) বোর্ড অব এডমিনিস্ট্রেশনস বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ অনুযায়ী বোর্ড অব ট্রাস্টিজ-এর ক্ষমতা ও দায়িত্ব পালন করবে;

৬) বোর্ড অব এডমিনিস্ট্রেশনস বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন এর চেয়ারম্যান অথবা তাঁর মনোনীত একজন সদস্য কর্তৃক নির্ধারিত সময়ে প্রতি তিন মাসে ন্যূনপক্ষে একটি সভা করবে;

৭) রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলর এর নিকট উপস্থাপনের জন্য বোর্ড অব এডমিনিস্ট্রেশনস-এর প্রতি ৩ মাসে তাদের কাজের অগ্রগতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ একটি প্রতিবেদন কমিশন বরাবর প্রেরণ করবেন;

৮) রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োজিত উপাচার্য (যদি থাকেন) পদাধিকারবলে বোর্ড অব এডমিনিস্ট্রেশনস-এর সদস্য হবেন।

জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ২৬ অক্টোবর পদত্যাগের ঘোষণা দেন ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ট্রাস্টি বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মকবুল আহমেদ খান। পরে এ পদে আসীন হন তার ছেলে আহমেদ ফরহাদ খান তানিম। বিশ্ববিদ্যালয়ের রক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদেরকে আশ্বস্ত করে তার আবির্ভাব ঘটলেও আদতে তিনি ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছিল। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ ছিল- চেয়ারম্যান হয়ে তিনি স্বেচ্ছাচারিতা, স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ আত্মসাৎসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব প্রায় চরমে, এমনকি মামলা-মোকদ্দমায়ও গড়িয়েছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও অনেকটা বিব্রত ছিলেন।

এরপর তিনটি গুরুতর অনিয়ম ও শর্ত লঙ্ঘনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়টির নামের পাশে তিনটি লাল তারকা (***) চিহ্ন বসিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। এই চিহ্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে কঠোর সতর্কবার্তা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। শুধু তাই নয়, এমন সতর্কবার্তার পরও না শুধরালে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা এমনকি বন্ধের সিদ্ধান্ত পর্যন্ত আসতে পারে বলছে জানিয়েছিল সংশ্লিষ্টরা। সর্বশেষ বিশ্ববিদ্যালয়টির বোর্ড অব ট্রাস্টিজ ভেঙে দেওয়া হলো।