প্রাথমিকের নারী শিক্ষক ১৯৯০ সালে ছিল ২০%, বর্তমানে ৬৭%; কোটা বাতিলে বদলাবে চিত্র?
তিন দশক আগে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন ছিলেন নারী। সময়ের সঙ্গে বদলেছে সেই চিত্র। এখন প্রতি ১০০ জন শিক্ষকের প্রায় ৬৭ জনই নারী শিক্ষা। প্রাথমিক শিক্ষায় নারীর এই অগ্রযাত্রার পেছনে দীর্ঘদিনের নিয়োগনীতি, বিশেষ করে নারী প্রার্থীদের জন্য সংরক্ষিত ৬০ শতাংশ কোটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু ২০২৫ সালের নতুন নিয়োগবিধিতে সেই কোটা তুলে দেওয়া হয়েছে। ফলে যে নিয়োগব্যবস্থার মধ্য দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষায় নারীদের সংখ্যাধিক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেই ব্যবস্থার পরিবর্তনে ভবিষ্যতের চিত্রও বদলে যাবে কি না, উঠেছে সেই প্রশ্ন।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সমন্বিত প্রাথমিক শিক্ষা তথ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি (আইপিইএমআইএস) ড্যাশবোর্ডের তথ্য বলছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে পুরুষ শিক্ষক রয়েছেন ১ লাখ ২৩ হাজার ১০৬ জন, যা মোট শিক্ষকের ৩৩ দশমিক ০৯ শতাংশ। সে হিসাবে নারী শিক্ষকের হার প্রায় ৬৬ দশমিক ৯১ শতাংশ। অর্থাৎ, একসময় যে পেশায় নারীর অংশগ্রহণ ছিল তুলনামূলক কম, এখন সেখানে শিক্ষকদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই নারী।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা, ২০২৫-এ নারী প্রার্থীদের জন্য আগে নির্ধারিত ৬০ শতাংশ কোটা বাতিল করা হয়েছে। বাতিলের পর ‘সহকারী শিক্ষক নিয়োগ ২০২৫’-এর আওতায় নিয়োগপ্রাপ্ত ১৪ হাজার ৩৮৪ জন সহকারী শিক্ষক সম্প্রতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৪ হাজার ৩৮৪ জন নতুন শিক্ষকের নিয়োগ দেওয়া হয়।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পলিসি এন্ড অপারেশন বিভাগ থেকে জানা যায়, গত ১ অক্টোবর ২০২৬ নিজ নিজ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে যোগদান করেছেন। তাঁদের লিঙ্গভিত্তিক তথ্য এখনো জেলা পর্যায়ে রয়েছে। অধিদপ্তরের কাছে নতুন শিক্ষকদের শুধু রোল নম্বরের তথ্য আছে।
নতুন শিক্ষকদের মধ্যে কতজন নারী, আর কতজন পুরুষ সেই হিসাব যেহেতু এখনো কেন্দ্রীয়ভাবে পাওয়া যায়নি, ফলে কোটা বাতিলের পর নিয়োগে নারী-পুরুষের অনুপাতে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না, তার উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
নারী শিক্ষক নিয়োগের ইতিবৃত্ত
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানোর যে উদ্যোগ শুরু হয়, তার অন্যতম লক্ষ্য ছিল শিক্ষার সুযোগ দেশজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া। আর সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিদ্যালয় জাতীয়করণ, শিক্ষক নিয়োগের কাঠামো তৈরি এবং নারী শিক্ষকের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ সবই ধাপে ধাপে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কয়েক দশকের এই পথচলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষকের অংশগ্রহণ যেমন বেড়েছে, তেমনি বদলেছে নিয়োগের নীতিমালাও।
১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় বড় পরিবর্তন আসে। ওই বছর সরকার ৩৬ হাজার ১৬৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করে। এসব বিদ্যালয়ের ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭২৪ জন শিক্ষককে সরকারি কর্মচারী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এর ফলে বিপুলসংখ্যক বিদ্যালয় ও শিক্ষক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার আওতায় আসেন। পরের বছর, ১৯৭৪ সালে ‘প্রাথমিক বিদ্যালয় অধিগ্রহণ আইন, ১৯৭৪’ প্রণয়নের মাধ্যমে জাতীয়করণ কার্যক্রম আইনি ভিত্তি পায়। এর মধ্য দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষার দায়িত্ব পালনে সরকারের ভূমিকা আরও সুসংহত হয়। তবে বিদ্যালয় জাতীয়করণই একমাত্র চ্যালেঞ্জ ছিল না বরং সবার জন্য শিক্ষার সুযোগ তৈরি করতে প্রয়োজন ছিল পর্যাপ্ত শিক্ষক এবং শ্রেণিকক্ষে নারী শিক্ষকের অংশগ্রহণ বাড়ানো।
আরও পড়ুন: জিপিএ-৫ পেয়েছে বন্ধু, বিশ্বাস হয়নি আরেক বন্ধুর, গোপনে পুনঃনিরীক্ষণের পর রেজাল্ট আসল ‘ফেল’
নারী শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা অবশ্য স্বাধীনতার পরই শুরু হয়নি। ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের প্রতিবেদনেও প্রাথমিক শিক্ষার সম্প্রসারণ ও নারী শিক্ষকের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পায়। পরবর্তী সময়ে প্রাথমিক শিক্ষাকে আরও বিস্তৃত ও কার্যকর করতে প্রশাসনিক কাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। এর মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষার পরিচালনা ও তদারকির জন্য পৃথক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে ওঠে। পরের বছর ১৯৮১ সালে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা কর্মসূচির আওতায় নারী শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতার শর্ত শিথিল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। নারী শিক্ষকের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বিশেষ করে যেসব এলাকায় যোগ্য শিক্ষক পাওয়া কঠিন ছিল, সেখানে নিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে।
এদিকে শিক্ষক নিয়োগকে সুনির্দিষ্ট বিধিবিধানের আওতায় আনতে আশির দশকে উদ্যোগ জোরদার হয়। ১৯৮০ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য নিয়োগবিধি প্রণয়ন করা হয়। পরে ১৯৮৩ সালের ১৫ আগস্ট নতুন নিয়োগবিধি জারি করে আগের বিধিমালা রহিত করা হয়। এসব বিধিমালার মধ্য দিয়ে শিক্ষক নিয়োগের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার প্রক্রিয়া এগিয়ে যায়।
একই সময়ে প্রাথমিক শিক্ষাকে আরও বিস্তৃত করার নীতিগত উদ্যোগও চলতে থাকে। ১৯৯০ সালে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন প্রণয়ন সেই ধারাবাহিকতায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ১৯৯২ সালে প্রথমে ৬৮টি উপজেলায় বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়। পরের বছর ১৯৯৩ সালে তা দেশের বাকি অংশেও সম্প্রসারিত হয়। এতে আরও বেশি শিশুকে বিদ্যালয়ে আনার লক্ষ্য সামনে আসে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও বিদ্যালয়ে অংশগ্রহণ বাড়ানোর এই উদ্যোগের সঙ্গে শিক্ষক নিয়োগের চাহিদাও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। একই সঙ্গে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষকের উপস্থিতি বাড়ানোর বিষয়টি শিক্ষানীতি ও নিয়োগব্যবস্থার আলোচনায় আরও গুরুত্ব পেতে থাকে।
তিন দশকজুড়ে বেড়েছে অংশগ্রহণ
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষকের সংখ্যা এক দিনে বাড়েনি। কয়েক দশক ধরে নেওয়া নীতিগত উদ্যোগ, নিয়োগে নারীদের জন্য বিশেষ সুযোগ এবং প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তারের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে বদলেছে শিক্ষকতায় নারী-পুরুষের অনুপাত। ১৯৯০ সালে প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজনেরও কম ছিলেন নারী। দেড় দশকের ব্যবধানে সেই চিত্র পাল্টে যায়। ২০০৭ সালে শিক্ষকতায় নারীদের অংশগ্রহণ অর্ধেক ছাড়িয়ে যায়।
নারী শিক্ষকের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ অবশ্য আরও আগে শুরু হয়েছিল। ১৯৭৪ সালের কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের প্রতিবেদনে প্রাথমিক শিক্ষার সম্প্রসারণের পাশাপাশি নারী শিক্ষকের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পায়। পরে ১৯৮১ সালে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা কর্মসূচির আওতায় নারী শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতার শর্ত শিথিল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর নীতিগত ভিত্তি আরও জোরালো হয়। তবে নারী প্রার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট হারে পদ সংরক্ষণের ব্যবস্থা ঠিক কোন বছর প্রথম চালু হয়েছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় নি। নব্বইয়ের দশকের নিয়োগসংক্রান্ত নথিতে এ ধরনের কোটার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। জাতিসংঘে বাংলাদেশের জমা দেওয়া নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডও)–বিষয়ক প্রতিবেদনে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে ৬০ শতাংশ নারী কোটা এবং ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ সালের নিয়োগের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালে নারী কোটায় সংরক্ষিত ২ হাজার ৫৫৫টি পদের বিপরীতে নিয়োগ পান ২ হাজার ৩৬ জন। ১৯৯৮ সালে ৬ হাজার ৪৪০টি সংরক্ষিত পদের বিপরীতে নিয়োগ দেওয়া হয় ৪ হাজার ৮৯৯ জনকে। অর্থাৎ, সংরক্ষিত সব পদে ওই বছরগুলোতে নিয়োগ সম্পন্ন হয়নি।
নারী শিক্ষকের অংশগ্রহণ বাড়ার দীর্ঘমেয়াদি চিত্রও উঠে এসেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঐতিহাসিক পরিসংখ্যানে। ১৯৯০ সালে প্রাথমিক শিক্ষকদের মধ্যে নারীর হার ছিল ২০ দশমিক ৫৭ শতাংশ। ১৯৯৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৬ দশমিক ৯ শতাংশে। ২০০০ সালে নারী শিক্ষকের হার ছিল ৩৩ দশমিক ৯ শতাংশ, আর ২০০৫ সালে তা বেড়ে ৪৪ দশমিক ২৬ শতাংশে পৌঁছায়। অর্থাৎ, এই ১৫ বছরে শিক্ষকতায় নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এরপর আসে গুরুত্বপূর্ণ এক মাইলফলক। ২০০৭ সালে প্রাথমিক শিক্ষকদের মধ্যে নারীর হার দাঁড়ায় ৫০ দশমিক ২ শতাংশে অর্থাৎ মোট শিক্ষকের অর্ধেকেরও বেশি হয়ে ওঠেন নারী। পরের বছরগুলোতেও এই প্রবণতা অব্যাহত ছিল। ২০০৮ সালে নারী শিক্ষকের হার ছিল ৫২ দশমিক ৭৪ শতাংশ, ২০০৯ সালে ৫৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২০১২ সালে ৫৮ দশমিক ২ শতাংশ। মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানে ২০১৩ সালে এ হার ৫৭ শতাংশ এবং ২০১৪ সালে ৫৭ দশমিক ৮ শতাংশ দেখানো হয়েছে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে আলাদাভাবে বিবেচনা করলে নারী শিক্ষকের অংশগ্রহণের হার আরও বেশি দেখা যায়। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ২০১৩ সালের বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় শুমারির তথ্য অনুযায়ী, ওই বছর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ৬৪ দশমিক ২ শতাংশই ছিলেন নারী। তবে মন্ত্রণালয়ের সামগ্রিক পরিসংখ্যানের সঙ্গে এই হারের পার্থক্যের একটি কারণ হলো, দুই হিসাবের আওতাভুক্ত বিদ্যালয়ের ধরন এক নয়।
প্রভাব ফেলেছে যা
দীর্ঘ সময়ের এই পরিসংখ্যান বলে দেয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষকের অংশগ্রহণ একসময়কার সংখ্যালঘু অবস্থান থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পৌঁছেছে। তবে এই পরিবর্তনের পেছনে নারী কোটা কতটা ভূমিকা রেখেছে, আর শিক্ষার সম্প্রসারণ ও অন্যান্য নিয়োগনীতির অবদান তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। তবে শিক্ষকের সংখ্যা বাড়ার পেছনে নিয়োগে সংরক্ষিত কোটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকতে পারে। তবে বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রায় ৬৭ শতাংশ নারী হওয়ার পেছনে শুধু এই একটি কারণকে দায়ী করা যায় না। কয়েক দশক ধরে শিক্ষাব্যবস্থার সম্প্রসারণ, নতুন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, শিক্ষক নিয়োগের পরিধি বৃদ্ধি এবং নারীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনের সুযোগ বাড়ার মতো বিষয়ও এ ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে।
একই সঙ্গে শিক্ষকতায় নারীদের প্রবেশ, পুরুষ ও নারী শিক্ষকদের অবসরের হার এবং বিভিন্ন সময়ে নিয়োগনীতির পরিবর্তনও শিক্ষকসংখ্যার অনুপাত গড়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছে। ফলে নারী শিক্ষকের বর্তমান অংশগ্রহণের দিকে তাকালে শুধু নিয়োগে কোটা সংরক্ষণের ইতিহাস নয়, প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় কয়েক দশকে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনগুলোও চোখে পড়ে।
নারী শিক্ষকের অংশগ্রহণ বাড়ানোর সঙ্গে মেয়েশিশুদের শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের লক্ষ্যও যুক্ত ছিল। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক থাকলে মেয়েশিশুরা তুলনামূলক স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতে পারে, অভিভাবকদের আস্থা বাড়তে পারে এবং স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্যালয়ে মেয়েদের অংশগ্রহণ উৎসাহিত হতে পারে এমন প্রত্যাশাও নীতিনির্ধারণে গুরুত্ব পেয়েছে।
নারী শিক্ষার্থীদের শিক্ষায় অংশগ্রহণ ও অগ্রগতি বাড়ছে। তবে অতীতের শিক্ষাগত চিত্র বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে পুরুষ শিক্ষার্থীদের উত্তীর্ণ হওয়ার হার বেশি ছিল। এখন উচ্চশিক্ষিত অনেক পুরুষও বেকার রয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে নারী প্রার্থীদের যদি বিপুলসংখ্যক পুরুষ প্রার্থীর সঙ্গে একই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সীমিতসংখ্যক পদে নিয়োগ পেতে হয়, তাহলে তাঁদের জন্য সেই প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।— অধ্যাপক মো. ফজলুর রহমান, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
নতুন বিধিমালায় কী বদলাবে চিত্র
নারী শিক্ষকদের জন্য নির্ধারিত নিয়োগ কোটা তুলে দেওয়ার ফলে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে নারী-পুরুষের আলাদা সুযোগ থাকছে না। তবে প্রতিযোগিতার নিয়ম এক করে দিলেই প্রতিযোগিতার বাস্তব পরিস্থিতি সবার জন্য সমান হয়ে যায় কি না, সেই প্রশ্নও সামনে আসছে। কারণ, চাকরির প্রস্তুতি, পরীক্ষায় অংশগ্রহণ এবং কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের সামাজিক বাস্তবতা সব সময় এক নয়। পারিবারিক দায়িত্ব, সন্তান লালন-পালন, যাতায়াতের সীমাবদ্ধতা ও সামাজিক প্রত্যাশার চাপ অনেক নারীর জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো. ফজলুর রহমান বলেন, আমি একজন শিক্ষক হিসেবে মনে করি, প্রাথমিক স্তরে ছোট শিশুদের পাঠদান ও দেখভালের ক্ষেত্রে নারী শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শিশুরা যখন প্রাক্-প্রাথমিক থেকে বিদ্যালয়ের পরিবেশে আসতে শুরু করে, তখন তাদের যত্ন নেওয়া, মানিয়ে নিতে সহায়তা করা এবং সামলানোর ক্ষেত্রে নারী শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা ও ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, আরেকটি বিষয় হলো, বর্তমানে নারী শিক্ষার্থীদের শিক্ষায় অংশগ্রহণ ও অগ্রগতি বাড়ছে। তবে অতীতের শিক্ষাগত চিত্র বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে পুরুষ শিক্ষার্থীদের উত্তীর্ণ হওয়ার হার বেশি ছিল। এখন উচ্চশিক্ষিত অনেক পুরুষও বেকার রয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে নারী প্রার্থীদের যদি বিপুলসংখ্যক পুরুষ প্রার্থীর সঙ্গে একই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সীমিতসংখ্যক পদে নিয়োগ পেতে হয়, তাহলে তাঁদের জন্য সেই প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। আমার আশঙ্কা, নারী শিক্ষকদের জন্য আগের মতো কোটা বা বিশেষ সুযোগ না থাকলে নিয়োগে নারী-পুরুষের অংশগ্রহণের মধ্যে একধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে।
অংশগ্রহণ ধরে রাখতে নীতিগত পর্যালোচনা প্রয়োজন
দীর্ঘদিনের নিয়োগপ্রক্রিয়া, শিক্ষার বিস্তার ও নারীদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সুযোগ বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষকের সংখ্যা বেড়েছে। তবে প্রাথমিক শিক্ষায় নারী শিক্ষকের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং সেই অংশগ্রহণ ধরে রাখা দুটোই ভিন্ন নীতিগত চ্যালেঞ্জ বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
অধ্যাপক ফজলুর রহমান বলেন, নিয়োগনীতিতে পরিবর্তন আনার সময় নারীদের বাস্তব প্রতিবন্ধকতাগুলো উপেক্ষা করা উচিত নয়। নারী ও অন্যান্য পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকারের নীতিগতভাবে সংবেদনশীল থাকা প্রয়োজন। কারণ নারী-পুরুষের প্রতিযোগিতাকে শুধু পরীক্ষার নম্বর দিয়ে বিচার করলে বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার সব দিক বিবেচনায় আসে না। পুরুষদের তুলনায় অনেক নারীকে পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্বের অতিরিক্ত চাপ সামলাতে হয়। ফলে নিয়োগে একই নিয়ম কার্যকর হলেও প্রস্তুতির সুযোগ ও প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার বাস্তব পরিস্থিতি সবার ক্ষেত্রে সমান নাও হতে পারে। এ কারণে নারী কোটা বাতিলের প্রভাব মূল্যায়নের সময় শুধু নিয়োগের নীতিমালা নয়, নারীদের অংশগ্রহণের বাস্তব পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
আমি ব্যক্তিগতভাবে নিয়মিত নিয়োগপ্রক্রিয়ায় কোটা ব্যবস্থার পক্ষপাতী নই। আমার মনে হয়, নারীদের নিজেদের যোগ্যতা ও আত্মবিশ্বাসের ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত। তবে একই সঙ্গে এটাও বিবেচনা করতে হবে, নারীদের ঘরের কাজ ও পারিবারিক দায়িত্ব সামলে কর্মক্ষেত্রে আসতে হয়। এই বাস্তবতা পরিবর্তনের জন্য সামাজিক কাঠামো ও দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন প্রয়োজন।— ড. তানিয়া হক, অধ্যাপক, উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ, ঢাবি
সামাজিক কাঠামো বদলানো প্রয়োজন
নারীর কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বাড়াতে শুধু নিয়োগনীতিতে পরিবর্তন আনাই যথেষ্ট নয়, বদলাতে হবে ঘরের ভেতরের দায়িত্ব বণ্টনের চিত্রও। পারিবারিক কাজ ও সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব নারীর ওপর এককভাবে চাপিয়ে না দিয়ে পুরুষের অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে নারীদের কর্মজীবনে প্রবেশ ও প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ আরও সহজ হতে পারে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. তানিয়া হক।
তিনি বলেন, কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তার প্রভাব কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা মূল্যায়নে সাধারণত প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হয় না। নারী শিক্ষক নিয়োগে কোটা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল, তা নিয়েও গবেষণা হওয়া উচিত ছিল। তার মতে, কোটা ব্যবস্থার পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার আগে এর কার্যকারিতা ও প্রভাব সম্পর্কে তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন জরুরি।
কোটা ব্যবস্থা নিয়ে তিনি বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে নিয়মিত নিয়োগপ্রক্রিয়ায় কোটা ব্যবস্থার পক্ষপাতী নই। আমার মনে হয়, নারীদের নিজেদের যোগ্যতা ও আত্মবিশ্বাসের ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত। তবে একই সঙ্গে এটাও বিবেচনা করতে হবে, নারীদের ঘরের কাজ ও পারিবারিক দায়িত্ব সামলে কর্মক্ষেত্রে আসতে হয়। এই বাস্তবতা পরিবর্তনের জন্য সামাজিক কাঠামো ও দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন প্রয়োজন।
এই অধ্যাপকের মতে, নারীদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বাড়াতে হলে শুধু নিয়োগনীতির ওপর নির্ভর করলে চলবে না বরং নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া সামাজিক দায়িত্বগুলোও যৌক্তিকভাবে পুনর্বিবেচনা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনগুলো আবেগ বা ব্যক্তিগত প্রত্যাশার ভিত্তিতে নয় বরং গবেষণা ও বাস্তব তথ্যের আলোকে নির্ধারণ করা উচিত।
তিনি আরও বলেন, নারীদের জন্য আলাদা পরিসর তৈরি করে রাখার পরিবর্তে এমন সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে পুরুষেরাও ঘরের কাজ ও পারিবারিক দায়িত্বে সমানভাবে যুক্ত হবেন। এতে নারীদের এককভাবে সব দায়িত্ব সামলে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের চাপ কমবে এবং তাঁদের জন্য প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ আরও বাস্তবসম্মত হবে।