নতুন নীতিমালায় প্রাথমিক শিক্ষক বদলিতে ধীরগতি
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বদলি ও পদায়নে নতুন নীতিমালা চালুর পর চার স্তরের কমিটির মাধ্যমে কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নতুন পদ্ধতি চালুর পর কমিটি গঠনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে এলেও সব জায়গায় তা সম্পন্ন হয়নি। এ নিয়ে সারা দেশে কমিটি গঠনের বর্তমান অবস্থা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে তথ্য নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।
এ বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আমার জানা মতে অল্প কিছু জায়গায় কমিটি গঠন করা বাকি আছে। অধিকাংশ জায়গায় কমিটি গঠিত হয়ে গেছে। সারাদেশে সব জায়গায় কমিটি কেন গঠিত হয় নি সেটা খবর নেওয়ার জন্য বলেছি।’
নতুন ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বদলির ধরন অনুযায়ী আবেদন নির্দিষ্ট কমিটির কাছে যাবে। ফলে একজন শিক্ষক আবেদন করলেই সেটি জাতীয় পর্যায়ে যাবে না। এক্ষেত্রে একই উপজেলা বা থানার মধ্যে বদলি হলে উপজেলা বা থানা কমিটি আবেদন যাচাই করবে। এই কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। সদস্য হিসেবে থাকবেন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং দুজন বিদ্যোৎসাহী বা শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি। সদস্যসচিব উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা।
একই জেলার এক উপজেলা থেকে অন্য উপজেলায় বদলি হলে আবেদন যাবে জেলা কমিটির কাছে। জেলা কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক (ডিসি), সদস্য জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং দুজন বিদ্যোৎসাহী বা শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি। সদস্যসচিব জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। এক জেলা থেকে অন্য জেলায় বদলির আবেদন যাবে বিভাগীয় কমিটিতে।
এই কমিটির সভাপতি বিভাগীয় কমিশনার। সদস্য হিসেবে থাকবেন বিভাগীয় উপপরিচালক (মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা) এবং দুজন বিদ্যোৎসাহী বা শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি। সদস্যসচিব বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা উপপরিচালক। আর এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে বদলি এবং সিটি করপোরেশনসংক্রান্ত বদলির আবেদন জাতীয় কমিটি যাচাই-বাছাই করবে।
জাতীয় কমিটির কাঠামোয়ও পরিবর্তন আনা হয়েছে। গত জুনে নতুন পদ্ধতি চালুর সময় জাতীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছিল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবকে। পরে জুলাইয়ে নীতিমালা সংশোধন করে এ কাঠামোতে পরিবর্তন আনা হয়। বর্তমানে জাতীয় কমিটির সভাপতি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। সদস্য হিসেবে রয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (বিদ্যালয়) এবং সদস্যসচিব প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (পলিসি ও অপারেশন)।
নতুন ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বদলির ধরন অনুযায়ী আবেদন নির্দিষ্ট কমিটির কাছে যাবে। ফলে একজন শিক্ষক আবেদন করলেই সেটি জাতীয় পর্যায়ে যাবে না। এক্ষেত্রে একই উপজেলা বা থানার মধ্যে বদলি হলে উপজেলা বা থানা কমিটি আবেদন যাচাই করবে। এই কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। সদস্য হিসেবে থাকবেন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং দুজন বিদ্যোৎসাহী বা শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি। সদস্যসচিব উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা।
একই সময়ে উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় কমিটিতে ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’ রাখার বিধানও পরিবর্তন করা হয়। এর পরিবর্তে বিদ্যোৎসাহী বা শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রথম নীতিমালায় বাইরের ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’ যুক্ত করার বিষয়টি নিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের একাংশের মধ্যে তদবির ও প্রভাব খাটানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। পরে সংশোধিত নীতিমালায় এ বিষয়ে পরিবর্তন আনা হয়।
প্রতিদিনই প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে নতুন নীতিমালায় বদলি সংক্রান্ত বিষয়ে জড়ো হচ্ছেন শিক্ষকরা। পুরো পদ্ধতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় কেউ কেউ সরাসরি অধিদপ্তরে চলে আসছেন। কেউ কেউ এই পদ্ধতি সঠিকভাবে কাজ করবে কি না এ নিয়ে বিশ্বাস না থাকায় সরাসরি অধিদপ্তরে চলে আসছেন। আবার আবেদন জমা দেওয়ার পর অনেক শিক্ষক তাঁদের আবেদনের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতেও সরাসরি অধিদপ্তরে চলে আসছেন। ফলে যথোপযুক্ত পদ্ধতি অবলম্বন না করেই সরাসরি অধিদপ্তরে না আসার জন্য কর্মকর্তাদের অনুরোধ করতেও দেখা গেছে।
মহাপরিচালরকের দপ্তরে নতুন নিয়মে বদলি সংক্রান্ত পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা দিতে একটি নির্দেশনা সম্বলিত একটি ব্যানারও টানানো হয়েছিল। যদিও পরে তা সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে এখনও বদলি নিয়ে কোনো অভিযোগ পান নি বলে জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, ‘নতুন একটা সিস্টেম শুরু করলে ট্রানজিশন পিরিয়ড থাকে। সেটা কীভাবে হবে, কারা করবে, কমিটি কীভাবে গঠিত হবে, আবেদনগুলো কোথায় যাবে, কারা এটা দেখবে, দেখার পরে কী হবে এই ইস্যুগুলো তো আছে। এই ট্রানজিশন পিরিয়ড শেষ হয়ে গেলে একটা সিস্টেমের মধ্যে চলে যাব। তবে এখন পর্যন্ত বড় কোনো সমস্যা হয়নি।’
এদিকে আন্তবিভাগে অথবা আন্তসিটি করপোরেশনের ক্ষেত্রে সহকারী শিক্ষকদের বদলির আবেদন যাচাই–বাছাই করে কমিটির অনুমোদন সাপেক্ষে বদলির আদেশ জারির ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্দেশ রয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পলিসি ও অপারেশন বিভাগের পরিচালকের উপর।
পলিসি ও অপারেশন বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, কোন আবেদন কোন কমিটির আওতাভুক্ত তা প্রথমে নির্ধারণ করতে হচ্ছে। এরপর সংশ্লিষ্ট কমিটি আবেদন ও কাগজপত্র যাচাই করছে। কমিটির সিদ্ধান্ত বা সুপারিশের পর প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে তা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হচ্ছে। সবশেষে অনুমোদন পাওয়া গেলে বদলির আদেশ জারি হবে। তবে কোনো আবেদন অনুমোদিত হয়েছে কি না তা অফিসিয়াল আদেশ জারি হওয়ার আগে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে অগ্রগতি জানতে সরাসরি অধিদপ্তরে না এসে আবেদনকারীদের এ প্রক্রিয়ায় ধৈর্য ধরতে হবে।
জাতীয় কমিটির সর্বশেষ একটি বৈঠকেই আনুমানিক ২৫০টি বদলির আবেদন পাওয়া গেছে। তবে সারা দেশে এখন পর্যন্ত মোট কতটি আবেদন জমা পড়েছে তার নির্দিষ্ট হিসাব অধিদপ্তরের কাছে নেই।
প্রতি মাসে অন্তত একবার সভা আহ্বান করে কমিটিকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বদলির আবেদন যাচাই-বাছাই করে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য বলা হয়েছিল প্রজ্ঞাপনে। জাতীয় কমিটির সভাপতি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং সদস্য হিসেবে রয়েছেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক।
জাতীয় কমিটি ইতোমধ্যে দুই দফা বৈঠক করেছে। প্রথম বৈঠকে কমিটি কীভাবে কাজ করবে, আবেদনগুলো কীভাবে যাচাই করা হবে, কোন বিষয়গুলো দেখা হবে এবং সেগুলো কীভাবে উপস্থাপন করা হবে এসব বিষয়ে কার্যপদ্ধতি ঠিক করা হয়। এরপর দ্বিতীয় বৈঠকে জাতীয় কমিটির আওতাভুক্ত আবেদনগুলো উপস্থাপন করা হয়েছে। এসব আবেদনের সঙ্গে থাকা কাগজপত্রও পর্যালোচনা করা হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, ‘আমি অলরেডি দুইবার মিটিং করেছি। একবার মিটিং করে আমরা আমাদের মডালিটি অর্থাৎ কীভাবে কাজগুলো করব, কীভাবে সাজাব, কোন বিষয়গুলো দেখব এবং কীভাবে উপস্থাপন করব এগুলো ঠিক করেছি। এরপর আরেকটা মিটিং করেছি, যেখানে আবেদনগুলো উপস্থাপন করেছি এবং কাগজপত্র পর্যালোচনা করেছি। এখন এসব আবেদন ও কমিটির সুপারিশ পরবর্তী প্রক্রিয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।’
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পলিসি ও অপারেশন সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় কমিটির সর্বশেষ একটি বৈঠকেই আনুমানিক ২৫০টি বদলির আবেদন পাওয়া গেছে। তবে সারা দেশে এখন পর্যন্ত মোট কতটি আবেদন জমা পড়েছে তার নির্দিষ্ট হিসাব অধিদপ্তরের কাছে নেই।
বদলির আবেদন সংখ্যা অধিদপ্তরের কাছে না থাকার কারণ হিসেবে জানা গেছে, প্রতিদিনই আবেদন জমা পড়ছে। আবার সব আবেদন জাতীয় কমিটির আওতাভুক্তও নয়। কোনোটি উপজেলা, কোনোটি জেলা, কোনোটি বিভাগীয় এবং কোনোটি জাতীয় কমিটির এখতিয়ারভুক্ত। তাই আবেদনগুলো আগে বাছাই করে সংশ্লিষ্ট কমিটির কাছে পাঠাতে হচ্ছে।
অধিদপ্তরের পলিসি ও অপারেশন বিভাগ সূত্রে আরও জানা যায়, সব আবেদন একসঙ্গে যাচাই করা সম্ভব হয় না। বিশেষ করে সারা দেশে শিক্ষকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় কোনো কোনো সময়ে একসঙ্গে অনেক আবেদন জমা পড়ে। ফলে এখনও সুনির্ধারিত তথ্য নেই। নীতিমালা সংশোধনের সময় বদলির ক্ষেত্রে সাতটি শর্তও যুক্ত করা হয়েছে। ফলে এখন আবেদন করলেই একজন শিক্ষক বদলির জন্য যোগ্য বিবেচিত হবেন না।
নীতিমালা অনুযায়ী, চাকরির মেয়াদ কমপক্ষে দুই বছর পূর্ণ না হলে কোনো সহকারী শিক্ষক বা শিক্ষিকা বদলির জন্য বিবেচিত হবেন না। একবার বদলির পর তিন বছর পূর্ণ না হলেও পুনরায় বদলির আবেদন করা যাবে না। সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ে কেবল শূন্য পদের বিপরীতে বদলি করা যাবে। কোনো শিক্ষকের আবেদন ছাড়া তাঁকে অন্য বিদ্যালয়ে বদলি করা যাবে না। তবে জনস্বার্থে বা প্রশাসনিক কারণে জাতীয় কমিটির অনুমোদন নিয়ে এ ধরনের বদলি করা যাবে।
আরও পড়ুন: এবারের গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা কবে, কী বলছেন উপাচার্যরা?
এ ছাড়া যেসব বিদ্যালয়ে পাঁচজন বা তার কম শিক্ষক কর্মরত আছেন অথবা শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:৪০-এর বেশি, সেসব বিদ্যালয় থেকে শিক্ষক বদলি করা যাবে না। একই বিদ্যালয় থেকে একাধিক শিক্ষক বদলির আবেদন করলে জ্যেষ্ঠ শিক্ষক অগ্রাধিকার পাবেন। একটি বিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ তিনজন শিক্ষককে ‘সংযুক্তি’ পদায়ন করা যাবে। সব শর্ত পূরণ সাপেক্ষে শিক্ষিকারা তাঁদের স্থায়ী ঠিকানা বা স্বামীর ঠিকানার নিকটবর্তী বিদ্যালয়ে বদলির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন।
বদলির আবেদনের মধ্যে মানবিক কারণও রয়েছে বলেও জানা গেছে । কোনো কোনো শিক্ষক বা তাঁদের পরিবারের সদস্যের এমন চিকিৎসার প্রয়োজন হয়, যা নিজ এলাকায় সম্ভব নয়। এ কারণে ঢাকাসহ বড় শহরের কাছাকাছি বদলির জন্য আবেদন করা হয়।
পলিসি ও অপারেশন বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, এ ধরনের আবেদনও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও কারণ বিবেচনা করে উপযুক্ত আবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হতে পারে। তবে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া এসব আবেদন চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে না। কারণ নতুন পদ্ধতিতে আবেদন করলেই বদলি নিশ্চিত নয়। আবেদন জমা দেওয়া আর বদলির অনুমোদন পাওয়া এক বিষয় নয়।
এদিকে নতুন করে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ ও পদায়ন হলে বদলির আবেদনের চাপ আরও বাড়তে পারে। নতুন শিক্ষকরা পদায়নের পর পছন্দের বা সুবিধাজনক এলাকার বিদ্যালয়ে যেতে বদলির আবেদন করতে পারেন। ফলে বর্তমানে জমা থাকা আবেদন নিষ্পত্তির পাশাপাশি নতুন শিক্ষকদের সম্ভাব্য আবেদনও সামলাতে হবে চার স্তরের কমিটিগুলোকে।