প্রাথমিকের নতুন শিক্ষাক্রমে ‘সাংস্কৃতিক শিক্ষা’ অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে: প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ
প্রাথমিক শিক্ষার নতুন শিক্ষাক্রমে ‘সাংস্কৃতিক শিক্ষা’ অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেন, এতে আবৃত্তি, ক্বেরাত, নাচ, নাটক ও সঙ্গীতসহ বিভিন্ন সৃজনশীল কার্যক্রমের সুযোগ থাকবে। নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী বিষয় নির্বাচন করতে পারবেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। সাংস্কৃতিক শিক্ষা নিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিতর্কের কোনো সুযোগ নেই।
বৃহস্পতিবার (২৬ জুন) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে সংগীত বিভাগ আয়োজিত রবীন্দ্র-নজরুল উৎসবে তিনি এসব কথা বলেন।
এ বিষয়ে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক সৃষ্টি না করে শিশুদের সামগ্রিক বিকাশের স্বার্থে সবাইকে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার আহ্বানও জানান তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সংগীত, সাহিত্য, আবৃত্তি, নাটক, চিত্রকলা কিংবা কেরাত-সবই শিশুদের আত্মপ্রকাশের সুযোগ তৈরি করে। কোনো শিক্ষার্থী কোন মাধ্যমে নিজেকে বিকশিত করবে, সেটি তার ও তার পরিবারের পছন্দের বিষয়। নতুন প্রজন্মকে সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ করতে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সাহিত্য এবং সংগীতচর্চার কোনো বিকল্প নেই। তাদের অসাম্প্রদায়িকতা, মানবতা ও সাম্যের দর্শন সমাজকে আলোকিত করতে পারে।’
‘সংগীত মানুষের আত্মিক ও মৌলিক অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিকতার প্রতিটি স্তরে সংগীতের প্রভাব রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল শুধু সাহিত্যিক নন, তারা আমাদের জাতীয় জীবনের চিরন্তন আইকন। তাদের সৃষ্টিকর্মের মধ্যেই বাংলা সংস্কৃতির মূল ভিত্তি নিহিত রয়েছে।’
সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিক শিক্ষায় শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা বাড়াতে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত মানবসম্পদ প্রয়োজন। সে লক্ষ্যে সংগীত, চারুকলা ও নাট্যকলা বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীরা যাতে সহজেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের সুযোগ পান, সে বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
আরও পড়ুন: প্রাথমিকে চারুকলা-সংগীত-নাট্যকলা গ্র্যাজুয়েটদের নিয়োগে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে: প্রতিমন্ত্রী
এ সময় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. সাবিনা শারমিন বলেন, ‘প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে শিক্ষার্থীদের মানবিক মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক বোধ জাগ্রত রাখতে সাহিত্য, সংগীত ও সংস্কৃতিচর্চার গুরুত্ব অপরিসীম। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের দর্শন নতুন প্রজন্মকে আলোকিত, সহনশীল ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করবে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের এ আয়োজন নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।’
সভাপতির বক্তব্যে সংগীত বিভাগের চেয়ারম্যান ও অনুষ্ঠানের সভাপতি ড. অনিমা রায় বলেন, ‘শুদ্ধ সংগীত চর্চা এবং আমাদের সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিতে তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর ও আশাব্যঞ্জক পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগ আয়োজিত এই উৎসবের মূল উদ্দেশ্যই হলো আমাদের মহান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে তরুণদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া।’
তিনি আরও বলেন, ‘সংস্কৃতি হলো একটি দেশের আয়না। আমরা কেবল বিনোদনের জন্য গান করি না; সংগীত মানুষের মনস্তত্ত্বের গভীরে প্রবেশ করে। একজন হতাশ মানুষকে সুস্থ করে তুলতে এবং পথভ্রষ্টকে সঠিক পথ দেখাতে সংগীতের সুর ও রাগ এক ধরনের থেরাপি বা মেডিটেশন হিসেবে কাজ করে। এই মহৎ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত আমাদের শিক্ষার্থীদের যথাযথ সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন প্রয়োজন। সংস্কৃতির এই লড়াইয়ে যারা পাশে দাঁড়ান, তারাই প্রকৃত দেশপ্রেমিক।’
আয়োজকরা জানান, দুই দিনব্যাপী এ উৎসবের প্রথম দিন ‘রবীন্দ্র-পর্ব’-এ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য ও সংগীতকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। সমাপনী দিনে ‘নজরুল-পর্ব’-এর মাধ্যমে জাতীয় কবির অসাম্প্রদায়িকতা, সাম্যবাদী চেতনা এবং সাংস্কৃতিক অবদান নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা হয়েছে।
উৎসবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সংগীতানুরাগীরা অংশগ্রহণ করেন। দুই দিনের এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্র ও নজরুল চর্চার ধারাবাহিকতা আরও সমৃদ্ধ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন ।