বিএনপির হাল ধরলেন রিজভী, দীর্ঘ পথের বিশ্বস্ত নেতার নতুন পরীক্ষা
সাংগঠনিক রাজনীতির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, আন্দোলন-সংগ্রামে সামনের সারিতে থাকা এবং দলের দুঃসময়ে ধারাবাহিক ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে বিএনপির ‘ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবে’র দায়িত্ব পেলেন রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। দলের সদ্য বিদায়ী মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর শূন্য হওয়া মহাসচিবের দায়িত্বে আপাতত তিনিই দলের হাল ধরলেন।
বিএনপির রাজনীতিতে রুহুল কবির রিজভীর পরিচয় মূলত মাঠের সংগঠক ও দলের মুখপাত্র হিসেবে। দীর্ঘদিন ধরে দলের কর্মসূচি, আন্দোলন, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় এই নেতা এবার পেলেন বিএনপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্ব।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বিএনপির পক্ষ থেকে দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দলের গঠনতন্ত্রের ৭(খ)৬ ধারা অনুযায়ী জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য রিজভী আহমেদকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মনোনীত করা হয়েছে। সিদ্ধান্তটি অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিএনপির মহাসচিব পদটি শূন্য হয়। সেই শূন্যতায় রিজভীর নামই আলোচনায় ছিল সবচেয়ে বেশি। দলটির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নেতাকর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগই তাকে এই দায়িত্বের জন্য এগিয়ে রাখে।
বাম ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয়তাবাদী
রিজভী আহমেদের রাজনৈতিক পথচলার শুরু বিএনপির রাজনীতি দিয়ে নয়। উচ্চমাধ্যমিক শেষ করার পর তিনি বামপন্থি বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের মাধ্যমে ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হন। রাজশাহী সরকারি কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলে যোগ দিয়ে তার রাজনৈতিক জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ছাত্রদলের রাজনীতিতে দ্রুত সংগঠক হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করেন। বিশ্ববিদ্যালয় শাখার প্রচার সম্পাদক ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। পরে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্বও পান। বিএনপির অন্যতম সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাংগঠনিক ইতিহাসে রিজভীই প্রথম ভোটের মাধ্যমে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯২ সালের ১৬জুন ছাত্রদলের কাউন্সিলে রিজভী সভাপতি হন। ওই কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের আমলে গুমের শিকার হওয়া ইলিয়াস আলী। যদিও তৎকালীন ছাত্র রাজনীতির ‘ক্যাডার সংস্কৃতি’ ও সংগঠনের গ্রুপিংয়ের কারণে খুব স্বল্প (কমিটির গঠনের মাত্র তিন মাসের মাথায়, সেপ্টেম্বর) সময়েই ছাত্রদলের সেই নির্বাচিত কমিটি ভেঙ্গে দিতে বাধ্য হন বিএনপির তৎকালীন হাইকমান্ড।
আরও পড়ুন: ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান থেকে বঙ্গভবনে মির্জা ফখরুল
১৯৮৯ সালের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ—রাকসু নির্বাচনে ভিপি নির্বাচিত হওয়া তার ছাত্ররাজনীতির অন্যতম বড় অর্জন। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তিনি ওই দায়িত্বে ছিলেন। রাকসুর ভিপি ও ছাত্রনেতা হিসেবে রিজভী তৎকালীন সামরিক স্বৈরাচার এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেন। স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সরকারের পেটোয়া বাহিনীর নির্যাতন ও মেরুদণ্ডে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি যুবক বয়সেই চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেন।
ছাত্ররাজনীতির এই অভিজ্ঞতাই পরবর্তী সময়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় সংগঠনে তার সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ওঠে। রাজপথের কর্মসূচি থেকে দলীয় কার্যালয়ের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড—দুই জায়গাতেই দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় ছিলেন তিনি।
আন্দোলনের রাজনীতি, গ্রেপ্তার ও প্রতিকূলতা
বিএনপির রাজনীতিতে রিজভীর উত্থান ঘটে এমন এক সময়ে, যখন দলটি দীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলন-সংগ্রাম ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে গেছে। বিভিন্ন সময়ে বিএনপির কর্মসূচি বাস্তবায়ন, সরকারের তথ্য সমৃদ্ধ সমালোচনা এবং দলীয় অবস্থান তুলে ধরতে তাকে নিয়মিত সামনে থাকতে দেখা গেছে।
বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় মুখপাত্রের অন্যতম প্রধান ভূমিকায় ছিলেন। নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নিয়মিত (প্রায় দিন, কোনো কোনোদিন একাধিকবার) সংবাদ সম্মেলন করে দলের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরেছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন নীতি ও কর্মকাণ্ডের সমালোচনা, নির্বাচন, আন্দোলন এবং দলীয় কর্মসূচি নিয়ে তার বক্তব্য বিএনপির রাজনৈতিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
এই সময়টিতে মামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক চাপও তার রাজনৈতিক জীবনের অংশ হয়েছে। ফলে রিজভীর রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে ‘দুঃসময়ের নেতা’ অভিধাটিও ধীরে ধীরে যুক্ত হয়েছে। যার প্রশংসা ও স্বীকৃতি স্বয়ং বিএনপির দীর্ঘদিনের চেয়ারপারসন মরহুমা খালেদা জিয়া প্রকাশ্য দলীয় ফোরামে করেছেন।
সংগঠনের সিঁড়ি বেয়ে কেন্দ্রে
ছাত্রদলের নেতৃত্ব থেকে বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে আসার পর রিজভী ধীরে ধীরে দলের সাংগঠনিক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন। ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে তিনি দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে তিনি এই পদে থেকে দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন।
তার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য হল—দলের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তকে মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া এবং মাঠের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কেন্দ্রের যোগাযোগ ধরে রাখা। বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে এই ভূমিকাই তাকে অন্য অনেক নেতার চেয়ে আলাদা করেছে।
২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়ও তার সাংগঠনিক দক্ষতার ওপর আস্থা রাখে দল। নির্বাচনের জন্য গঠিত বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিবের গুরু দায়িত্ব পালন করেন তিনি। নির্বাচনী মাঠের সমন্বয় থেকে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন—দলীয় কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যায়ে তখনও ছিলেন রিজভী।
প্রথমে স্থায়ী কমিটিতে, এরপর মহাসচিবের দায়িত্ব
রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে চলতি আগস্টেই বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হন রিজভী। ১৫ আগস্ট তাকে স্থায়ী কমিটিতে নেওয়া হয়। এর মাত্র কয়েক দিনের মাথায় দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পেলেন তিনি।
আরও পড়ুন: চমক আসছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে, আলোচনায় জাতীয় কাউন্সিলও
এর ফলে তার রাজনৈতিক জীবনে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব যুক্ত হলো খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে। দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব থেকে স্থায়ী কমিটির সদস্য, এরপর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব—এটি নিঃসন্দেহে রিজভী আহমেদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ বাঁক।
সামনে পরীক্ষা
তবে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব রিজভীর জন্য শুধু পদোন্নতি নয়; এটি একই সঙ্গে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা। বিএনপি এখন সরকার পরিচালনা করছে। ফলে বিরোধীদলের আন্দোলনকেন্দ্রিক রাজনীতির দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পর তাকে এবার সরকার ও দলের সম্পর্ক, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, তৃণমূলের প্রত্যাশা এবং দলের রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয় করতে হবে।
এতদিন রিজভী ছিলেন মূলত আন্দোলনরত দলের অন্যতম প্রধান মুখ। এখন তাকে সরকারে থাকা একটি বড় রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক কাঠামো পরিচালনায় ভূমিকা রাখতে হবে। অর্থাৎ রাজনৈতিক ভূমিকার ধরনেও আসছে বড় পরিবর্তন।
তার সামনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দলের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়। দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের পর বিএনপির বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী এখন রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় দলীয় শৃঙ্খলা, সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস এবং তৃণমূলের সঙ্গে কেন্দ্রের যোগাযোগ ধরে রাখা হবে তার অন্যতম বড় ও কঠিন দায়িত্ব।
বিশ্বস্ততার পুরস্কার, নাকি নতুন বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ?
রুহুল কবির রিজভীর রাজনৈতিক জীবনের দিকে চোখ রাখলে একটি ধারাবাহিকতা চোখে পড়ে—ছাত্ররাজনীতি থেকে সংগঠন, রাজপথ থেকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবং দলের দুঃসময়ে সক্রিয় ভূমিকা। দীর্ঘ সময়ের এই পথচলাতেই তৈরি হয়েছে তার বর্তমান অবস্থান।
মির্জা ফখরুলের বিদায়ের পর বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব তার হাতে তুলে দেওয়া তাই দলীয় রাজনীতিতে একটি প্রতীকী বার্তাও দিচ্ছে। দীর্ঘদিনের মাঠের নেতা, সাংগঠনিকভাবে পরীক্ষিত এবং দলের রাজনৈতিক বক্তব্যের অন্যতম প্রধান বাহক রিজভীতেই আপাতত সংগঠনের কেন্দ্রীয় হাল ধরতে চেয়েছে বিএনপি।
আরও পড়ুন: খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন: বিএনপির ক্রান্তিকালের মহাসচিব
তবে এই দায়িত্বের আসল মূল্যায়ন হবে সামনে। কারণ এতদিন যে রিজভী রাজপথে দাঁড়িয়ে দলের পক্ষে কথা বলেছেন, এখন তাকেই দলের ভেতরের নানা স্তরকে (নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা, দলীয় গ্রুপিং, কোন্দল) সামলে একসঙ্গে নিয়ে চলতে হবে। আন্দোলনমুখী রাজনীতি থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতায় বিএনপির সাংগঠনিক রূপান্তরের সময়েই দায়িত্ব পেলেন তিনি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদের ভিপি থেকে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব—দীর্ঘ পথের প্রতিটি বাঁকে নিজের রাজনৈতিক উপস্থিতি জানান দিয়েছেন রুহুল কবির রিজভী। এবার তার সামনে আরও বড় মঞ্চ। দলের দুঃসময়ের বিশ্বস্ত মুখ থেকে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব—রিজভীর রাজনৈতিক জীবনের নতুন অধ্যায়ের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা শুরু হলো আজ (২০ আগস্ট) থেকেই।