২৯ জুলাই ২০২৬, ১০:৪৬

আ. লীগসহ ১৪ দলের বৈঠকে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত হয়েছিল

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের বৈঠক  © সংগৃহীত

২০২৪ সালের ২৯ জুলাই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪–দলীয় জোটের বৈঠকে জামায়াত ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবনে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গণমাধ্যমকে বিষয়টি জানান।

বৈঠক শেষে গণভবনের ফটকে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, দেশের সাম্প্রতিক সন্ত্রাস, নাশকতা ও নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা এবং জনগণের জানমাল রক্ষায় আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন ১৪ দলের নেতারা। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সামরিক বাহিনীর ভূমিকাকেও তারা প্রশংসা করেন।

ওবায়দুল কাদের বলেন, ১৪ দলের নেতারা মনে করেন, বিএনপি-জামায়াত, ছাত্রদল-শিবির এবং তাদের দোসর উগ্রবাদী গোষ্ঠী সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে দেশকে অকার্যকর করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তাদের অভিযোগ ছিল, সাম্প্রতিক সময়ে চোরাগোপ্তা হামলা ও গুলিবর্ষণের মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে সরকারের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করা হয়েছে। পুলিশ সদস্যসহ বিভিন্ন মানুষকে হত্যা এবং লাশ ঝুলিয়ে রাখার ঘটনাকেও ইতিহাসে নজিরবিহীন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

আরও পড়ুন: ডেপুটি স্পিকারের নামে জাল ডিও লেটার, এসি ল্যান্ডকে প্রত্যাহার

তিনি আরও বলেন, জাতীয় স্বার্থে দেশবিরোধী এই অপশক্তিকে নির্মূল করা প্রয়োজন। সে কারণেই ১৪ দলের বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও শিক্ষা জীবনের সুরক্ষায় সরকারের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। নিরপরাধ মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল।

তখন বৈঠকে জানানো হয়েছিল, জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের বিষয়ে সরকার আগামী দুই-এক দিনের মধ্যেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

এর আগে, ১৯ জুলাই রাতে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার সঙ্গে ১৪ দলের বৈঠকে দেশে কারফিউ জারি ও সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তার ১০ দিন পর ২৯ জুলাই জরুরি বৈঠকে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্র জানিয়েছিল, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুরুতেই বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে সারা দেশে নাশকতা, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় জামায়াত-শিবির জড়িত বলে তার কাছে গোয়েন্দা প্রতিবেদন রয়েছে। তার ভাষ্য ছিল, এক মাস ধরে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে জামায়াত-শিবিরের প্রশিক্ষিত কর্মীদের ঢাকায় জড়ো করা হয়েছিল এবং তারাই এসব অপকর্মে অংশ নেয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখতে তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি মত দেন।

বৈঠকে শরিক দলগুলোর নেতারাও জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের পক্ষে মত দেন। ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময়ই বিষয়টি সামনে এসেছিল, তখন না হলেও এখন তা বিবেচনা করা যেতে পারে।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু সরাসরি জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের প্রস্তাব দেন। পাশাপাশি এ বিষয়ে জনমত গড়ে তুলতে মিছিল-সমাবেশ করারও আহ্বান জানান। সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া বলেন, জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের পাশাপাশি বিকল্প রাজনৈতিক শক্তিকেও এগিয়ে নিতে হবে।

বৈঠকে এ আশঙ্কাও উঠে আসে, জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ হলে তারা আত্মগোপনে গিয়ে অন্য কোনো শক্তির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। তবে জোটের নেতারা মনে করেন, সেটি বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে না।

জাতীয় পার্টি (জেপি) মহাসচিব শেখ শহিদুল ইসলাম বলেন, জামায়াত-শিবির আত্মগোপনে গেলেও ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থানকে গুরুত্ব না দেওয়ারও পরামর্শ দেন তিনি।

জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, জামায়াত-শিবির অতীতেও আত্মগোপনে ছিল। তবে রাষ্ট্রীয় সহায়তা না পেলে তারা তেমন কিছু করতে পারবে না।

তরীকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী বলেন, জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের জন্য তিনিই মামলা করেছিলেন। তার মতে, দলটিকে আরও আগেই নিষিদ্ধ করা উচিত ছিল।