জামায়াত-বিএনপিতে থাকা শরিকসহ ৭ ইসলামী দলের নতুন জোটের আভাস, নেতৃত্বে কারা?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জামায়াত ও বিএনপির রাজনৈতিক বলয়ে থাকা কওমি ঘরানার সাতটি ইসলামী দলকে এক ছাতার নিচে আনার উদ্যোগ নিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। দলগুলোর মধ্যে ভবিষ্যতে ঐক্যবদ্ধভাবে পথচলার বিষয়ে নীতিগত ঐকমত্য হয়েছে। এই প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত নতুন একটি রাজনৈতিক জোটে রূপ নিতে পারে।
নতুন এই উদ্যোগে নেতৃত্ব দিচ্ছেন হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির জামেয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় তার সভাপতিত্বে সাতটি ইসলামী দলের নেতাদের নিয়ে মতবিনিময় সভা হয়। সকাল ১০টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত চলা সভায় হেফাজতের অন্তত ২০ জন কেন্দ্রীয় নেতা এবং সাতটি দলের তিনজন করে প্রতিনিধি অংশ নেন।
সভায় জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সভা শেষে হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব আল্লামা সাজিদুর রহমান বলেন, সাতটি দল ঐক্যবদ্ধভাবে পথচলার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। অল্প সময়ের মধ্যেই ঐক্যের প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হবে।
সংশ্লিষ্ট নেতারা জানান, সাতটি দলই কওমি ধারার। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলগুলো জামায়াত, বিএনপি ও স্বতন্ত্র—এই তিন রাজনৈতিক ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। এতে কওমি অঙ্গনে দৃশ্যমান বিভাজন তৈরি হয়। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক বলয়ে থাকা নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রকাশ্য কাদা ছোড়াছুড়ির ঘটনাও ঘটে।
হেফাজত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো বিভিন্ন রাজনৈতিক বলয়ে থাকা কওমি ঘরানার দলগুলোকে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা। যারা এই ঐক্যে থাকতে চায়, তাদের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান পুনর্বিবেচনা করে নতুন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে মতামত দিতে হবে।
এ জন্য সাতটি দলকে আগামী ৩ আগস্টের মধ্যে লিখিত প্রস্তাব দিতে বলা হয়েছে। দলগুলো নিজ নিজ ফোরামে আলোচনা করে তাদের অবস্থান ও করণীয় জানাবে। এসব প্রস্তাব নিয়ে আগস্টের শুরুতে আবার বৈঠক হবে। ওই বৈঠকে সম্ভাব্য ঐক্যের রূপরেখা চূড়ান্ত করার চেষ্টা করা হবে।
হেফাজতের আমির চান, কওমি ধারার দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ হোক। দলগুলো নিজেদের মধ্যে একটি ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলুক। ভবিষ্যতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ অন্যান্য নির্বাচনে একক প্রার্থী দেওয়ার বিষয়েও সিদ্ধান্ত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট নেতারা জানিয়েছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে আসন সমঝোতা করে খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের সঙ্গে সমঝোতার আলোচনা হলেও দলটি শেষ পর্যন্ত আটটি আসনে এককভাবে নির্বাচন করে।
অন্যদিকে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ চারটি আসনে সমঝোতার মাধ্যমে বিএনপির নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক বলয়ে যায়। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আসন ভাগাভাগি নিয়ে মতবিরোধের কারণে জামায়াতের সঙ্গে থাকা সমীকরণ থেকে বেরিয়ে এককভাবে নির্বাচন করে। ইসলামী ঐক্যজোটও এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়।
আরও পড়ুন: জুলাই শহীদ পরিবারকে কোটি টাকা প্রদানসহ তিন দাবি এনসিপির
হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মীর ইদ্রিস বলেন, আগে হেফাজতের মধ্যে ঐক্য ছিল। কিন্তু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কিছু দল জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে এবং কিছু দল বিএনপির রাজনৈতিক বলয়ে চলে যাওয়ায় নিচের সারির নেতাকর্মীদের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, এ কারণেই হেফাজতের আমির সবাইকে নিয়ে বৈঠক করেছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক বলয়ে থাকা দলগুলোকে তাদের করণীয় বিষয়ে লিখিত মতামত দিতে বলা হয়েছে। আগামী ৩ আগস্টের মধ্যে মতামত জমা দিতে হবে। এরপর পরবর্তী বৈঠকে এসব মতামতের ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক জোট গঠন ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ করা হবে।
বৈঠক শেষে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী বলেন, আপাতত সাতটি দল ঐক্যবদ্ধ থাকার বিষয়ে একমত হয়েছে। কী প্রক্রিয়ায় একসঙ্গে পথচলা যায়, সে বিষয়ে প্রতিটি দলের কাছে প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে। হেফাজতে ইসলামের আমির চান, এই দলগুলো অন্য কোনো দলের সঙ্গে না গিয়ে নিজেদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ থাকুক।
নির্বাচনের পর জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতায় যাওয়া কয়েকটি দলের সঙ্গে হেফাজতের শীর্ষ আলেমদের একাংশের দূরত্ব তৈরি হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। একপর্যায়ে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ১১-দলীয় ঐক্য থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। এ ছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক চট্টগ্রামে গিয়ে হেফাজতের আমিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জানান, জামায়াতের সঙ্গে তাদের ঐক্য আদর্শিক নয়, রাজনৈতিক ছিল।