১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪২

তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী ইলা মিত্রের ২৪তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

ইলা মিত্র  © টিডিসি সম্পাদিত

বাংলার কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে স্মরণীয় এক নাম ইলা মিত্র। আজ ১৩ অক্টোবর তার ২৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০০২ সালের এই দিনে ভারতের কলকাতায় মারা যান উপমহাদেশের এই রাজনীতিক ও কৃষকনেত্রী। কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে জমিদারি শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি।

কৃষক ও সাঁওতাল জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করে হয়ে উঠেছিলেন তাদের রাণীমা। আন্দোলনের কারণে গ্রেপ্তার, কারাবাস ও ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হলেও আদর্শ থেকে সরে যাননি। 

ইলা মিত্রের জন্ম ১৯২৫ সালের ১৮ অক্টোবর কলকাতায়। তার আদি নিবাস ছিল বর্তমান বাংলাদেশের ঝিনাইদহের বাগুটিয়া গ্রামে। বাবা নগেন্দ্রনাথ সেন ছিলেন অবিভক্ত বাংলার ডেপুটি অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল এবং মা মনোরমা সেন। পরিবারের বড় সন্তান ইলা ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনা ও খেলাধুলায় আগ্রহী ছিলেন। 

১৯৪০ সালে কলকাতার বেথুন স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। পরে বেথুন কলেজে পড়াশোনা করেন এবং বাংলা সাহিত্যে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৫৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন।

ছাত্রজীবনেই রাজনীতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন ইলা মিত্র। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে অংশ নেন। ১৯৪৫ সালে কমিউনিস্ট নেতা রমেন্দ্রনাথ মিত্রকে বিয়ে করার পর চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষ্ণগোবিন্দপুরে স্বামীর পরিবারের এলাকায় চলে আসেন। সেখানে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি স্থানীয় কৃষক ও আদিবাসীদের জীবনসংগ্রামের সঙ্গে পরিচিত হন। ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়েন কৃষক আন্দোলনে।

তেভাগা আন্দোলনে কৃষকের পাশে
১৯৪৬-৪৭ সালে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ভাগচাষিদের ন্যায্য হিস্যা আদায়ের দাবিতে তেভাগা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। প্রচলিত ভাগচাষ ব্যবস্থায় কৃষকেরা উৎপাদিত ফসলের অর্ধেক জমির মালিককে দিতে বাধ্য হতেন। আন্দোলনের দাবি ছিল, উৎপাদিত ফসলের দুই-তৃতীয়াংশ পাবেন চাষিরা, আর জমির মালিক পাবেন এক-তৃতীয়াংশ।

রাজশাহীর নাচোল অঞ্চলে কৃষকদের সংগঠিত করার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ইলা মিত্র। সাঁওতাল ও অন্যান্য আদিবাসী কৃষকের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা, আন্দোলনে সংগঠিত করা এবং নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে তিনি কাজ করেন। কৃষকেরা তাকে ভালোবেসে রাণীমা বলে ডাকতেন।

তেভাগা আন্দোলন ছিল শুধু ফসলের ভাগ নিয়ে বিরোধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল কৃষকের অধিকার, মর্যাদা ও শোষণ থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। নাচোল এলাকায় আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠলে কৃষক ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে। ১৯৫০ সালের জানুয়ারিতে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে কয়েকজন পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার পর সেখানে ব্যাপক ধরপাকড় ও দমন-পীড়ন শুরু হয়। আন্দোলন দমনে অভিযান চালানো হলে ইলা মিত্র গ্রেপ্তার হন।

গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড
গ্রেপ্তারের পর ইলা মিত্রকে পুলিশি হেফাজতে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হতে হয়। পরে তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা হয়। বিচারে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কারাবন্দি অবস্থায় তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। তার ওপর নির্যাতনের খবর ছড়িয়ে পড়লে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে প্রতিবাদ ওঠে এবং মুক্তির দাবিও জোরালো হয়।

আরও দেখুন: ৬৫ জনবল নিয়োগ দেবে ঢাকার কর অঞ্চল-২১, আবেদন অনলাইনে

১৯৫৪ সালে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার পর চিকিৎসার জন্য প্যারোলে মুক্তি পেয়ে কলকাতায় যান তিনি। এরপর আর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে আসেননি। শারীরিক বিপর্যয় ও দীর্ঘ কারাবাসের অভিজ্ঞতা নিয়েও তিনি থেমে থাকেননি। ভারতে ফিরে পড়াশোনা শেষ করেন এবং কলকাতা সিটি কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন।

রাজনীতি ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা
কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করার পরও ইলা মিত্র রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখেন। তিনি কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় মানিকতলা আসন থেকে একাধিকবার নির্বাচিত হন। ১৯৬২ থেকে ১৯৭৭ সালের মধ্যে চারবার বিধানসভার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিধানসভায় কমিউনিস্ট পার্টির উপনেতার দায়িত্বও পালন করেছেন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠন ও সমর্থন সংগঠিত করতে ভূমিকা রাখেন তিনি। বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির সংগ্রামের প্রতি তার সমর্থন ছিল রাজনৈতিক ও মানবিক দায়বদ্ধতার অংশ। কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ ও নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সাহিত্যচর্চা ও অনুবাদেও যুক্ত ছিলেন ইলা মিত্র। জাপানের হিরোশিমায় পারমাণবিক বোমা হামলার প্রেক্ষাপটে লেখা হিরোশিমার মেয়ে গ্রন্থটি বাংলায় অনুবাদ করে তিনি সোভিয়েত ল্যান্ড নেহরু পুরস্কার লাভ করেন। ভারত সরকার তাকে স্বাধীনতাসংগ্রামী হিসেবেও সম্মাননা দেয়।

২০০২ সালের ১৩ অক্টোবর কলকাতায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন ইলা মিত্র। তার জন্মের শিকড় বাংলাদেশের ঝিনাইদহে, আর সংগ্রামের বড় অধ্যায় জুড়ে রয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল। দুই বাংলার ইতিহাসে তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করা এবং নির্যাতনের মধ্যেও রাজনৈতিক বিশ্বাসে অবিচল থাকার জন্য। তার জীবন আজও কৃষক আন্দোলন ও নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।