প্রধানমন্ত্রীর পছন্দের তালিকায় এক টাকার মাস্টার-খেলায় উৎসাহ দেওয়া শিক্ষিকা, তালিকায় আরও ৫ জন
বিশ্ব শিক্ষক দিবস-২০২৬ উপলক্ষে শিক্ষকদের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন পর্যায়ের ১০২ জন গুণী শিক্ষককে সম্মাননা দিয়েছে সরকার। আজ সোমবার (৫ অক্টোবর) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে শিক্ষা মন্ত্রণালয় আয়োজিত বিশ্ব শিক্ষক দিবসের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এর আগে সম্মাননা দেওয়া হতো ১২ জনকে। এবার সেই সংখ্যা বাড়ল কয়েকগুণ। সম্মাননাপ্রাপ্ত শিক্ষকদের ২ লাখ করে টাকা দেওয়ার পাশাপাশি ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র দেওয়া হয়েছে।
১০২ জন গুণী শিক্ষকের মধ্যে ৯৫ জন দেশের বিভিন্ন স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-কারিগরি-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। বাকি সাতজন প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বাছাই করা হয়েছে। এ তালিকায় গত ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে এক টাকায় শিক্ষা বিলানো গাইবান্ধার শিক্ষক মো: লুৎফর রহমান।
জানা গেছে, গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার গিদারী ইউনিয়নের বাগুড়িয়া গ্রামের মো. লুৎফর রহমান (৮০)। স্থানীয়দের কাছে তিনি পরিচিত ‘এক টাকার মাস্টার’ নামে। কারণ অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে মাত্র এক টাকার বিনিময়ে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন এই প্রবীণ শিক্ষক।
আরও পড়ুন: সেই শিক্ষিকাকে মহিলা ক্রীড়া সংস্থায় যুক্ত করছে মন্ত্রণালয়
তালিকায় রয়েছেন বরিশাল জেলার আগৈলঝাড়া উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামের শিশুদের মাঝে বিনামূল্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে আসা শিক্ষক সত্তরোর্ধ রমণী কান্ত বেপারী। গত ৫৫ বছর ধরে বিনা পয়সায় শিক্ষাদান করে আসছেন। মহৎ এই মানুষটি জীবনের দীর্ঘ সময় উৎসর্গ করেছেন গ্রামের দরিদ্র ও অসহায় পরিবারের শিশুদের লেখাপড়া শেখাতে।
বান্দরবানের অতি দুর্গম পাহাড়ঘেরা থানচির তিন্দু এলাকার তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেনও রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী পছন্দের এই তালিকায়। সম্প্রতি বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেনের ব্যতিক্রমী সংগ্রামের গল্প দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ৫৬ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। তবে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর পরিবার দরিদ্র হওয়ায় নিয়মিত বেতন পরিশোধ করতে পারে না। এতে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন দেওয়া নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে সংকট চলছে।
এই সংকট মোকাবিলায় ছুটির দিনগুলোতে থানচি–তিন্দু–রেমাক্রী নৌপথে ইঞ্জিনচালিত নৌকা চালিয়ে পর্যটক ও যাত্রী পরিবহন করেন প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন। নৌকা চালিয়ে যে আয় হয়, তার বড় অংশই তিনি বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধে ব্যয় করেন। শুধু চলতি বছরের মার্চ ও এপ্রিল মাসে নৌকা চালিয়ে তিনি প্রায় ৪০ হাজার টাকা আয় করেন। এর মধ্যে ৩০ হাজার টাকা সহকর্মীদের বেতন হিসেবে দিয়েছেন।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে প্রধান শিক্ষকের এই উদ্যোগ দেশজুড়ে প্রশংসিত হয়। পরে স্থানীয় প্রশাসন বিদ্যালয়ের জন্য একটি বোটের ব্যবস্থা, নতুন ভবন নির্মাণ এবং ছাত্রাবাস সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। এরপর বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে এলে গত জুলাই মাসে তিনি বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের উদ্যোগ নিতে শিক্ষামন্ত্রীকে নির্দেশ দেন।
ঢাকার ডেমরায় অবস্থিত মারকাযুল মাদীনা শিক্ষা পরিবার-এর অধ্যক্ষ (প্রিন্সিপাল) মুহা. মুঈনুদ্দীন মজুমদার, ফেনীর কাজিরবাগ ইউনিয়নের গিল্লা বাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আলোচিত সহকারী শিক্ষিকা সৈয়দা খালেদা আক্তার পলি, চাঁদপুর সদরের বাগাদীর বাঘড়া বাজারস্থ ৬৯নং বাগাদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হাফছা আক্তার এবং ঢাকা সেনানিবাসের প্রয়াস ইনস্টিটিউট অব স্পেশাল এডুকেশনের সহকারী শিক্ষক মো: মোজাম্মেল হোসেন খানও প্রধানমন্ত্রীর পছন্দের এই তালিকায় রয়েছেন।
গত ২৯ এপ্রিল ফেনী পিটিআই মাঠে প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের একটি ম্যাচ চলাকালে সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে নিজের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিতে দেখা যায় ফেনীর কাজিরবাগ ইউনিয়নের গিল্লা বাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা সৈয়দা খালেদা আক্তার পলিকে। বৃষ্টির মধ্যেও শিশুদের খেলার প্রতি তার আবেগ ও আন্তরিকতার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা ব্যাপক সাড়া ফেলে।
রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে প্রধানমন্ত্রীর পছন্দের এই তালিকাটি ঘোষণা করা হলে সেখানে উপস্থিত সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে করতালির মাধ্যমে অভিনন্দন জানান।