৫ বছরের ঈদযাত্রায় তুলনামূলক মৃত্যু কম এবার, দুর্ঘটনায় এগিয়ে ছিল ২০২৪
ঈদ মানে ঘরে ফেরা, ঈদ মানে প্রিয়জনের সঙ্গে মিলন। কিন্তু চলতি ঈদযাত্রায় দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া কয়েকটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আনন্দের এই সময়কে শোকের গভীর ছায়ায় ঢেকে দিয়েছে। নদী, রেললাইন আর নদীপথ তিন জায়গাতেই প্রাণহানির ঘটনা দেশজুড়ে নাড়া দিয়েছে মানুষকে। তবে এটি নতুন নয়, প্রতি বছরই ঈদের ছুটি এলেই সড়কে, নৌ ও রেলপথে বিপুল মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নানা উদ্যোগও মৃত্যুর মিছিল থামাতে পারছে। ফলে এসব উদ্যোগ কাজে আসছে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশ রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের ঈদকালীন এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগে ও পরে গত ১০ দিনে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭৪ জন নিহত হয়েছেন। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ১৭ মার্চ থেকে ২৬ মার্চ ভোর পর্যন্ত দেশে ৩৪২টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবে ২০২৪ সালে এবারের তুলনায় মৃত্যু ছিল বেশি। দুর্ঘটনাও বেশি ঘটেছে। তবে সেবার ছুটি বেশি থাকায় মৃত্যুও বেশি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ২০২৫ সালের ঈদুল ফিতরের ছুটির সময় ১১ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন ২৪৯ জন। সে হিসাবে গতবারের তুলনায় এবার সড়কে মৃত্যু বেশি।
যদিও সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের তথ্য প্রকাশ করে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষও (বিআরটিএ)। তাদের হিসাবে, ১৭ মার্চ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত সাত দিনে ৯২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসময় ২১৭ জন আহত হয়েছেন।
সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না থাকার কারণেই এবার সড়ক দুর্ঘটনার মাত্রা অত্যন্ত বেশি ছিল। এছাড়া জবাবদিহিতা ও সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা না থাকলে এই জনদুর্ভোগ বন্ধ করা সম্ভব হবে না। দুর্ভাগ্যবশত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদারকিও এবার আশানুরূপ বা ভালো ছিল না।—সাইদুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক, রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।
এ বছর ঈদুল ফিতরে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছে রাজধানীর সদরঘাটে। ঈদের আগে বুধবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে সদরঘাটের ১৪ নম্বর পন্টুনের কাছে ঢাকা–ইলিশা (ভোলা) রুটের ‘আসা যাওয়া-৫’ নামে একটি লঞ্চ যাত্রী তুলছিল। এ সময় ঢাকা-দেউলা-ঘোষেরহাট রুটের ‘এমভি জাকির সম্রাট-৩’ নামের একটি লঞ্চ সেটিকে ধাক্কা দেয়। দুটি লঞ্চের সংঘর্ষের ঘটনায় মো. সোহেল (২২) নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। তার বাড়ি বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে।
এ ঘটনার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এমভি জাকির সম্রাট–৩ লঞ্চের পেছনের কোণের আঘাতে ‘আসা যাওয়া–৫’ লঞ্চের দুজন যাত্রী পিষ্ট হন। একজনকে পানিতে পড়ে যেতে দেখা যায় এবং অন্যজন লঞ্চের বাইরের অংশে পড়ে থাকেন। পুলিশের কোতোয়ালি অঞ্চলের সহকারী কমিশনার ফজলুল হক জানান, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে সোহেলের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় তার শ্বশুর মিরাজ ফকির এখনও নিখোঁজ রয়েছেন এবং শাশুড়ি রুবা ফকির আহত হয়েছেন।
ঈদযাত্রার আরেকটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকায়। শনিবার ঈদের রাত তিনটার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের লেভেলক্রসিংয়ে ‘মামুন স্পেশাল’ নামের যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে একটি ট্রেনের সংঘর্ষে নারী-পুরুষ-শিশুসহ ১২ জন নিহত হন এবং আহত হন আরও ২০ জন। বাসটি প্রায় এক কিলোমিটার দূর পর্যন্ত ঠেলে নিয়ে যায় ট্রেনটি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঈদের নামাজ শেষে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর এলাকায় স্বজনদের বাড়ির উদ্দেশে রওয়ানা হয়েছিলেন একদল মানুষ। রাত তিনটার দিকে পদুয়ার বাজার লেভেলক্রসিং উন্মুক্ত দেখে বাসটি রেললাইনের ওপর উঠে পড়ে। এ সময় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী একটি মেইল ট্রেনের সঙ্গে বাসটির সংঘর্ষ হয়। বাসের অধিকাংশ যাত্রী সে সময় ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন। তাদের চিৎকার ও আর্তনাদ শুনে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে উদ্ধার কাজ শুরু করে। ঘটনাস্থলেই ১২ জন নিহত হন।
চালকদের দক্ষতা ও কল্যাণের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। চালকদের জন্য নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করে দিতে হবে যাতে ক্লান্তি নিয়ে তারা গাড়ি না চালায়। মানসম্মত চালক তৈরির জন্য সরকারি উদ্যোগে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন এবং নিয়মিত কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। সরকারের সঠিক পরিকল্পনা ও কঠোর নজরদারি ছাড়া এই জনদুর্ভোগ ও মৃত্যু থামানো সম্ভব হবে না।—কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ, যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক, অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়।
এই দুর্ঘটনায় সবচেয়ে হৃদয়বিদারক গল্পটি ঝিনাইদহের মহেশপুরের পিন্টু হোসেনের। ঈদের দিন স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার জন্য বের হন তিনি। পরে ব্যক্তিগত কারণে ঢাকায় নেমে গেলেও স্ত্রী লাইজু আক্তার দুই সন্তানকে নিয়ে একই বাসে থেকে যান। সেই বাসই কুমিল্লায় ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষে দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান লাইজু ও তার দুই কন্যা সন্তান। জীবনের শুরুতেই মা হারানো পিন্টু এবার হারালেন স্ত্রী ও দুই সন্তানকেও। পরিবহণে কাজ করা এই মানুষটি এখন বেঁচে আছেন শুধু স্মৃতি নিয়ে।
ঈদযাত্রার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিটি ঘটে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাট এলাকায়। বুধবার বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা ‘সৌহার্দ্য পরিবহন’-এর একটি যাত্রীবাহী বাস দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ঘাটের পন্টুন থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। বাসটিতে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ জন যাত্রী ছিলেন, যাদের মধ্যে মাত্র সাতজন সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হন।
উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’র সাহায্যে রাতে বাসটি টেনে তোলার কাজ শুরু হয়। বাসের দরজাগুলো ভাঙা অবস্থায় দেখা গেছে এবং ভেতর থেকে স্কুলব্যাগ, জুতা, ভ্যানিটি ব্যাগসহ যাত্রীদের ব্যক্তিগত সামগ্রী ভেসে উঠতে থাকে। রাজবাড়ীর সিভিল সার্জন ডা. এস এম মাসুদ জানান, এখন পর্যন্ত দুই নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পরে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২৫ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে, যাদের মধ্যে ১১ জন নারী, ৮ জন শিশু ও ৬ জন পুরুষ রয়েছে।
প্রতি বছর ঈদকে ঘিরে সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা—দুই ঈদেই শত শত সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন বহু মানুষ, আর এসব দুর্ঘটনার বড় অংশই ঘটেছে মোটরসাইকেলকে ঘিরে।
২০২২ সালে ঈদুল ফিতরের সময় দেশের সড়ক-মহাসড়কে ৩৭২টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হন ৪৪৩ জন এবং আহত হন ৮৬৮ জন। একই সময়ে ১৬৪টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা যান ১৪৫ জন, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৪৪ দশমিক ০৮ শতাংশ।
একই বছর ঈদুল আজহাতেও পরিস্থিতি ছিল প্রায় একই রকম। ওই ঈদে ৩৫৪টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ৪৪০ জন এবং আহত হন ৭৯১ জন। ১১৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা যান ১৩১ জন, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত মানুষের ৩৫ দশমিক ৪২ শতাংশ।
পরের বছর ২০২৩ সালে ঈদুল ফিতরে ৩০৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩২৮ জন নিহত ও ৫৬৫ জন আহত হন। এই সময় ১৬৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হন ১৬৭ জন, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৫৪ দশমিক ৩ শতাংশ। একই বছর ঈদুল আজহায় ৩১২টি দুর্ঘটনায় ৩৪০ জন নিহত এবং ৫৬৯ জন আহত হন। ৯১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা যান ৯৪ জন, যা মোট দুর্ঘটনার ৩২ দশমিক ৮৫ শতাংশ।
২০২৪ সালে ঈদুল ফিতরে দুর্ঘটনার সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। ওই সময় ৪১৯টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ৪৩৮ জন এবং আহত হন ১ হাজার ৪২৪ জন। সে বছরও দুর্ঘটনার শীর্ষে ছিল মোটরসাইকেল, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৪৯ দশমিক ৬২ শতাংশ। একই বছরের ঈদুল আজহায় ৩০৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৩৬ জন নিহত ও ৭৬২ জন আহত হন।
২০২৫ সালেও ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা কমেনি। ওই বছরের ঈদুল ফিতরের ১৫ দিনে ৩৪০টি দুর্ঘটনায় ৩৫২ জন নিহত হন এবং আহত হন ৮৩৫ জন। সড়ক দুর্ঘটনার সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটে মোটরসাইকেল ঘিরে। ঈদযাত্রায় সড়ক-মহাসড়কে ১৩৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৫১ জন নিহত হন, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৪২ শতাংশ।
একই বছর ঈদুল আজহায় সারা দেশে ৩৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৩৯০ জন এবং আহত হন ১ হাজার ১৮২ জন। ১৩৪টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হন ১৪৭ জন, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৫ দশমিক ৩৫ শতাংশ।
দেশে চলমান সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান। তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘এবার সড়কে কার্যকর কোনো ব্যবস্থাপনা ছিল না। সড়ক দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর সংখ্যাই বলে দিচ্ছে এবারের ব্যবস্থাপনা কেমন ছিল। প্রকৃত অর্থে যেটুকু ব্যবস্থাপনা ছিল, সেটিও এখন ভেঙে পড়ছে।’
তিনি বলেন, ‘সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না থাকার কারণেই এবার সড়ক দুর্ঘটনার মাত্রা অত্যন্ত বেশি ছিল। এছাড়া জবাবদিহিতা ও সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা না থাকলে এই জনদুর্ভোগ বন্ধ করা সম্ভব হবে না। দুর্ভাগ্যবশত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদারকিও এবার আশানুরূপ বা ভালো ছিল না।’
এছাড়াও সড়কের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থার হিসাব অনুসারে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ মারা যান। দুর্ঘটনায় আহত হন প্রায় ১০ হাজার মানুষ। শুধু গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে এই হিসাব করে দেশীয় সংস্থাগুলো। হাসপাতালে কিংবা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু এই হিসাবে আসে না।
আরও পড়ুন: অবশেষে ক্ষমা চাইলেন হাতিরঝিল থানার ওসি
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ শামসুল হক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘সড়কে দুর্ঘটনার একটি অন্যতম কারণ হলো- যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত গতি। সড়ক ও পরিবহনের ধরন অনুযায়ী গতি নির্ধারণ ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত গাইডলাইন প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করতে হবে। মোটরসাইকেলচালক ও আরোহী উভয়েরই মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার নিশ্চিত করতে এ সংক্রান্ত এনফোর্সমেন্ট গাইডলাইন প্রণয়ন করতে হবে।’
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ঈদুল ফিতরে সড়ক দুর্ঘটনার বর্তমান ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য আমাদের বিদ্যমান পরিবহন ব্যবস্থা এবং শৃঙ্খলার অভাবকে প্রধানত দায়ী করা যায়। এই সংকট উত্তরণে কয়েকটি মৌলিক পরিবর্তনের কোনো বিকল্প নেই।
প্রথমত, আমাদের বর্তমান পরিবহন ব্যবস্থায় অসংখ্য মালিক এবং হাজার হাজার বাসের বিশৃঙ্খল উপস্থিতি রয়েছে। এই ‘মালিকানা ভিত্তিক’ বিচ্ছিন্ন সিস্টেমটি ভেঙে ফেলা জরুরি। কারণ যত বেশি মালিক ও বাস থাকবে, সড়কে পাল্লাপাল্লি ও প্রতিযোগিতা তত বেশি হবে। একটি সুশৃঙ্খল ফ্র্যাঞ্চাইজি বা সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় না আনলে এই প্রাণঘাতী প্রতিযোগিতা বন্ধ করা সম্ভব নয়।
দ্বিতীয়ত, আমাদের সড়কে গতি নিয়ন্ত্রণের কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই। যেকোনো উপায়েই হোক, প্রযুক্তির মাধ্যমে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি আমাদের টোল কালেকশন সিস্টেম এখনো মান্ধাতা আমলের রয়ে গেছে, যেখানে মানুষ সরাসরি টাকা সংগ্রহ করে। এটিকে দ্রুত শতভাগ ইলেকট্রনিক বা অটোমেটেড করতে হবে যাতে যানজট ও বিশৃঙ্খলা কমে।
তৃতীয়ত, বিভিন্ন বাস টার্মিনালগুলোর ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত দুর্বল। সেখানে যাত্রী ও যানবাহনের ধারণক্ষমতার চেয়ে চাপ অনেক বেশি থাকে। পর্যাপ্ত জায়গার অভাব এবং বিশৃঙ্খলভাবে যাত্রী উঠা-নামার কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। এই টার্মিনালগুলোর আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
সর্বোপরি, চালকদের দক্ষতা ও কল্যাণের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। চালকদের জন্য নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করে দিতে হবে যাতে ক্লান্তি নিয়ে তারা গাড়ি না চালায়। মানসম্মত চালক তৈরির জন্য সরকারি উদ্যোগে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন এবং নিয়মিত কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। সরকারের সঠিক পরিকল্পনা ও কঠোর নজরদারি ছাড়া এই জনদুর্ভোগ ও মৃত্যু থামানো সম্ভব হবে না।