শিক্ষকদের পেশাগত সুরক্ষা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হোক
প্রতিবছর ৫ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব শিক্ষক দিবস। ১৯৬৬ সালের এই দিনে ইউনেস্কো ও আইএলও-র উদ্যোগে শিক্ষকদের মর্যাদা বিষয়ক সুপারিশমালা গৃহীত হয়েছিল। সেখানে শিক্ষকতাকে একটি জনসেবামূলক পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে শিক্ষকের অধিকার, দায়িত্ব, চাকরির নিরাপত্তা ও শিক্ষার স্বাধীনতার কথা বলা হয়।
সে সুপারিশের স্মরণে ১৯৯৪ সাল থেকে দিনটি উদ্যাপিত হচ্ছে। কিন্তু প্রতিবছর ফুল, শুভেচ্ছা আর আলোচনা সভার ভিড়ে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়: যে মানুষটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়েন, তাঁর নিজের সম্মান ও নিরাপত্তা আমরা কতটা নিশ্চিত করতে পেরেছি?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আগে বুঝতে হবে শিক্ষা ও শিক্ষকের সম্পর্কটি কেমন। শিক্ষা কেবল তথ্য সঞ্চয়ের নাম নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বারবার বলেছেন, শিক্ষার কাজ শুধু জানানো নয়। জীবনের সঙ্গে মানুষের সুর মেলানো। এই সুর মেলানোর কাজটি পাঠ্যবই একা করতে পারে না। এজন্য দরকার একজন জীবন্ত মানুষ। যিনি শিক্ষার্থীর কৌতূহলকে চিনবেন, সংশয়কে সম্মান করবেন, দুর্বলতাকে ধৈর্য দিয়ে আর সম্ভাবনাকে বিশ্বাস দিয়ে লালন করবেন। প্রযুক্তি আজ তথ্যের সীমাহীন ভাণ্ডার আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে, কিন্তু তথ্য আর শিক্ষা এক জিনিস নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, কিন্তু একটি শিশুর চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝে নিতে পারে না সে আজ কেন মনমরা। আদর্শ, নৈতিকতা, সততা ও সহমর্মিতার পাঠ শিক্ষার্থী শেখে শিক্ষকের আচরণ দেখে, তার কথায় নয়, তার জীবনযাপনে। প্লুটার্কের নামে প্রচলিত একটি উক্তিতে বলা হয়েছে, শিক্ষা পাত্র পূর্ণ করা নয়, আগুন জ্বালানো। সেই আগুন জ্বালানোর মানুষটি শিক্ষক। প্রদীপ থেকে প্রদীপ জ্বালানোর এই ধারাবাহিকতাই সভ্যতার ইতিহাস। যে সমাজ প্রদীপটিকেই অবহেলা করে, সে নিজের আলোর উৎসকেই অন্ধকারে ঠেলে দেয়।
শিক্ষকের অবদান তাই কোনো একক পেশার গণ্ডিতে আটকে নেই। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিচারক, প্রশাসক, কবি, বিজ্ঞানী, কৃষি-উদ্ভাবক, সবার জীবনের প্রথম সিঁড়িটি কোনো না কোনো শিক্ষকের হাতে গড়া। রাষ্ট্রের প্রতিটি সাফল্যের ভেতরে শিক্ষকের নীরব শ্রম মিশে আছে, অথচ সেই শ্রমের কৃতিত্ব তিনি কদাচিৎ দাবি করেন। তিনি শুধু পাঠদান করেন না, নাগরিক তৈরি করেন। গণতান্ত্রিক চেতনা, বিজ্ঞানমনস্কতা, সহনশীলতা, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা আর মানবিকতার বীজ তিনিই বোনেন। একটি জাতির সংকটকালে, মুক্তির আন্দোলনে, ভাষার লড়াইয়ে কিংবা গণজাগরণের মুহূর্তে শিক্ষকেরা প্রায়ই সামনের সারিতে ছিলেন, এ ইতিহাস আমাদের অজানা নয়।
এই স্বীকৃতি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেও বহু পুরোনো। প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্যে গুরুকে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। ইসলামি ঐতিহ্যে মহানবী (সা.) এর বাণী, তিনি শিক্ষকরূপেই প্রেরিত হয়েছেন (ইবনে মাজাহ), শিক্ষকতাকে দিয়েছে এক পবিত্র মর্যাদা। আরবি কবি আহমদ শাওকি শিক্ষকের সম্মানে উঠে দাঁড়াতে বলেছিলেন, কারণ শিক্ষক মহান কাজ করেন। গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল মনে করতেন, যারা শিশুদের সুশিক্ষিত করেন, তাঁরা জন্মদাতাদের চেয়েও বেশি সম্মানের যোগ্য। কারণ পিতামাতা দেন জীবন, আর শিক্ষক দেন জীবনকে অর্থপূর্ণ করার সামর্থ্য। পূর্ব-পশ্চিম, ধর্ম-দর্শন নির্বিশেষে মানবসভ্যতার প্রায় সব ধারাই শিক্ষককে আসন দিয়েছে সমাজের সর্বোচ্চ শ্রদ্ধার স্থানে।
আরও দেখুন: বিপিসির অঙ্গ প্রতিষ্ঠানে ৬ পদে চাকরি, আবেদন ৭ অক্টোবর থেকে
শিক্ষাদর্শনের ইতিহাসেও শিক্ষকের ভূমিকা নিয়ে বিচিত্র ভাবনা আছে, আর সব ভাবনার কেন্দ্রেই রয়েছে শিক্ষকের মর্যাদা। সক্রেটিস শিক্ষকের কাজ দেখেছিলেন প্রশ্নের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীর ভেতরের জ্ঞানকে জাগিয়ে তোলা হিসেবে। সেখানে শিক্ষক উপদেশদাতা নন, সত্যসন্ধানের সহযাত্রী। জন ডিউই শিক্ষাকে জীবনের প্রস্তুতি নয়, জীবনযাপনেরই অংশ মনে করতেন। তার কাছে শিক্ষক অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখনের পথপ্রদর্শক। ব্রাজিলীয় শিক্ষাবিদ পাওলো ফ্রেইরি যান্ত্রিক মুখস্থবিদ্যাকে ব্যাংকিং শিক্ষা বলে সমালোচনা করে এমন এক শিক্ষার কথা বলেছেন, যেখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী পরস্পরের কাছ থেকে শেখে। এই সংলাপমুখর শ্রেণিকক্ষ তৈরি করতে পারেন কেবল সে শিক্ষক, যিনি নিজে চিন্তায় স্বাধীন ও আত্মবিশ্বাসী।
রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে প্রকৃতির কোলে মুক্ত শিক্ষার যে পরীক্ষা করেছিলেন, তার মূলেও ছিল শিক্ষকের সৃজনশীলতা আর শিক্ষার্থীর স্বাধীন বিকাশের প্রতি আস্থা। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও বেগম রোকেয়া আমাদের দেখিয়েছেন, শিক্ষক একই সঙ্গে সমাজসংস্কারকও। চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা নারীশিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষার দরজা খুলে দিয়েছিলেন। এই সব দর্শনের মধ্যে একটি অভিন্ন অন্তর্নিহিত শর্ত আছে: শিক্ষককে হতে হবে নিরাপদ, মর্যাদাবান ও স্বাধীন। ভীত, অবহেলিত কিংবা অর্থকষ্টে জর্জরিত শিক্ষকের পক্ষে মুক্তচিন্তার শিক্ষা দেওয়া প্রায় অসম্ভব।
এবার আমাদের বাস্তবতায় ফিরি। বাংলাদেশে শিক্ষকের প্রতি সামাজিক শ্রদ্ধার ঐতিহ্য এখনো বেঁচে আছে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই সেই শ্রদ্ধার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের বহু শিক্ষক জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় অপর্যাপ্ত বেতনে কাজ করেন। বেতন কাঠামো ও গ্রেড নিয়ে প্রাথমিক শিক্ষকদের বারবার আন্দোলনে নামতে হওয়া এই বাস্তবতারই প্রতিফলন। বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার অনেক শিক্ষক এখনো এমপিওভুক্তি, বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতার মতো মৌলিক বিষয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। নন-এমপিও শিক্ষকদের দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর রাজপথের আন্দোলন আমাদের সবার চোখের সামনেই ঘটেছে। যে মানুষ শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীকে আত্মমর্যাদার পাঠ দেন, তাঁকেই যখন ন্যায্য প্রাপ্যের জন্য অবস্থান কর্মসূচিতে বসতে হয়, তখন সমাজের সামগ্রিক অগ্রাধিকারের দিকেই প্রশ্ন ওঠে।
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চাকরির নিরাপত্তাহীনতা। ব্যবস্থাপনা কমিটির রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যক্তিগত আক্রোশ কিংবা অন্যায় চাপে শিক্ষকের চাকরি হারানো বা হয়রানির শিকার হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে শিক্ষকদের অপমান করে পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগও গণমাধ্যমে এসেছে। শিক্ষকের শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তার প্রশ্নটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। শ্রেণিকক্ষে, ক্যাম্পাসে কিংবা তার বাইরে শিক্ষকের লাঞ্ছনার খবর সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের লক্ষণ। শিক্ষক ভুল করলে তার বিচার হওয়া উচিত আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক পথে, গণপিটুনি বা প্রকাশ্য অপমানের পথে নয়। আবার একই সঙ্গে স্বীকার করতে হবে, শিক্ষার্থীর প্রতি শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। মর্যাদা ও দায়িত্ব একে অপরের পরিপূরক।
অপর্যাপ্ত আয়ের আরেকটি করুণ পরিণতি কোচিং ও প্রাইভেট পড়ানোর ওপর নির্ভরতা। এতে শিক্ষকের পেশাগত ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়, অভিভাবকের ওপর আর্থিক বোঝা বাড়ে, আর শ্রেণিকক্ষের পাঠদান দুর্বল হয়ে পড়ে। কোচিং-বাণিজ্যের জন্য কেবল শিক্ষককে দায়ী করলে সমস্যার গোড়ায় পৌঁছানো যায় না। সম্মানজনক বেতন ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত না করে এই ব্যাধির টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। পাশাপাশি পাঠদানের বাইরে নানা প্রশাসনিক কাজ, তথ্য সংগ্রহ, জরিপ ও অনুষ্ঠান আয়োজনের দায়িত্ব অনেক শিক্ষকের সময় ও মনোযোগ কেড়ে নেয়, ফলে তার মূল কাজটিই ব্যাহত হয়। মানসম্মত প্রশিক্ষণ, ক্যারিয়ার-অগ্রগতির স্পষ্ট পথ, গবেষণার সুযোগ ও মেধাভিত্তিক পদোন্নতির অভাবও শিক্ষকের পেশাগত আত্মবিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বাধীন গবেষণা ও মুক্তচিন্তার পরিবেশ আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন, কারণ জ্ঞান উৎপাদনের স্বাধীনতা ছাড়া জ্ঞান বিতরণের মান উঁচু থাকে না।
তাহলে করণীয় কী?
প্রথমত, সব স্তরের শিক্ষকের জন্য ন্যায্য ও যুগোপযোগী বেতন কাঠামো, ভাতা এবং অবসর-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে, যেন শিক্ষকতা মেধাবীদের কাছে আকর্ষণীয় পেশা হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয়ত, নিয়োগ, বদলি, শাস্তি ও অপসারণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও ন্যায্য বিধিমালা থাকা চাই, আর প্রতিষ্ঠান পরিচালনা হতে হবে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রভাব থেকে মুক্ত। তৃতীয়ত, শিক্ষকের প্রতি সহিংসতা ও অপমানের দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচারের ব্যবস্থা দরকার, একই সঙ্গে শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য ন্যায়সংগত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোও জরুরি, যাতে কোনো পক্ষই অবিচারের শিকার না হয়। চতুর্থত, পাঠদান, গবেষণা ও মতপ্রকাশে শিক্ষকের একাডেমিক স্বাধীনতা সংরক্ষণ করতে হবে। পঞ্চমত, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, উচ্চশিক্ষার সুযোগ ও গবেষণা-অনুদানের মাধ্যমে পেশাগত উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করতে হবে। ষষ্ঠত, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা যুক্তিসংগত রাখা, অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক বোঝা কমানো এবং শিক্ষকের মানসিক সুস্থতার প্রতি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। সবশেষে, শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও পরিমার্জনে সরাসরি শ্রেণিকক্ষে কাজ করা শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা ও মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে, কারণ যারা বাস্তবতা জানেন না, তাঁদের তৈরি নীতি কাগজে সুন্দর হলেও মাঠে ব্যর্থ হয়।
তবে একতরফা দাবির কথা বললে চিত্রটি অসম্পূর্ণ থাকে। মর্যাদা চাওয়ার পাশাপাশি তা অর্জনের দায়ও শিক্ষকের। নিয়মিত পাঠপ্রস্তুতি, শিক্ষার্থীর প্রতি নিরপেক্ষ ও সহমর্মী আচরণ, সময়ানুবর্তিতা, নতুন জ্ঞান ও প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে হালনাগাদ রাখা এবং পেশার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয় এমন কাজ থেকে বিরত থাকা, এসবই শিক্ষকের প্রতি সামাজিক আস্থার ভিত্তি। শিক্ষক নিজে যখন আদর্শ হয়ে ওঠেন, তখন সমাজ আপনিই তাকে সম্মানের আসনে বসায়। আবার সমাজ, অভিভাবক ও রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব আছে সেই আসনটি রক্ষা করার। শিক্ষককে সম্মান করা কেবল সৌজন্য নয়, নিজের সন্তানের ভবিষ্যতে বিনিয়োগও।
একটি জাতি কতদূর এগোবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে তার শিক্ষকেরা কতটা সম্মান, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করতে পারেন তার ওপর। অবকাঠামো, পাঠ্যক্রম আর প্রযুক্তি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেসবকে প্রাণ দেন শিক্ষক। দালানকোঠা আর ডিজিটাল পর্দা শিক্ষার বাহন হতে পারে, শিক্ষার আত্মা নয়। তাই বিশ্ব শিক্ষক দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক, শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা শুধু বক্তৃতায় নয়, প্রতিফলিত হবে তার বেতনে, আইনে, নিরাপত্তায় ও প্রতিদিনের আচরণে। শিক্ষকের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হলেই প্রতিষ্ঠিত হবে একটি জ্ঞানভিত্তিক, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন।
লেখক: আলমগীর মোহাম্মদ
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও অনুবাদক।