১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪৯

আঞ্চলিক উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয় এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা

পাবিপ্রবি উপপরিচালক (জনসংযোগ) মো. বাবুল হোসেন  © টিডিসি সম্পাদিত

যেকোনো প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা বা গড়ে তোলার পিছনে একটি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকে। হোক সেটা সরকারি বা ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। প্রতিটি জায়গায়ই মানুষের মঙ্গল ও প্রয়োজন নিহিত থাকে। সরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে সাধারণ মানুষের করের (ট্যাক্স) টাকায় এবং সেগুলো সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্যই। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে ব্যক্তির অর্থায়নে। 

এখানেও সরকার বিভিন্ন নিয়মনীতির মাধ্যমে সহযোগিতা করে থাকে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও মানুষের কর্মসংস্থান ঘটে এবং মানুষের কল্যাণই নিহিত থাকে। সাধারণ মানুষকে সুবিধা দেওয়ার জন্য আমাদের দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো সরকার পরিচালিত করে থাকে এবং অতি অল্প খরচে মানুষ সেবা নিতে পারে। 

সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মতো এদেশের মানুষকে উচ্চশিক্ষায় গড়ে তোলার জন্য বাংলাদেশে বর্তমানে ৬১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে। সর্বশেষ শরীয়তপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। এর মধ্যে ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় হলো স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় ৪টি পরিচালিত হয়। 

বাংলাদেশের প্রথম এবং প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; যা ১৯২১ সালের ১ জুলাই প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই ১৯২১ সাল থেকে শুরু হয়ে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ৬১ এ পৌঁছেছে। বাংলাদেশের জনসংখ্যার চাহিদা অনুযায়ী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনও আছে। তবে সেক্ষেত্রে অবশ্যই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া দরকার। কারণ প্রযুক্তির বদৌলতে দুনিয়া আজ বহুদূর অগ্রসর হয়েছে। এই অগ্রগতির সাথে আমাদেরও চলতে বা সেই পথে হাঁটতে হবে। তা নাহলে পৃথিবীর উন্নয়নের গতির সাথে আমরা ছিটকে পড়ব।

বেসরকারি বা কর্পোরেট কোম্পানিগুলো শুধু নিজেদের জন্য ব্যবসা-ই করেনা, তারা বিভিন্ন কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি (সিএসআর) সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে অনেক মানবিক কাজও তারা করে থাকে। এর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী তাদের আলদা ফান্ড থাকে। আয়ের ১ শতাংশ সামাজিক দায়বদ্ধতায় ব্যয় করা বাধ্যতামূলক। 

কোনো প্রতিষ্ঠান চাইলে বেশিও ব্যয় করতে পারে। আর সে ফান্ড থেকেই সমাজের কল্যাণের জন্য তারা কাজগুলো করে থাকে। যেমন: ডাচ বাংলা ব্যাংক সিএসআর থেকে শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দিয়ে থাকে। আর এ মানবিক কাজের মাধ্যমে সমাজের মধ্যে একটা পজিটিভ (ইতিবাচক) প্রভাব পড়ে। সেই সাথে একটি মানবিক সমাজ গঠনে সহায়তা করে। আসলে পৃথিবীকে শান্ত ও স্থির করতে হলে দিনশেষে ব্যক্তি বা বিশ্বকে মানবিক হতেই হবে মানুষের প্রয়োজনে।

কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি সরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানও সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে অনেক মানবিক কাজ করে থাকে। উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করা যায় পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মোহা. শামীম। তিনি এ বিশ্ববিদ্যালয়ে চলতি বছরের মে মাসে যোগদানের পরপরই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত কাজের বাইরেও বেশকিছু মানবিক কাজ করার উদ্যোগ নিয়েছেন। দু'একটি তিনি শুরুও করেছেন। যেমন: কয়েক দিন আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশের ৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে উপাচার্যের নিজের অর্থায়নে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় বই, বুক শেলফ এবং ৬টি স্কুলের ১২ জন মেধাবী শিক্ষার্থীকে উপহার প্রদান করেন। স্কুলগুলোতে গাছ লাগানো এবং গাছ প্রদান করা হয়েছে। শীঘ্রই স্কুলগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে স্বেচ্ছাসেবী ক্লাসও নেওয়া হবে। অধ্যাপক ড. শামীম তার নিজ জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের মনাকষাতে নিজের নামে ড. শামীম পাঠাগার নামে একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং নিজের অর্থায়নেই এটি পরিচালিত হয়।

আরও দেখুন: ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১২ দোকান পুড়ে ছাই, ক্ষতি প্রায় কোটি টাকা, আগুন নেভাতে গিয়ে আহত ৩

বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শিক্ষা দান, গবেষণায় জ্ঞানের সৃজন, উৎকর্ষ সাধন ও বিতরণের ব্যবস্থা করা। উদ্ভাবন ছাড়াও ব্যক্তির ও আঞ্চলিক উন্নয়নে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার ফলে প্রতিষ্ঠানের আশেপাশে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে থাকে। অঞ্চলভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফলে শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, যোগাযোগ, চাকরির সুযোগ, কর্মসংস্থানসহ প্রায় সব ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন ঘটছে। নিজের এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার ফলে স্থানীয় শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে সহজেই। উচ্চশিক্ষা গ্রহণে স্থানীয় শিক্ষার্থীরা আরও বেশি উৎসাহী হচ্ছে এবং নিজ এলাকায় থেকেই পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছেন। 

প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় শত শত কোটি টাকার বাজেট এবং উন্নয়ন কাজ হয়ে থাকে। এর ফলে অর্থের প্রবাহ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে স্থানীয় এলাকাগুলোতে। এর ফলে সে এলাকার মানুষের জীবনমান বাড়ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার উন্নয়নের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নেও ব্যাপক অবদান রাখছে। বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে সেসব এলাকায় পড়াশোনার জন্য হাজার হাজার শিক্ষার্থী অবস্থান করছে। সেই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও সেখানে অবস্থান করেন।

স্থানীয় পর্যায়ে অবস্থানের কারণে তাদের আবাসন ও জীবিকা নির্বাহের জন্য উপার্জনের প্রায় পুরোটাই ব্যয় করে থাকেন। এর ফলে আঞ্চলিক অর্থপ্রবাহে বহুগুণ গতি বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয় লোকজনের চাকরির ক্ষেত্রেও সুযোগ বেড়েছে। চাকরির ক্ষেত্রে স্থানীয় চাকরি প্রার্থীরা কিছুটা বেশি প্রাধান্য পেয়ে থাকেন। নিজ এলাকায় প্রতিষ্ঠান হওয়ায় আবেদনের সংখ্যাও হয় বেশি।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফলে স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, আবাসনসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই চাহিদা বেড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে এসব প্রতিষ্ঠানের গুণগত মানও দিন দিন বাড়ছে। চাকরির পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেরও সংযোগ তৈরি হয়েছে। 

বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে বা স্থানীয় পর্যায়ে চায়ের দোকান, মুদিখানা, ফটোকপির দোকান, হোটেলসহ নানা ধরনের ক্ষুদ্র ব্যবসা গড়ে উঠেছে। এর মাধ্যমে তারা ভালোভাবে সংসার নির্বাহ করছেন। স্থানীয় লোকজনের জীবনমান আগের তুলনায় বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে সংস্কৃতির বিনিময় ঘটছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের একজন শিক্ষার্থীও অন্য আরেকটি জেলায় অধ্যয়ন করার সুযোগ পাচ্ছেন। এর মধ্য দিয়ে বিভিন্ন জেলার সঙ্গে সংস্কৃতির সংমিশ্রণ ঘটছে এবং সার্বজনীন একটি আবহ তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন জেলার মানুষ এক ছাতার নিচে চলে আসছে। শিক্ষায় বিকেন্দ্রীকরণ ঘটেছে। জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় শিক্ষার্থীকে এখন এক স্থান থেকে অন্য স্থানে কমই দৌঁড়ঝাপ করতে হয়। শিক্ষার্থীরা তাদের নিজ নিজ এলাকায় থেকেই উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারছেন।

মো. বাবুল হোসেন 
উপপরিচালক (জনসংযোগ)
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।