প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ সেবন: কতটা বিপজ্জনক?
অসুস্থ হলে আমরা সাধারণত কী করি? অনেকেই হয়তো বলবেন, আগে ফার্মেসিতে যাই, দেখি কী ওষুধ দেয়। আবার কেউ কেউ পরিচিত কারও কাছে জিজ্ঞেস করেন, এই সমস্যার জন্য কোন ওষুধ খেলে ভালো হবে? তারপর চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ওষুধ খাওয়া শুরু হয়ে যায়।
আমাদের দেশে এমন ঘটনা খুবই সাধারণ। ছোটখাটো অসুস্থতার জন্য চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে নিজের মতো করে ওষুধ খাওয়াকে অনেকেই বড় কোনো সমস্যা মনে করেন না। কিন্তু একজন ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে আমার মনে হয়, এই অভ্যাস নিয়ে আমাদের একটু ভাবা দরকার।
কারণ ওষুধ এমন কোনো সাধারণ জিনিস নয় যে, সমস্যা হলেই নিজের ইচ্ছামতো খেয়ে নিলাম।
ধরা যাক, কারও জ্বর হয়েছে। অনেকেই জ্বর হলেই অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া শুরু করেন। কিন্তু সব জ্বরের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয় না। অনেক জ্বর ভাইরাসের কারণে হতে পারে, যেখানে অ্যান্টিবায়োটিক কোনো কাজই করে না। বরং অপ্রয়োজনীয়ভাবে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার ফলে ভবিষ্যতে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ না করার মতো সমস্যা তৈরি হতে পারে। যাকে আমরা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বলি।
আবার মাথাব্যথা হলেই নিজের মতো করে ব্যথানাশক খাওয়ার অভ্যাসও অনেকের আছে। একবার-দুবার হয়তো বড় সমস্যা নাও হতে পারে, কিন্তু বারবার বা অতিরিক্ত মাত্রায় কোনো ওষুধ গ্রহণ করলে শরীরে ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে। কোন ওষুধ কতটা এবং কতদিন খাওয়া নিরাপদ এটা জানাও গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটি বিষয় হলো, একজনের জন্য যে ওষুধ কাজ করেছে, সেটি অন্য ব্যক্তির জন্যও কাজ করবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। কারণ মানুষের বয়স, ওজন, শারীরিক অবস্থা এবং অন্যান্য রোগ এক নয়। কেউ হয়তো একই সঙ্গে অন্য কোনো ওষুধও গ্রহণ করছেন। ফলে একটি ওষুধের সঙ্গে অন্য ওষুধের ইন্টারএ্যাকশন হয়ে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
আমরা অনেক সময় ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথাও ভুলে যাই। কোনো ওষুধ খেয়ে উপকার পাওয়া গেলেই সেটি সবার জন্য এবং সব সময় নিরাপদএমনটা ভাবা ঠিক নয়। ওষুধের যেমন উপকারী দিক আছে, তেমনি ভুলভাবে ব্যবহার করলে ক্ষতিকর দিকও থাকতে পারে।
আরও দেখুন: আমরা ফটোশেসনের রাজনীতি করি না: পানিসম্পদ মন্ত্রী
সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো, নিজের মতো করে ওষুধ খেলে অনেক সময় রোগের আসল কারণ জানা যায় না। একটি ওষুধ হয়তো সাময়িকভাবে ব্যথা বা অন্য কোনো উপসর্গ কমিয়ে দিল। তখন আমরা ভাবলাম, সমস্যা ঠিক হয়ে গেছে। কিন্তু ভেতরে থাকা মূল রোগটি হয়তো ঠিকই রয়ে গেল। এতে সঠিক চিকিৎসা নিতে আরও দেরি হতে পারে।
তবে এর মানে এই নয় যে অসুস্থ হলেই ছোটখাটো সমস্যার জন্য হাসপাতালে ছুটতে হবে। কিছু সাধারণ ওভার-দ্য-কাউন্টার ওষুধ নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু সেখানেও ওষুধের নাম, মাত্রা, কতদিন ব্যবহার করতে হবে এবং কোনো সতর্কতা আছে কি না—এসব সম্পর্কে জানা জরুরি। আর উপসর্গ বেশি হলে, বারবার হলে বা অস্বাভাবিক কিছু মনে হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
এখানে ফার্মাসিস্টের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। একজন ফার্মাসিস্ট রোগীকে ওষুধ কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, কখন খেতে হবে, কী ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে এসব বিষয়ে পরামর্শ দিতে পারেন। তাই ফার্মাসিস্টকে শুধু ওষুধ দেওয়ার মানুষ হিসেবে না দেখে স্বাস্থ্যসেবার একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা দরকার।
আমাদের মধ্যে একটা কথা খুব প্রচলিত আগে এই ওষুধ খেয়ে ভালো হয়েছিলাম, এবারও খাব। কিন্তু চিকিৎসার ক্ষেত্রে শুধু আগের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করা সব সময় ঠিক নয়।
অসুস্থ হলে দ্রুত ভালো হওয়ার ইচ্ছা সবারই থাকে। কিন্তু দ্রুত ভালো হতে গিয়ে ভুল ওষুধ খাওয়া বা নিজের ইচ্ছায় ওষুধ শুরু করা কখনো কখনো সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
তাই ওষুধ খাওয়ার আগে অন্তত একবার ভাবা উচিত আমি কি সত্যিই এই ওষুধটি প্রয়োজনের কারণে খাচ্ছি, নাকি শুধু কারও পরামর্শ শুনে?
কারণ ওষুধ আমাদের সুস্থ করতে পারে, আবার ভুল ব্যবহারে ক্ষতিও করতে পারে। পার্থক্যটা অনেক সময় তৈরি হয় শুধু সঠিক জ্ঞান ও সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে।