জুলাই অভ্যুত্থান আর আমার আরেক আব্বু-আম্মু খুঁজে পাওয়ার গল্প
৪ আগস্ট, ২০২৪। আমি আর আমার বন্ধু নিলয়সহ শাহবাগে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলাম। কখনো একসাথে আন্দোলন করছি, কখনো আলাদা হয়ে নিজেদের মতো করে একেক জায়গায় দৌড়াচ্ছি। একবার পিজির (বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) আগুনের মুখে ছাত্রলীগের গুন্ডাদের ইট-পাটকেল মারছিলাম, আবার পরিবাগের যুবলীগের অফিসে আগুন দিয়ে অফিসের রোলিং চেয়ার রাস্তায় নিয়ে একটা ভাইকে বসিয়ে ঘোরাচ্ছিলাম, তৎক্ষণাৎ আবার আমাদের দিকে অতর্কিত এক ছাত্রলীগ গুন্ডা গুলি করার পর তাকে ধাওয়া করছিলাম, বাংলামোটরে চোখের সামনে এক আপুর পেটের এপার থেকে ওপারে স্নাইপারের গুলি যেতে দেখছিলাম, আবার আমার হাতে আঘাত নিয়ে বারডেমের ইমার্জেন্সিতে গিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছিলাম। নিলয়সহ ফোনে একটা ভিডিও করে রাখছিলাম শেষ বার্তা হিসেবে, যদি মরে যাই।
এভাবেই সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত সময় গড়াল। সমন্বয়কেরা কারফিউ ভেঙেছে বলে ৬টা ৫-এ চলে গেলেন। আস্তে আস্তে শাহবাগ খালি হতে লাগল। তখন আমার মাথায় এল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে প্রায় ৫০ জনের মতো মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। তাদের বিপরীতে মিন্টো রোডের অন্য মাথায় দাঁড়ানো শতাধিক পুলিশ। সময় ৬.৩০-এর বেশি। সমন্বয়কেরা নেই, আন্দোলন অফিশিয়ালি শেষ। কিন্তু এদের কেউই জানে না যে আন্দোলন শেষ।
আমি শাহবাগ থেকে সোজা সেখানে গেলাম। দূরত্ব ৫ মিনিটের বেশি না। কিন্তু সেই বিশৃঙ্খলার মধ্যে রাস্তার এই মাথার মানুষ জানে না ওই মাথায় কী হচ্ছে। সবাই কেবল নিজের অবস্থান শক্তভাবে ধরে রাখছিল।
সেখানে গিয়ে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে চেঁচিয়ে বললাম, ‘ভাইয়া-আপুরা, সমন্বয়কেরা চলে গেছেন। আন্দোলন আজকের মতো শেষ, আপনারা প্লিজ বাসায় চলে যান। কালকে কর্মসূচি আবার দিলে আমরা মাঠে নামব।’
কেউ নড়ল না। একজন আপু উল্টো আমার ওপর চড়াও হলেন, ‘তুমি ছাত্রলীগের লোক। সমন্বয়ক গেছে কে বলেছে? তুমি কে? আমরা আজকেই হাসিনার পতন করব।’ আপুকে যত বোঝানোর চেষ্টা করলাম, আপু তত চড়াও হলেন আমার ওপর। আপুর কথা শুনে সাথের মানুষজন প্রস্তুত এখানেই আমার কবর দিয়ে দিতে!
আরও পড়ুন: ‘মাটিতে শুয়েই আম্মাকে ফোন দিলাম’— স্বৈরাচার পতনের মুহূর্তের এক আবেগঘন স্মৃতিচারণ
ওই দিকে আমি দেখছি রাত নেমে আসছে। পুলিশের বহর ঠিক বিপরীতে আদেশের অপেক্ষায় রয়েছে। অপেক্ষা শুধু সময়ের—এখানে লাশের ঢল পড়ার। আমি দুই হাত তুলে পুলিশ আর জনতার মাঝবরাবর গেলাম। ওই পার থেকে এক সাংবাদিক আর পুলিশও এল। তাদের বোঝানোর চেষ্টা করলাম, ‘আপনারা গুলি চালাবেন না দয়া করে। আন্দোলন যেহেতু শেষ, এখানে সবাই চলে যাবে, একটু সময় দিন।’
ফিরে এসে অনেকক্ষণ বুঝিয়ে প্রায় রাত নামার আগে যখন সবাইকে রাজি করাতে পেরেছি ফেরত যাওয়ার, হায়নারা ততক্ষণে আদেশ পেয়ে গেছে। তারপর শুধু মনে আছে গুলি আর সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দ। রক্তাক্ত ব্যান্ডেজ করা হাতে লাঠি, কপালে বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে প্রাণপণে দৌড়াচ্ছি। দৌড়ানো অবস্থাতেই হঠাৎ মাথায় এল এখন গা ঢাকা দিতে হবে। ব্যাগের মধ্যে বিশাল বাংলাদেশের পতাকাটা পিজি হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা এক আপুকে দিয়ে বললাম, যত্নে রাখবেন। আপু তখন, ‘আমরা তোমাদের পক্ষে আছি’—এই জাতীয় কিছু একটা বললেন।
আন্টি আরেকটা বিরিয়ানির দোকানে দাঁড়ালেন। দুটো বিরিয়ানির প্যাকেট কিনে আমাদের হাতে ধরিয়ে দিলেন। আবার হাঁটা শুরু। আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ হাঁটা ছিল এই পথটা। পুরো পান্থপথের মোড় পর্যন্ত তারা আমাদের পৌঁছে দিলেন। বাসা থেকে অল্প দূরত্বে রিকশায় তুলে দিয়ে আপু আমার হাতে জোর করে ৫০০ টাকা ধরিয়ে দিলেন। বললেন, ‘তোমাদের জন্য দোয়া, সাবধানে পৌঁছায়ো বাবা।’
দৌড়ের মাঝে পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি। পিজির বিপরীতে চিকন একটা গলি দিয়ে বের হলাম। লাঠিটা সেখানে ফেলে দিলাম। কপালে থাকা পতাকাটা এক ফলের ভ্যানে কমলার মাঝে গুঁজে দিলাম। তারপর আবার দৌড়। সেন্ট্রাল রোডের দিকে যেতেই বুঝলাম সামনে-পিছে সব দিকে ছাত্রলীগের ছেলেরা ঘুরছে। বেঁচে ফেরার কোনো পথ নেই। যেদিকেই যাব নিশ্চিত মৃত্যু। হাতের ব্যান্ডেজের কারণে দেখলেই বোঝা যায় আন্দোলনে আহত হওয়ার মতো কিছু।
আম্মুকে একটা ফোন দিলাম, ‘মা, মরে গেলে মাফ করে দিও।’ নিলয়ও ফোন দিয়ে বাড়িতে মাফ চেয়ে নিল। তারপর যা হলো, আমি কল্পনাতেও তখন কল্পনা করি নাই। নিলয় যখন বুঝল আর উপায় নেই, দৈবাৎ একটা বাসার নিচে দাঁড়ানো এক ছেলেকে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার বাসায় কি কিছুক্ষণ রাখা যাবে আমাদের?’ এটা pure gamble ছাড়া আর কিছু ছিল না। মনে মনে ভাবছিলাম, আওয়ামী লীগ হলে বাসায় নিয়ে যদি আটকে রাখে বা কাউকে ডেকে ধরিয়ে দেয়!
ছেলেটি বলল, আচ্ছা, আসুন। নিয়ে গেল তার বাসার দরজায়। দরজা খুললেন এক মধ্যবয়সী আঙ্কেল। বুঝছিলাম না কী বলব! তাও সাহস নিয়ে বললাম, ‘আঙ্কেল, আপনার বাসায় যদি এক ঘণ্টা আমাদের থাকতে দিতেন! আমরা আবার চলে যাব। নিচে রাস্তায় কিছু ঝামেলা হচ্ছে দেখে...।’
পিছন থেকে হঠাৎ করে এক আন্টি এলেন। আমার হাতের ব্যান্ডেজের দিকে তাকালেন আর সাথে সাথে বললেন, ‘তাড়াতাড়ি ভেতরে ঢোকো, যা বলার ভেতরে এসে বলো।’
বাসার ভেতরে ঢুকলাম। দুজনের মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছে না। নিলয় তখন আশেপাশে পরিচিত কারও বাসা আছে কি না তা নিয়ে ভাবছে। আমি আঙ্কেলের সাথে কথা বলছি খুবই সাবধানে আর বোঝার চেষ্টা করছি তাঁরা আওয়ামী লীগ কি না। পরে জানতে পারলাম তারাও আন্দোলনে গিয়েছিলেন। এক আহতকে নিয়ে গিয়ে হাসপাতালেও ভর্তি করিয়েছেন। আমাদের সাহায্য করার জন্য সব করতে প্রস্তুত। ওই সময় কী কী নাস্তা বানিয়ে দিয়েছিলেন আমার মনে নেই, গলা দিয়ে নামার অবস্থা ছিল না। আঙ্কেল বারান্দা পরীক্ষা করলেন, একটু নিচে নেমেও দেখে এলেন পুরো রাস্তার মোড়ে মোড়ে ছাত্রলীগের গুন্ডারা ঘুরছে আর খুঁজছে আন্দোলনকারীদের।
আরও পড়ুন: রণক্ষেত্র থেকে ডিবির টর্চার সেল: ছাত্রদল নেতার জুলাই ডায়েরি
আরেকজন আপুও ছিলেন বাসায়। আপুর ছেলেটাই আমাদের বাসায় নিয়ে এসেছিল। ছেলে পড়ে কানাডায়, দেশে ঘুরতে এসেছে। কয়েক দিনের ছুটিতে দেশে এসে এই পরিস্থিতি দেখে সে-ও চাচ্ছিল আন্দোলনে সাহায্য করতে। পরে আমাদের বাসায় আনতে পেরে সে খুশি।
ঘণ্টাখানেক গড়াল। রাস্তায় গুন্ডা আরও বাড়ছে। আমরা ভাবছি বাসায় কীভাবে ফিরব। পরে আন্টি একটা ফুল হাতার শার্ট নিয়ে এলেন, বললেন, ‘এটা পরে তোমার হাতের ব্যান্ডেজ ঢাকো। তোমরা দুজন আমাদের সাথে নিচে নামবে।’
আমি ছিলাম আপুর সাথে, নিলয় ছিল আন্টির সাথে একটু দূরত্ব বজায় রেখে। এমন ভাব যেন পরিবারসহ নিচে নেমেছে একটু কেনাকাটা করতে। রাস্তায় ওই গুন্ডাগুলোর সামনে দিয়েই চলতে লাগলাম। কলিজা শুকিয়ে গেছে, তাও কথা বলার ভান করছিলাম। একটু সামনে গিয়ে আন্টি এক দোকানে গেলেন; বিস্কুট, চানাচুর আরও কত কী নিলেন! একটা আমার হাতে, আরেকটা নিলয়ের হাতে। আবার রাস্তায় নেমে হাঁটা ধরলাম। কোনো রিকশা নেই, গাড়ি নেই। মানুষজনও নেই বলতে গেলে। খালি লাঠি হাতে গুন্ডা ঘুরছে গলির এ মাথায়, ও মাথায়।
আবার আন্টি আরেকটা বিরিয়ানির দোকানে দাঁড়ালেন। দুটো বিরিয়ানির প্যাকেট কিনে আমাদের হাতে ধরিয়ে দিলেন। আবার হাঁটা শুরু। আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ হাঁটা ছিল এই পথটা। পুরো পান্থপথের মোড় পর্যন্ত তারা আমাদের পৌঁছে দিলেন। বাসা থেকে অল্প দূরত্বে রিকশায় তুলে দিয়ে আপু আমার হাতে জোর করে ৫০০ টাকা ধরিয়ে দিলেন। বললেন, ‘তোমাদের জন্য দোয়া, সাবধানে পৌঁছায়ো বাবা।’ সাবধানে পৌঁছালাম ঠিকই, কিন্তু বারবার ভাবছিলাম ওই পুরো পথ দুজন মহিলা এতগুলো গুন্ডার মাঝে একলা যাবেন কীভাবে? আর কেনই-বা একটি পরিবার সবাই মিলে এভাবে আমাদের সাহায্য করল—যেন নিজেদেরই সন্তান!
রাস্তায় গুন্ডা আরও বাড়ছে। আমরা ভাবছি বাসায় কীভাবে ফিরব। পরে আন্টি একটা ফুল হাতার শার্ট নিয়ে এলেন, বললেন, ‘এটা পরে তোমার হাতের ব্যান্ডেজ ঢাকো। তোমরা দুজন আমাদের সাথে নিচে নামবে।’
গত ৫ আগস্ট, টিএসসিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বার্ষিকী অনুষ্ঠানে শামীম স্যার আর হাফিজ স্যার রীতিমতো জোর করে পাঠিয়ে দিলেন বক্তব্য রাখার জন্য। ২ মিনিট সময় যা পেয়েছি, শুধু তাদের কথাই বললাম। ফারহানা আন্টি, ফরিদ আঙ্কেল, আপু... আর দেখলাম প্রতিটি মানুষকে কৃতজ্ঞতার সাথে হাততালি দিতে। যেন তাদেরও বাঁচিয়ে রেখেছিল এই পরিবার।
তারপর সোজা সেন্ট্রাল রোড গিয়ে আমার এই আব্বু-আম্মুর বাসায় উঠলাম। অনেক চেষ্টা করেছি পা ধরে সালাম করতে, করতে দিলেন না। উল্টো সারাদিন দুনিয়ার খাবার খাওয়ালেন আর আমাকে নিজের সন্তানের মতো আদর করলেন। আমার ইচ্ছা করছিল সেখানেই থেকে যাই।
মনে হচ্ছিল হাজার বছর পর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা পেলাম। ব্যক্তিগত কারণে মানসিক অবস্থা খুবই খারাপ ছিল, কিন্তু ওই কয়েক ঘণ্টায় মনে হচ্ছিল আমার জীবনে কোনো দুঃখ নেই। আমার আরও দুজন আব্বু-আম্মু আছেন। তারা আমাকে দেখে রাখবেন। আমার ভয় পাওয়ার কিছুই নেই।
লেখক
এহসান চৌধুরী
শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়