৩ বছরে অর্ধেকে নেমেছে বিদেশি শিক্ষার্থী, নতুন করে বিপদে ৩০০ ভারতীয় মেডিকেল ছাত্রী
রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ হওয়ায় বিপদে পড়েছেন এর সঙ্গে যুক্ত মেডিকেল কলেজের বিদেশি শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে ভারতীয় দুই শতাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষ করে নিজ দেশে ফিরে গিয়ে ডিগ্রির গ্রহণযোগ্যতা হারানোর শঙ্কায় পড়েছেন। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে সমস্যা সমাধানে তারা ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাসের সহযোগিতাও কামনা করেছেন। যদিও মেলেনি সান্ত্বনাও।
গত ২৭ মে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে তিন ঘণ্টার মধ্যে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। ঘটনার পর তদন্ত করে হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করে সরকার। এতে হাসপাতালটির স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে আগে ভর্তি থাকা সংকটাপন্ন রোগীদের সেবা দেওয়া হচ্ছে। লাইসেন্স বাতিলের এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীসহ অনেকে।
মেডিকেলের বিদেশি শিক্ষার্থী অর্ধেক ‘হাওয়া’
দেশে উচ্চশিক্ষার প্রত্যাশা নিয়ে আসা বিদেশি শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ ভর্তি হন মেডিকেল কলেজগুলোতে। এর মধ্যে সরকারি মেডিকেলে আসন সংখ্যা সীমিত। প্রতিবছর এই সংখ্যা সাধারণত থাকে ১০০ থেকে ১২০-এর ঘরে। বড় আকারে বিদেশি শিক্ষার্থীরা ভর্তি হন বেসরকারি মেডিকেলে। দেশের ৬৭টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের মোট আসনের ৪৫ শতাংশ বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির অনুমতি আছে। এ শিক্ষার্থীদের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি ভারত থেকে আসেন। এর বাইরে নেপাল, ভুটান, ফিলিস্তিনসহ এশিয়া ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশের শিক্ষার্থীরা আসেন।
দেশের সরকারি মেডিকেল কলেজে সার্কভুক্ত দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য ১২৫টি এবং অন্যান্য দেশের জন্য ৯৯টি আসন আছে। চলতি শিক্ষাবর্ষে সার্কভুক্ত দেশের ১০৪ জন এবং অন্যান্য দেশের ২০ জনের মতো শিক্ষার্থী আছেন। এসব শিক্ষার্থীর বেশিরভাগই ফিলিস্তিনি। তবে বর্তমানে বেসরকারি মেডিকেলে বিদেশি শিক্ষার্থীর হার গত তিন বছরে সর্বনিম্নে।
আরও পড়ুন: বিদেশি শিক্ষার্থী কমছে, বাড়ছে বিদেশগামী ছাত্রছাত্রী
২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে এসব কলেজে ৬ হাজার ২৭৮টি আসনের মধ্যে ২ হাজার ৮০০ জনেরও বেশি বিদেশি শিক্ষার্থীর ভর্তি করানোর সুযোগ ছিল। তবে ভর্তি হন ১ হাজার ৯৯ জন। অর্থাৎ, প্রায় ৬০ শতাংশ বিদেশি শিক্ষার্থীর আসনই ফাঁকা। অথচ ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে ছিল ২ হাজার ৩১৯ জন। ২০২৩-২৪ সেশনেও এক হাজার ৬৪০ জন বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিলেন। তবে গত শিক্ষাবর্ষে এ সংখ্যা কমে ১ হাজার ২১-এ নেমে আসে।
যদি ডিগ্রিই ইনভ্যালিড হয়ে যায়, তবে এখানে থাকার মানে কী? আমরা এখানে ৪ বছরেরও বেশি সময় ধরে আছি। শুধু একটা ডিগ্রির জন্য এখানে আছি, এখন তারা বলছে যে তোমাদের মাইগ্রেট করতে হবে— ফাতিমা ও মুসকান বানু, ৫ম বর্ষ পড়ুয়া ভারতীয় শিক্ষার্থী, আদ্-দ্বীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজ
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেডিকেল এডুকেশন (ডব্লিউএফএমই)-এর অনুমোদন না পেলে অনেক দেশে বাংলাদেশের এমবিবিএস ডিগ্রির গ্রহণযোগ্যতা হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তির ওপরও পড়েছে। একসময় যেখানে আড়াই থেকে তিন হাজার বিদেশি শিক্ষার্থী বাংলাদেশে চিকিৎসাশাস্ত্র পড়তে আসতেন, এখন সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। পাশাপাশি প্রতিবেশী ভারত থেকে আসা শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. সাকি মো. জাকিউল আলম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজগুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ ভারতের কাশ্মীর অঞ্চল থেকে আসে। তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপড়েনের কারণে সেখান থেকে শিক্ষার্থী আসা কমে গেছে।
নতুন করে শঙ্কায় আদ্-দ্বীনের ভারতীয় শিক্ষার্থীরা
বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও ডেন্টাল কলেজ আইন, ২০২২-এর ৬ ধারা অনুযায়ী, বেসরকারি মেডিকেল কলেজের সঙ্গে হাসপাতাল স্থাপনের শর্ত রয়েছে। এছাড়া মেডিকেল কারিকুলাম অনুযায়ী, তৃতীয় বর্ষ থেকেই হাসপাতালে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ শুরু হয়। এমবিবিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর এক বছরের ইন্টার্নশিপও রয়েছে। ফলে এই বাধ্যবাধকতা পূরণে আদ্-দ্বীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী ও ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে অন্য স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির শর্ত দিয়েছে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর। গত ১৪ জুন কলেজটিকে এমন সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
তবে এ সিদ্ধান্তেও বিপদ কাটেনি বিদেশি শিক্ষার্থীদের। বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানটির সিংহভাগ বিদেশি শিক্ষার্থী এসেছেন ভারত থেকে। প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে এমবিবিএস ডিগ্রি গ্রহণের জন্য বিভিন্ন বর্ষে ২০৯ জন বিদেশি শিক্ষার্থী রয়েছেন। এর মধ্যে হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া বাকিরা সবাই ভারতীয়। তাদের বড় অংশই জম্মু-কাশ্মির থেকে এসেছেন। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটিতে ইন্টার্নশিপে রয়েছেন আরও ৮৬ জন, যাদের বড় অংশই ভারতীয়। তবে ভারত সরকারের নিয়ম অনুযায়ী, একটি মেডিকেল কলেজে পড়ে অন্য হাসপাতালে ইন্টার্ন করলে সেটি গ্রহণযোগ্য হবে না।
ভারতের ন্যাশন্যাল মেডিকেল কমিশন (ফরেন মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট লাইসেন্সিয়েট) রেগুলেশন্স, ২০২১-এর ৪(ক)(২) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো বিদেশি মেডিকেল গ্র্যাজুয়েটকে স্থায়ী নিবন্ধন প্রদান করা হবে না, যদি না তিনি একই বিদেশি মেডিকেল প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম ১২ মাস মেয়াদের একটি ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করেন।
এ পরিস্থিতিতে নিজেদের সমস্যার সমাধানের জন্য ভারতীয় দূতাবাসেও যোগাযোগ করেছেন দেশটি থেকে চিকিৎসাশাস্ত্র শিখতে আসা শিক্ষার্থীরা। তবে জানা গেছে, সেখান থেকে হতাশ হয়েই ফিরেছেন তারা। আদ্-দ্বীন মেডিকেলের বিষয়টিকে একান্তই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যু বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে দূতাবাস।
রবিবার আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজের বেশ কয়েকজন দেশি-বিদেশি শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও কলেজের নিয়মিত ক্লাস কার্যক্রম সচল রয়েছে। তবে তৃতীয় বর্ষ থেকে শেষ বর্ষ পর্যন্ত ক্লিনিক্যাল ক্লাসও হচ্ছে, তবে সেখানে হাতে-কলমের শেখার সুযোগ মিলছে না। এ ছাড়া ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কাটছে অসল সময়। কলেজ প্রশাসন জানিয়েছে, ক্লিনিক্যাল ক্লাস হাতে-কলমে না হলেও চলমান চূড়ান্ত প্রফ পরীক্ষার জন্য পার্শ্ববর্তী কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
মেডিকেল কলেজটির ৫ম তলায় অধ্যক্ষের কক্ষের সামনে উদ্বিগ্ন বসে ছিলেন ফাতিমা এবং মুসকান বানু। এর মধ্যে ফাতিমা দিল্লি থেকে এসেছেন, আর মুসকান বানু রাজস্থান থেকে। তারা প্রতিষ্ঠানটির ৫ম বর্ষের শিক্ষার্থী। এই বর্ষে ৪৫ জন ভারতীয় শিক্ষার্থী রয়েছেন।
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ফাতিমা ও মুসকান বানু দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমরা শিক্ষার্থীরা মূলত যে সমস্যা ফেস করছি, তা হলো— ইন্ডিয়াতে আমাদের ডিগ্রি ইনভ্যালিড হয়ে যাবে। কারণ এনএমসি (ন্যাশনাল মেডিকেল কমিশন) নীতিমালা অনুযায়ী, আমাদের একই কলেজ থেকে ডিগ্রি এবং একই কলেজের হাসপাতাল থেকে ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করতে হবে। কিন্তু তাদের (স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর) কথা অনুযায়ী, আমাদের অন্য কলেজে মাইগ্রেট করতে হবে, যা আমরা ভারতে ফিরে যাওয়ার পর আমাদের জন্য অনেক বড় সমস্যা তৈরি করবে। এ কারণে অনেক শিক্ষার্থী ডিপ্রেসড হয়ে পড়ছে।
আমরা শুধু পড়ছি আর এক্সাম দিচ্ছি। কিন্তু সেটা তো একটা নরমাল গ্র্যাজুয়েশনেও হয়। এমবিবিএসের মূল পার্থক্যটাই হলো এখানে ক্লিনিক্যাল এক্সপোজার প্রয়োজন হয়, যা আমরা পাচ্ছি না— ইযরিন কান্থ, ৪র্থ বর্ষের ভারতীয় শিক্ষার্থী, আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ
তারা আরও বলেন, যদি ডিগ্রিই ইনভ্যালিড হয়ে যায়, তবে এখানে থাকার মানে কী? আমরা এখানে ৪ বছরেরও বেশি সময় ধরে আছি। শুধু একটা ডিগ্রির জন্য এখানে আছি, এখন তারা বলছে যে তোমাদের মাইগ্রেট করতে হবে।
যে কয়েকজন শিক্ষার্থী এই সমস্যার সমাধানের আশা নিয়ে ভারতীয় দূতাবাসে গিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ছিলেন এই দুজন। তারা বলেন, তারা (দূতাবাস) সরাসরি বলেছে, এটি শুধু একটা কলেজের সমস্যা, পুরো দেশের সমস্যা নয়। তারা এতে জড়াতে পারবে না। যতদিন পর্যন্ত হাসপাতাল সংক্রান্ত সমস্যাটি সমাধান হচ্ছে, কিছু করার নেই। যদিও এটি ব্যতিক্রম, তবে এই এক্সেপশনাল বিষয়টাকে এখন কাউন্ট করা হচ্ছে না।
ফাতিমা ও মুসকানের ভাষ্য, আমরা আমাদের পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারছি না। এই পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের অনেক চিন্তা হচ্ছে। আমাদের শান্ত রাখার জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষ বলে যে, ইনশাআল্লাহ ঠিক হয়ে যাবে। যদিও তারাও টেনশনে আছে, কিন্তু আমাদের টেনশন কমানোর জন্য তারা বলছে— ইনশাআল্লাহ ঠিক হয়ে যাবে। তাই আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রাখছি।
করিডোরেই কথা হলো চতুর্থ বর্ষের আরেক শিক্ষার্থী ইযরিন কান্থ-এর সঙ্গে। তিনিও এসেছেন কাশ্মির থেকে। আর চতুর্থ বর্ষে ভারতীয় শিক্ষার্থী আছেন ৫৪ জন। ইযরিন কান্থ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বললেন, যেহেতু আমরা ডক্টর, তাই আমাদের একটা ক্লিনিক্যাল এক্সপোজার থাকা দরকার। যেমন, ফোর্থ ইয়ারে আমাদের পেশেন্টদের দেখতে হয়, তাদের সাথে কথা বলতে হয়, হিস্ট্রি নিতে হয়। কিন্তু যেহেতু আমাদের হাসপাতাল বন্ধ, তাই আমরা এই ধরনের কোনো এক্সপোজার পাচ্ছি না। আমরা শুধু পড়ছি আর এক্সাম দিচ্ছি। কিন্তু সেটা তো একটা নরমাল গ্র্যাজুয়েশনেও হয়। এমবিবিএসের মূল পার্থক্যটাই হলো এখানে ক্লিনিক্যাল এক্সপোজার প্রয়োজন হয়, যা আমরা পাচ্ছি না।
তিনি বলেন, এখন যদি আমরা কলেজ মাইগ্রেট বা শিফট করি, তবে আমাদের ডিগ্রি ভ্যালিড হবে না। আমরা ইন্ডিয়াতে গিয়ে প্র্যাকটিস করতে পারব না। আমাদের যে রুলস দেওয়া হয়েছে তা আমাদের ফলো করতে হবে। সেগুলো যেহেতু এখানে ফলো হচ্ছে না, তাই আমাদের সমস্যা তো হবেই।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানালেন চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী মীর আইশা জাবেদ ও তাবিয়া ভাট। উভয়েই জম্মু ও কাশ্মির থেকে এসেছেন চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়নে।
তবে শুধু ভারতীয় শিক্ষার্থীই নয়, হাসপাতাল বন্ধ থাকায় ভোগান্তি পোহাচ্ছেন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরাও। শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে জানিয়ে ফারিহা জামান পূর্বাশা নামে এক শিক্ষার্থী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমরা যারা আদ্-দ্বীনের শিক্ষার্থী, আমরা এখানকার পেশেন্ট ফ্লো দেখে ভর্তি হয়েছিলাম। সরকার আমাদেরকে মাইগ্রেশনের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল, সেখানেই আমরা চয়েস দেই আদ্-দ্বীন। কিন্তু...।
তিনি বলেন, বর্তমানে সরকার যে ব্যবস্থাটা নিল...। আমরাও চাই এটার সুষ্ঠু তদন্ত হোক এবং নিরপেক্ষ একটা বিচার করা হোক। কারণ যে দায়ী, যারা দায়ী, বিভাগ বা ব্যক্তি যদি দায়ী থেকে থাকে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া তো কোন সমাধান হতে পারে না। আমরা চাই সরকার এটা পুনর্বিবেচনা করুক এবং লাইসেন্স ফিরিয়ে দেওয়া হোক। যদি কোন শর্ত সাপেক্ষেও হয়, অবশ্যই আমাদের আদ্-দ্বীনের লাইসেন্সটা ফিরিয়ে দেওয়া হোক।
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক (আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ সমূহ) মো. সিদ্দিকুর রহমান সুমন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমাদের মোট শিক্ষার্থী ৬৪৫ জনের মতো। এর মধ্যে বিদেশি শিক্ষার্থী আছে ২৯৫ জন। এখন সবচাইতে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে এই ফরেন স্টুডেন্টরা। কারণ ইন্ডিয়ান যে কাউন্সিল, তাদের নির্দেশনা হচ্ছে একই মেডিকেল কলেজে গ্রাজুয়েট কমপ্লিট করতে হবে, পাশাপাশি ওই কলেজেই ইন্টার্নশিপ করতে হবে। অন্য মেডিকেল কলেজে ওদের দিলে ওই দেশে অ্যালাও করা হবে না। সে কারণে ওরা বেশি উৎকণ্ঠায় আছে। একই সঙ্গে এটা আমাদের দেশের ভাবমূর্তির জন্যও একটি প্রশ্নবোধক হয়ে গেছে।
হাসপাতাল বন্ধ হওয়ায় এদের মাইগ্রেশন করে অন্য হাসপাতালে যেতে হবে। অন্য হাসপাতালে ইন্টার্ন করলে ইন্ডিয়ান অথোরিটি কোনোভাবেই তাদের লাইসেন্স এক্সসেপ্ট করবে না। কারণ তাদের আইন অনুযায়ী এক মেডিকেলে পড়ালেখা, অন্য মেডিকেলে ইন্টার্ন গ্রহণযোগ্য নয়। ইন্ডিয়ান অ্যাম্বাসিও এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবেন না। যত দ্রুত সমাধান হবে, তবে দ্রুত মানসিক এক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবে এসব শিক্ষার্থী— অধ্যাপক ডা. সাকলায়েন রাসেল, বিভাগীয় প্রধান, ভাসকুলার সার্জারি বিভাগ, ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতাল
তিনি বলেন, আমরা সরকারের কাছে উদাত্ত আহবান রাখব, আমাদের যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটা ঘটেছে, তদন্ত যেহেতু হয়েছে, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা যা দরকার সেটা করুক, পাশাপাশি হাসপাতালটা খুলে দেওয়া হোক। বিদেশি এসব শিক্ষার্থীর অভিভাবকরা প্রতি মুহূর্তে আমাদেরকে ফোন করছেন। একই সঙ্গে আমাদের লোকাল শিক্ষার্থীরাও একটা উৎকণঠার মধ্যে আছে। তারা এখানকার পরিবেশ এবং পেশেন্ট ফ্লো দেখে সবকিছু বিবেচনা করেই ভর্তি হয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন অবস্থায় রয়েছি।
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পরিচালক (এইচআর অ্যান্ড কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স) তরিকুল ইসলাম মুকুল দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এমবিবিএস একটি প্রতিষ্ঠানে করে আরেক প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্ন করলে ভারতে গ্রহণযোগ্য হয় না বলে ছাত্রীরা জানিয়েছেন। আমরা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করছি।
তিনি বলেন, হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত স্থগিত রেখে চিকিৎসাধীন রোগীদের সেবা কার্যক্রম অব্যাহত রাখার অনুমতি চেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এখনও কোনও জবাব পাওয়া যায়নি। আশা করছি, একটি সমাধান পাব আমরা।
ভারতীয় শিক্ষার্থীদের বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালের ভাসকুলার সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সাকলায়েন রাসেল সম্প্রতি ফেসবুকে লিখেছেন, আদ্-দ্বীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজের লাইসেন্স বাতিল হওয়ায় ভয়ংকর বিপদে বিদেশি শিক্ষার্থীরা। অজানা এক আতংকে কাটছে তাদের প্রতিদিন। বিশেষ করে ভারতীয় শিক্ষার্থীরা, সংখ্যায় এরা অনেক বেশি।
তিনি আরও লিখেছেন, হাসপাতাল বন্ধ হওয়ায় এদের মাইগ্রেশন করে অন্য হাসপাতালে যেতে হবে। অন্য হাসপাতালে ইন্টার্ন করলে ইন্ডিয়ান অথোরিটি কোনোভাবেই তাদের লাইসেন্স এক্সসেপ্ট করবে না। কারণ তাদের আইন অনুযায়ী এক মেডিকেলে পড়ালেখা, অন্য মেডিকেলে ইন্টার্ন গ্রহণযোগ্য নয়। ইন্ডিয়ান অ্যাম্বাসিও এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবেন না।
ডা. সাকলায়েন রাসেল লিখেছেন, খোঁজ নিয়ে দেখলাম, সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছেন এবং একটি যৌক্তিক সমাধানের জন্যে বেশ আন্তরিক। তবে যত দ্রুত সমাধান হবে, তবে দ্রুত মানসিক এক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবে এসব শিক্ষার্থী।
আদ্-দ্বীনের ইস্যুতে দেশের মেডিকেলে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে নতুন করে নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলেও মনে করছেন অনেকে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আদ্-দ্বীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজের মতো প্রথম সারির একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে বিদেশি শিক্ষার্থীরা যেভাবে ভোগান্তিতে পড়েছেন, তার প্রভাব পুরো খাতের ওপর পড়বে। এই সংকটের কারণে ভারতীয় শিক্ষার্থীদের মাঝে একটি নেতিবাচক বার্তা যাবে যে বাংলাদেশে তাদের ডিগ্রি গ্রহণ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
আরও পড়ুন: আদ্-দ্বীন হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত সুবিবেচনাপ্রসূত নয়: গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র
তিনি বলেন, নিয়ম মেনে ভারতীয় এসব শিক্ষার্থীর কোর্স ও ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা প্রধানত সংশ্লিষ্ট কলেজের। তবে এতে যেহেতু সরকারপক্ষও জড়িয়ে পড়েছে, সরকারকেও দেশের চিকিৎসা শিক্ষার স্বার্থে ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। কেননা এই ঘটনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের চিকিৎসা শিক্ষার ভাবমূর্তি মারাত্মক সংকটে পড়বে।
এদিকে আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষকে শিক্ষার্থী ও ইন্টার্ন চিকিৎসকদের অন্য স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ক্লিনিক্যাল ক্লাসের ব্যবস্থা প্রসঙ্গে দেওয়া চিঠির জবাব পর্যালোচনাধীন রয়েছে বলে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে। এ বিষয়ে অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. রুবীনা ইয়াসমিন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে আদ্-দ্বীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজকে যে চিঠি দেওয়া হয়েছিল, সেটির জবাব তারা দিয়েছে। আমরা সেটি দেখব।
প্রতিষ্ঠানটির ভারতীয় শিক্ষার্থীদের জটিলতার সমাধান প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে তিনি এ বিষয়ে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজকে প্রশ্ন করতে বলেন। অধ্যাপক রুবীনা ইয়াসমিন বলেন, আদ্-দ্বীনকে জিজ্ঞেস করেন যে আপনারা ভারতীয় যে শিক্ষার্ধী ভর্তি করেছেন, তাদের এই নীতিমালা— আপনারা এখন কী করবেন? এটা ওদের জিজ্ঞাসার বিষয়। আমরা আপাতত এটি নিয়ে কনসার্ন না। কারণ আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষ আমাদেরকে বলেছে, ওদের যে বাকি দুটি হাসপাতাল আছে, আপাতত ওই দুটি হাসপাতালে ক্লিনিক্যাল ক্লাস কার্যক্রম চালাবে।