১৩ মে ২০২৬, ১৭:১৪

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ফাঁকা অডিটোরিয়াম, ‘একাডেমিক ব্যবস্থা’র হুমকি দিয়ে নোটিশ

ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ইনসেটে সাংস্কৃতিক উৎসবের সমাপনী অনুষ্ঠানে উপস্থিতির চিত্র  © সংগৃহীত ও সম্পাদিত

ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক উৎসবে কাঙ্ক্ষিত হারে উপস্থিত হননি শিক্ষার্থীরা। তিনদিন ব্যাপী এই অনুষ্ঠানে উপস্থিতির বেহাল দশা দেখে গতকাল মঙ্গলবার (১৩ মে) সমাপনী অনুষ্ঠানেও অনুপস্থিত থাকলে একাডেমিক ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে নোটিশ দেয় কলেজ প্রশাসন। কিন্তু বিকেলে সমাপনী অনুষ্ঠানেও অনুষ্ঠানস্থল প্রায় ফাঁকা দেখা গেছে।

এদিকে সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে উপস্থিত না হলে একাডেমিক শাস্তির হুমকি দেয়ার ঘটনায় ক্যাম্পাসজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে বেশ কয়েকটি ব্যাচের টার্ম পরীক্ষা চলমান থাকায় এই ঘটনায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা। এমনকি আগামী সপ্তাহে শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীদের ফাইনাল প্রফেশনাল পরীক্ষা শুরু হচ্ছে, একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত হবে অন্যান্য ব্যাচের অনিয়মিত (সাপ্লি) প্রফ পরীক্ষা। ফলে এমন বাধ্যতামূলক উপস্থিতি এবং অনুপস্থিত না থাকলে একাডেমিক শাস্তির হুমকিতে ক্ষুব্ধ তারা।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ মে তিনদিনব্যাপী এই সাংস্কৃতিক উৎসব শুরু হয়। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত এই অনুষ্ঠান চলে। উৎসবের অংশ হিসেবে ১০ মে রবীন্দ্র সংগীত, নজরুল গীতি ও আবৃত্তি, ১১ মে পল্লীগীতি, হামদ-নাত, কুইজ, নৃত্য (একক ও গ্রুপ) ও চিত্রাঙ্কন এবং ১২ মে দেশাত্ববোধক গান, আধুনিক গান, উপস্থিত বক্তৃতা ও বিতর্ক প্রতিযোগিতা আয়োজিত হয়। শেষদিন বিকাল ৫টায় পুরস্কার বিতরণী ও সমাপনী অনুষ্ঠান শুরু হয়। সমাপনী অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে কনসার্ট ও ব্যান্ড শো ছিল বলেও জানা গেছে।

প্রোগ্রাম ৫টা থেকে রাত পর্যন্ত চলে। শুরুতে পুরস্কার বিতরণী, তারপরে কনসার্ট। আসলে কনসার্টে মেডিকেলের ম্যাক্সিমামই যায় না। এজন্য অনেকে না গিয়ে থাকতে পারে। এত পড়াশোনার চাপের মধ্যে অনেকেরই এসবে মনোযোগ নাই। তা ছাড়া অনেকের পরীক্ষা চলছে। যেমন বর্তমানে দ্বিতীয় বর্ষের টার্ম পরীক্ষা চলছে। আজকেও তাদের একটা ভাইভা হয়েছে। গতকাল এই নোটিশের পর তারা বলছিল যে ভাই, আমরা কিভাবে এই প্রোগ্রামে যাব— ঢাকা মেডিকেল কলেজ শিক্ষার্থী

এদিকে সমাপনী অনুষ্ঠানে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে দুপুরে অধ্যক্ষের দপ্তর থেকে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এতে সই করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ ও একাডেমিক কো-অর্ডিনেটর অধ্যাপক ডা. মুসাররাত সুলতানা। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এই মেডিকেল কলেজের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক উৎসব-২০২৬ এর পুরষ্কার বিতরণী ও সমাপনী অনুষ্ঠান আজ ১২ মে বিকাল ৫টায় শহীদ ডা. শামসুল আলম খান মিলন অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানে সকল ছাত্রছাত্রীকে অংশগ্রহণের জন্য নির্দেশ দেয়া হলো। কোন শিক্ষার্থী অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকলে তার বিরুদ্ধে একাডেমিক কার্যক্রম ভঙ্গের কারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আরও পড়ুন: অনুমোদনের অপেক্ষায় ১২০০ কোটি টাকার মাস্টারপ্ল্যান, বদলে যাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজের চিত্র

বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. নাজমুল হোসেন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস এবং সম্মানিত অতিথি হিসেবে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. সাকি মো. জাকিউল আলম উপস্থিত থাকবেন।

এদিকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বলছেন, সমাপনী অনুষ্ঠান উপলক্ষে মঙ্গলবার বেলা ১১টার পর ক্লাস কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। এই বিষয়টি আগেই শিক্ষার্থীদের জানানো হয়েছিল। এই ‘ছুটি’ পেয়ে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ‘ট্যুরে’ চলে গিয়েছে, এমন খবর ছড়িয়ে পড়ে ক্যাম্পাসে। এ অবস্থায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে নোটিশটি দিয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ।

তবে নোটিশটি ছড়িয়ে পড়লে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও এ নিয়ে সমালোচনা করেন সাবেক-বর্তমান শিক্ষার্থীরা। ইমরান খান ফাহিম নামে কে-৮০ ব্যাচের এক শিক্ষার্থী ফেসবুকে লিখেছেন, ‘একাডেমিক কার্যক্রম (যেমন পরীক্ষা, ক্লাসে উপস্থিতি ইত্যাদি) আর সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে বাধ্য করা এক জিনিস না। একাডেমিক কার্যক্রম একটা প্রতিষ্ঠানে ইউনিভার্সাল হইলেও সবরকম কালচারাল অ্যাকটিভিটি ইউনিভার্সাল না। ভালো প্রফেশনাল হতে হলে ভালোমতো পড়াশোনা সবাইকেই করতে হবে, কিন্তু নাচ-গান, তর্ক-বিতর্ক, কবিতা-বক্তৃতা ইত্যাদি করা-না করা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ব্যাপার। এইজন্যই এগুলোকে কারিকুলার কার্যক্রম না বলে বরং কো-কারিকুলার বা এক্সট্রা-কারিকুলার কার্যক্রম বলা হয়। অথচ,এইটাতে পার্টিসিপেট না করার জন্য ব্যাপারটাকে একাডেমিক কার্যক্রম ভঙ্গের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো কোন যুক্তির মধ্যে পড়ে, আমি জানি না।’

আরও পড়ুন: ছুটির আগেই বাড়ি যাওয়ার ‘ট্রেন্ড’ মেডিকেল শিক্ষার্থীদের, কঠোর হচ্ছে স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রশাসন

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা মেডিকেল কলেজের তৃতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, নোটিশটা দেখে পুরো ক্যাম্পাস থ হয়ে গিয়েছে। কারণ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তো যাওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকার কথা না। এরই মধ্যে ছাত্র হলের গ্রুপে একজন ম্যাসেজ দিয়েছে ছাত্রশিবিরকে ইঙ্গিত করে— একটি গোষ্ঠীর ট্যুর আটকানোর জন্য এই নোটিশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু পরে জানা গেল যে আসলে কোনো ট্যুর ছিল না। স্যার-ম্যামরাও হয়তো ভেবেছেন যে শিক্ষার্থীরা ট্যুরে চলে গেলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বাস্তবায়ন হবে না।

এটি একটি রাষ্ট্রীয় প্রোগ্রাম ছিল। প্রতিমন্ত্রী এসেছিলেন। কিন্তু আমরা শুনলাম একটা গ্রুপ নাকি ছাত্রদেরকে নিয়ে ট্যুরে চলে গেছে। এখানে তো আসলে সব ছাত্রদের থাকার কথা, ওরাই অ্যারেঞ্জ করেছে প্রোগ্রামটা। আমি পরে ম্যাসেজ পেলাম যে তার ট্যুরে গেছে। তখন প্রিন্সিপালসহ একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নোটিশটা দিতে হয়েছে— অধ্যাপক ডা. মুসাররাত সুলতানা, উপাধ্যক্ষ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ

অপর এক শিক্ষার্থী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, প্রোগ্রাম ৫টা থেকে রাত পর্যন্ত চলে। শুরুতে পুরস্কার বিতরণী, তারপরে কনসার্ট। আসলে কনসার্টে মেডিকেলের ম্যাক্সিমামই যায় না। এজন্য অনেকে না গিয়ে থাকতে পারে। এত পড়াশোনার চাপের মধ্যে অনেকেরই এসবে মনোযোগ নাই। তা ছাড়া অনেকের পরীক্ষা চলছে। যেমন বর্তমানে দ্বিতীয় বর্ষের টার্ম পরীক্ষা চলছে। আজকেও তাদের একটা ভাইভা হয়েছে। গতকাল এই নোটিশের পর তারা বলছিল যে ভাই, আমরা কিভাবে এই প্রোগ্রামে যাব। এখন প্রশাসন আসলেই কোনো স্টেপ নেয় কিনা, সামনে দেখা যাবে।

আরও পড়ুন: জুলাই গণ‌অভ্যুত্থানে অন্য স্পেশালিটিতে বদলি, এবার ওএসডি করে পাঠানো হল জেনারেল হাসপাতালে

কোনো ট্যুর ছিল কিনা— জানতে ছাত্রশিবিরের এক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস। বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজে সংগঠনটির কোনো কার্যক্রম নেই বলে জানান তিনি। তবে ঢাকাস্থ সকল মেডিকেল কলেজ নিয়ে ‘মেডিকেল জোন’ নামে একটি ইউনিট রয়েছে। তিনি বলেন, এখন একাডেমিক কার্যক্রমের ভরা সিজন। ক্লাস-পরীক্ষা মিলিয়ে সবার অনেক ব্যস্ত সময়। আগামী ১৮-১৯ তারিখে ফাইনাল প্রফ শুরু হবে। অন্যদের সাপ্লি প্রফ, আর টার্ম পরীক্ষা চলে। ফলে কারোরই ট্যুরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নাই। কলেজ প্রশাসন কারো কোনো কথা শুনে হয়তো এই নোটিশটা দিয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা মেডিকেল কলেজে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ।

আগেই জানানো হয়েছিল যে সমাপনী অনুষ্ঠান উপলক্ষে ১১টার আগে ক্লাস সাসপেন্ড করা হবে প্রোগ্রামে পার্টিসিপেশনের জন্য। কিন্তু আমরা শুনলাম যে ছেলেরা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে গেছে, ট্যুরে গেছে। এ অবস্থায় অনুষ্ঠান বাস্তবায়ন করতে আমাদের এমন নোটিশ দিতে হয়েছে। একাডেমিক ব্যবস্থা মুখ্য না। আসলে সবাই থাকার জন্য, ওদেরকে উপস্থিতির জন্য সতর্ক করা— ডা. মো. আসাদুজ্জামান, আহ্বায়ক, সাংস্কৃতিক উৎসব বাস্তবায়ন কমিটি

জানতে চাইলে সাংস্কৃতিক উৎসব বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. আসাদুজ্জামান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, স্পেসিফিকলি একটা বিশেষ দলের ছেলেরা সমালোচনা করছে। আসলে অনুষ্ঠানে মিনিস্টার (প্রতিমন্ত্রী) আসার কথা ছিল। এজন্য ওদের সবাইকে নোটিশ দেয়া হয়েছিল— যাতে সবাই থাকে। কিন্তু মন্ত্রী সাহেব আসার পরও ৫০ জন ছেলেমেয়েও ছিল না। পুরো অডিটোরিয়াম খালি ছিল।

তিনি বলেন, আগের দুইদিনের উপস্থিতি কম দেখেই এটা করতে হয়েছে। মূলত এই প্রোগ্রামটা স্টুডেন্টদের অনুরোধেই করা হয়েছে। ওরা বলছিল যে আমাদের পড়াশোনা বেশি, সামনে তো পরীক্ষা— আমরা এর মধ্যে করে ফেলি, পরীক্ষার পরে সময় পাব না। কলেজ অথরিটি চাইছিল আরও পরে করতে। কিন্তু অনুষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল ৫-১০ জন করে।

আরও পড়ুন: রাজনীতি নিষিদ্ধ সত্ত্বেও নিজ হাতে ছাত্রদলের কর্মসূচি উদ্বোধন, শিবিরের ইফতারে নিষেধাজ্ঞা

তিনি বলেন, আগেই জানানো হয়েছিল যে সমাপনী অনুষ্ঠান উপলক্ষে ১১টার আগে ক্লাস সাসপেন্ড করা হবে প্রোগ্রামে পার্টিসিপেশনের জন্য। কিন্তু আমরা শুনলাম যে ছেলেরা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে গেছে, ট্যুরে গেছে। এ অবস্থায় অনুষ্ঠান বাস্তবায়ন করতে আমাদের এমন নোটিশ দিতে হয়েছে। একাডেমিক ব্যবস্থা মুখ্য না। আসলে সবাই থাকার জন্য, ওদেরকে উপস্থিতির জন্য সতর্ক করা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. মাজহারুল শাহীন মুঠোফোনে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মুসাররাত সুলতানা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এটি একটি রাষ্ট্রীয় প্রোগ্রাম ছিল। প্রতিমন্ত্রী এসেছিলেন। কিন্তু আমরা শুনলাম একটা গ্রুপ নাকি ছাত্রদেরকে নিয়ে ট্যুরে চলে গেছে। এখানে তো আসলে সব ছাত্রদের থাকার কথা, ওরাই অ্যারেঞ্জ করেছে প্রোগ্রামটা। আমি পরে ম্যাসেজ পেলাম যে তার ট্যুরে গেছে। তখন প্রিন্সিপালসহ একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নোটিশটা দিতে হয়েছে।