২০ জুলাই ২০২৬, ১৪:২৩

চব্বিশের ২০ জুলাইয়ে রাজশাহী: দেশে কারফিউ জারি, মেসে মেসে আন্দোলনের প্রস্তুতি

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও অবস্থান  © টিডিসি ফাইল ছবি

২০২৪ সালের ২০ জুলাই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ও উত্তাল দিন। আগের দুই দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, প্রাণহানি এবং রাষ্ট্রজুড়ে অস্থিরতার পর সেদিন সরকার প্রথমবারের মতো দেশব্যাপী কারফিউ জারি করে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে বিভাগীয় শহরগুলোয় মোতায়েন করা হয় সেনাবাহিনী। রাস্তাঘাট ফাঁকা, দোকানপাট বন্ধ, যানবাহন চলাচল প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ, ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন—পুরো দেশ যেন এক অচেনা নীরবতায় ঢেকে যায়। কিন্তু সেই নীরবতার আড়ালেই চলছিল আন্দোলনের নতুন পরিকল্পনা। বিশেষ করে রাজশাহীতে, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ছেড়ে মেসে ওঠা শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের পরবর্তী ধাপের ভিত্তি গড়ে তুলছিলেন।

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯ জুলাই দিবাগত রাত ১২টা থেকে ২০ জুলাই দুপুর ১২টা পর্যন্ত প্রথম দফায় কারফিউ কার্যকর করা হয়। এরপর দুই ঘণ্টার বিরতি দিয়ে দুপুর ২টা থেকে আবার কারফিউ জারি করা হয়, যা ২১ জুলাই বিকেল ৩টা পর্যন্ত বহাল থাকবে বলে জানানো হয়। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‍্যাব ও পুলিশের যৌথ টহল জোরদার করা হয়। জরুরি সেবা ছাড়া প্রায় সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ ছিল। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে সাধারণ মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

এদিন টানা তৃতীয় দিনের মতো মোবাইল ইন্টারনেট ও ব্রডব্যান্ড সেবা কার্যত বন্ধ রাখা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন সংবাদমাধ্যম এবং বিভিন্ন ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে যোগাযোগ থেকে শুরু করে জরুরি তথ্য আদান-প্রদান—সবকিছুই হয়ে ওঠে অনিশ্চিত। পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার ২১ ও ২২ জুলাই সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। একই সময়ে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএ নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ২১ জুলাই থেকে দেশের সব পোশাক কারখানা বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়।

কারফিউ জারির দিনও সংঘর্ষ থামেনি। ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, নরসিংদী, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০ জুলাই একদিনেই অন্তত ৩৭ জন নিহত হন। আহত হন কয়েক শতাধিক মানুষ। নিহতদের মধ্যে ঢাকায় দুই পুলিশ সদস্যও ছিলেন। আন্দোলন ঘিরে সারা দেশের পরিস্থিতি তখন চরম উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন: এইচএসসির স্থগিত পরীক্ষার সময়সূচি নির্ধারণে আজ ডিসিদের সঙ্গে বসছে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড

এদিকে এই সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছিল। ১৭ জুলাই জরুরি সিন্ডিকেট সভায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ১৮ জুলাই দুপুর ১২টার মধ্যে সব আবাসিক হল খালি করার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে ১৯ জুলাই সকাল পর্যন্ত হল খোলা রাখা হয়। এরপর শিক্ষার্থীরা হল ছেড়ে নগরীর বিভিন্ন মেস, ভাড়া বাসা ও আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে চলে যান।

হল ছেড়ে যাওয়ার ঘটনাকে অনেকেই আন্দোলনের সমাপ্তির সূচনা মনে করলেও বাস্তবে সেটিই ছিল আন্দোলনের নতুন সাংগঠনিক অধ্যায়ের শুরু। আন্দোলনকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯ জুলাই থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়, পরিকল্পনা ও যোগাযোগ কার্যক্রম রাজশাহী থেকেই পরিচালিত হয়। প্রকাশ্যে কর্মসূচি দেওয়ার সুযোগ না থাকায় শিক্ষার্থীরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে বিভিন্ন মেসে অবস্থান নেন। সেখান থেকেই তৈরি হয় নতুন সমন্বয়ক প্যানেল, নির্ধারণ করা হয় দায়িত্ব বণ্টন, ঠিক করা হয় যোগাযোগের বিকল্প ব্যবস্থা এবং আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচির রূপরেখা।

ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। আন্দোলনকারীরা সরাসরি সাক্ষাৎ, ফোনকল এবং বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদানের ব্যবস্থা করেন। কোনো মেসে দীর্ঘ সময় অবস্থান না করে প্রয়োজন অনুযায়ী স্থান পরিবর্তনও করা হতো। নিরাপত্তার স্বার্থে অনেক সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কয়েকজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হতো। কারফিউ চলাকালেও কীভাবে আন্দোলনের গতি ধরে রাখা যায়, সেই পরিকল্পনাই ছিল সেদিনের প্রধান কাজ।

২০ জুলাই রাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী কলেজের আন্দোলনকারীরা আইনজীবীদের সঙ্গে বৈঠক করে একটি আইনি সহায়তা টিম গঠন করেন। তাদের আশঙ্কা ছিল, খুব শিগগির আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক গ্রেপ্তার অভিযান শুরু হতে পারে। তাই আগে থেকেই আইনজীবীদের সঙ্গে সমন্বয় করে আটক শিক্ষার্থীদের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাশাপাশি সম্ভাব্য মামলার তথ্য সংগ্রহ, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং জরুরি সহায়তা প্রদানের বিষয়েও পরিকল্পনা করা হয়।

আরও পড়ুন: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের প্রবেশপত্র নিয়ে জরুরি নির্দেশনা

সমন্বয়ক না হয়েও জুলাই আন্দোলনের সম্মুখসারির যোদ্ধা ছিলেন নীরব হাসান। তিনি বলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর প্রশাসন থেকে মাইকিং করা হয় হল ত্যাগের জন্য। শুধু তাই নয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকাজুড়ে যত দোকানপাট রয়েছে সেগুলো বন্ধ করতেও মাইকিং করা হয়েছে। কারণ শিক্ষার্থীরা খাবার না পেয়ে হল ত্যাগ করতে বাধ্য হবেন। কিন্তু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রুয়েট, রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থীরা হল ত্যাগ করে মেসে অবস্থান নিয়ে দ্বিগুণ শক্তিতে তারা আন্দোলনে নেমেছিলাম। আন্দোলন সফল করেই কিন্তু শিক্ষার্থীরা ঘরে ফিরেছে।

জুলাই আন্দোলন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সমন্বয়ক ফাহিম রেজা বলেন, ‘হল ছাড়ার সিদ্ধান্ত আমাদের জন্য শুধু আবাসন হারানোর বিষয় ছিল না, এটি ছিল আন্দোলনের কৌশল পরিবর্তনের মুহূর্ত। আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, আগের মতো প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়া সম্ভব হবে না। তাই ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে মেসে অবস্থান শুরু করি। প্রতিদিন কোথায় বৈঠক হবে, কার সঙ্গে কার যোগাযোগ থাকবে, কে কোন দায়িত্ব পালন করবে—সবকিছু পরিকল্পিতভাবে নির্ধারণ করা হয়। ইন্টারনেট না থাকায় আমাদের অনেক সময় কয়েক কিলোমিটার পথ হেঁটে শুধু একটি বার্তা পৌঁছে দিতে হয়েছে। কিন্তু কেউ মনোবল হারায়নি। বরং সবাই বিশ্বাস করছিল, সংগঠিত থাকতে পারলেই আন্দোলন টিকে থাকবে। সেই সময়ের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, আবার একই সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক আরেক সমন্বয়ক মেহেদী সজিব বলেন, ‘২০ জুলাইকে আমি আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতির দিনগুলোর একটি বলব। বাইরে কারফিউ, সেনাবাহিনীর টহল, গ্রেপ্তারের আশঙ্কা—সব মিলিয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি ছিল। কিন্তু আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, কোনোভাবেই সমন্বয় ভেঙে পড়তে দেওয়া যাবে না। তাই বিকল্প নেতৃত্ব তৈরি করা হয়, একাধিক যোগাযোগ চ্যানেল গড়ে তোলা হয় এবং প্রত্যেকের জন্য আলাদা দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়। একজনের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে অন্যজন যেন কাজ চালিয়ে যেতে পারেন, সেই ব্যবস্থাও রাখা হয়। রাজশাহীর বিভিন্ন মেস থেকেই তখন সারাদেশের আন্দোলনের খবর সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং পরবর্তী কর্মসূচির প্রস্তুতি চলছিল।’

আরও পড়ুন: যোগদান করেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা গোবিপ্রবির নতুন উপাচার্যের

রাজশাহী কলেজের সম্মুখ সারির জুলাই যোদ্ধা রাজু আহমেদ বলেন, ‘সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে সমন্বয় গড়ে উঠেছিল, তা ছিল নজিরবিহীন। আমরা বুঝতে পারছিলাম, সামনে আরও কঠিন সময় আসছে। তাই আন্দোলনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, আইনি সহায়তা এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়গুলোকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। আইনজীবীদের নিয়ে একটি টিম গঠনের সিদ্ধান্তও সেই বাস্তবতা থেকেই নেওয়া হয়। আমাদের লক্ষ্য ছিল, কেউ আটক হলে যেন সে একা না থাকে। একই সঙ্গে আন্দোলনের সাংগঠনিক কাঠামো যাতে ভেঙে না পড়ে, সে বিষয়েও আমরা কাজ করছিলাম।’

আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত একাধিক শিক্ষার্থীর ভাষ্য, ২০ জুলাই ছিল প্রকাশ্য মিছিলের নয়, বরং নীরব প্রস্তুতির দিন। কারফিউ ও ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতার মধ্যেও রাজশাহীর বিভিন্ন মেসে বসেই আন্দোলনের ভবিষ্যৎ রূপরেখা তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে যে সমন্বিত আন্দোলন সারা দেশে নতুন গতি পায়, তার পেছনে ২০ জুলাইয়ের এই সাংগঠনিক প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

ইতিহাসের পাতায় ২০ জুলাই তাই শুধু কারফিউ, সেনা মোতায়েন, ইন্টারনেট বন্ধ কিংবা প্রাণহানির দিন হিসেবে নয়; বরং সংকটের মধ্যেও সংগঠিত থাকার, বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে তোলার এবং নীরবে আন্দোলনের ভিত শক্ত করার এক গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে থাকবে।