জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উন্মুক্ত হচ্ছে আগস্টের প্রথম সপ্তাহে
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণে গড়ে তোলা হয়েছে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ বা ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাষ্ট্রীয় বাসভবন ‘গণভবন’ রূপান্তর করে এই জাদুঘর নির্মাণ করা হয়েছে। অনেক জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে এটি সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে।
জানা গেছে, জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী ও জুলাইযোদ্ধাদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল দ্রুতই জাদুঘরটি সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। বিভিন্ন সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে এটি উন্মুক্ত করার ঘোষণা এলেও নানা জটিলতায় তা সম্ভব হয়নি। তবে এবার আশার খবর হলো, অবশেষে আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে জাদুঘরটি। আগামী ৫ আগস্ট বা তার আগে–পরে এটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হতে পারে।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে মোবাইল ফোনে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, জাদুঘরটি আগামী ৫ আগস্ট উদ্বোধনের লক্ষ্য নিয়ে প্রস্তুতি চলছে। ৫ আগস্ট অথবা তার এক–দুই দিন আগেও উদ্বোধন হতে পারে। তবে এখনো চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি।
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ‘গণভবন’ রূপান্তর করেই এই জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। এটি বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হবে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা কথিত ‘আয়নাঘর’ বা নির্যাতনকেন্দ্রগুলোকে এই জাদুঘরের শাখা হিসেবে পরিচালনার সুযোগ রাখা হয়েছে। জাদুঘরের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী।
জাদুঘরের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সব ধরনের ভৌত নির্মাণকাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। এখন দর্শনার্থীদের জন্য জাদুঘরটি সম্পূর্ণ প্রস্তুত করার কাজ চলছে। এর মধ্যে রয়েছে দর্শনার্থী সুবিধা সম্প্রসারণ, টিকিটিং সিস্টেম উন্নয়ন এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনা চূড়ান্ত করা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশা, নির্ধারিত সময়ের আগেই এসব প্রস্তুতি সম্পন্ন হবে।
এর আগে গত ১২ মে জাদুঘর পরিদর্শন শেষে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী জানিয়েছিলেন, আগামী ৫ আগস্টের মধ্যেই জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর সবার জন্য উন্মুক্ত করা হবে।
যেভাবে সাজানো হচ্ছে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর
জুলাই স্মৃতি জাদুঘরকে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অভিজ্ঞতাভিত্তিক (এক্সপেরিয়েন্স-বেইজড) জাদুঘর হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। জাদুঘরটি একাধিক থিম্যাটিক গ্যালারিতে বিভক্ত; যেখানে ডিজিটাল ও ভিজ্যুয়াল প্রযুক্তির সমন্বয়ে জুলাই–আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহ দর্শনার্থীদের সামনে জীবন্তভাবে উপস্থাপন করা হবে।
এখানে থাকবে আন্দোলনের ধারাবাহিক ইতিহাস, দেয়ালচিত্র (গ্রাফিতি), পোস্টার, আলোকচিত্র, গুরুত্বপূর্ণ অডিও–ভিডিও ফুটেজ এবং বিভিন্ন তথ্যভিত্তিক প্রদর্শনী। পাশাপাশি শহীদদের ব্যবহৃত পোশাক, তাঁদের লেখা চিঠিপত্র, ব্যক্তিগত স্মারক এবং সে সময়ের সংবাদপত্রের কাটিং সংরক্ষণ করা হয়েছে। বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ঘটনাসহ গণঅভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোও উপস্থাপন করা হবে।
শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য পৃথক পাঠাগার, গবেষণা-সহায়ক উপকরণ এবং ইন্টারঅ্যাকটিভ ডিসপ্লের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি জুলাই আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, গুম-খুন, নির্যাতন এবং সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক দলিল সংরক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ‘গণভবন’ রূপান্তর করেই এই জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। এটি বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হবে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা কথিত ‘আয়নাঘর’ বা নির্যাতনকেন্দ্রগুলোকে এই জাদুঘরের শাখা হিসেবে পরিচালনার সুযোগ রাখা হয়েছে। জাদুঘরের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী।
গত ১০ এপ্রিল সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, জাদুঘরটিকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন, যাতে জাতির ইতিহাস সঠিকভাবে ধারণ করা যায় এবং ভবিষ্যতে কোনো ফ্যাসিবাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি না ঘটে। তিনি জানান, ১৯৭১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস এখানে সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও উন্নয়ন করা হবে।
ইতিহাস সংরক্ষণ ও নিরপেক্ষ উপস্থাপনের প্রত্যাশা
জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা আশা প্রকাশ করেছেন, এটি শুধু একটি স্থাপনা নয়; বরং ইতিহাস, আত্মত্যাগ এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একটি নিরপেক্ষ ও সত্যনিষ্ঠ দলিল হিসেবে গড়ে উঠবে।
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে পদত্যাগ কার সাবেক সহ দপ্তার সম্পাদক সিয়াম আল নুফাইস দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আমার কাছে এই জাদুঘরের স্বীকৃতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু একটি স্থাপনা নয়; এটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আত্মত্যাগ, সংগ্রাম এবং সত্যনিষ্ঠ ইতিহাস সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর জাদুঘরটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে, যা আমাদের মতো জুলাই যোদ্ধাদের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি মুহূর্ত।’
তিনি বলেন, ‘এই জাদুঘরের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো ইতিহাসকে এমনভাবে সংরক্ষণ করা, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বুঝতে পারে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষ কত বড় মূল্য দিয়েছে। আমার বিশ্বাস, এখানে আসা দর্শনার্থীরা শুধু বিভিন্ন নিদর্শন দেখেই ফিরে যাবেন না; তারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস, ফ্যাসিবাদের প্রকৃতি ও তার পরিণতি সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হবেন এবং স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সচেতনতা নিয়ে ফিরবেন।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস ধারণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠছে। তাঁর মতে, একটি জাদুঘরের মূল কাজ হলো সময়, মানুষের চিন্তা, রুচিবোধ, সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সংরক্ষণ করা।
আরও পড়ুন: শেষ বয়সে এসে সম্মান ছিনিয়ে নেওয়া কতটুকু যৌক্তিক? এতে আমার কিছু যায় আসে না
তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জাদুঘরের উদাহরণ টেনে বলা যায়, সেখানে ইতিহাসকে জীবন্তভাবে উপস্থাপন করা হয়। নেদারল্যান্ডসের বিভিন্ন জাদুঘরে ব্যক্তিগত ডায়েরি, ঐতিহাসিক নথি এবং ঘটনাপ্রবাহ অত্যন্ত যত্নসহকারে সংরক্ষণ করা হয়। একইভাবে জার্মানির কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের মতো স্থানগুলোতে ইতিহাসকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা দর্শনার্থীদের বাস্তব অভিজ্ঞতার অনুভূতি দেয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস অত্যন্ত সাম্প্রতিক হওয়ায় এটি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন জানিয়ে তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন নিরপেক্ষভাবে জানতে পারে—কেন এবং কীভাবে এই আন্দোলন ঘটেছিল, কারা এতে অংশ নিয়েছিল এবং এর প্রেক্ষাপট কী ছিল—তা নিশ্চিত করতে হবে। এই ইতিহাসকে কোনো দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে কুক্ষিগত করা যাবে না; বরং এর মূল স্পিরিট অক্ষুণ্ন রেখে সত্যনিষ্ঠভাবে উপস্থাপন করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, জুলাইয়ের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ গণআন্দোলনের ইতিহাস যেন কোনোভাবেই বিকৃত না হয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন এখান থেকে সত্যিকারের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের শিক্ষা নিতে পারে—এটাই হওয়া উচিত এই জাদুঘরের মূল উদ্দেশ্য।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব বলেন, বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। প্রধানমন্ত্রী সম্মতি দিয়েছেন বলে সরকারিভাবে জানানো হয়েছে। সময় ঘনিয়ে আসায় শিগগিরই উদ্বোধনের তারিখ চূড়ান্ত করে গণমাধ্যমকে জানানো হবে।
এর আগে গত ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনে সম্মতি দিয়েছেন এবং তিনি নিজেই উদ্বোধন করবেন। তবে নির্দিষ্ট তারিখ তখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে তিনি জানান।