২৭ জুন ২০২৬, ০৮:৪১

মাজারে দানের কোটি কোটি টাকা যায় কোথায়, কীভাবে খরচ হয় অর্থ?

হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজার  © সংগৃহীত

বাংলাদেশের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে সুপরিচিত সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারে দান হিসেবে আসা অর্থ ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সংরক্ষণের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে মাজারে আসা দান ও অন্যান্য আয়-ব্যয়ের সুনির্দিষ্ট হিসাব সংরক্ষণ না করা এবং অর্থ ব্যয়ের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না থাকার অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

শুক্রবার সিলেটের জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম মাজার পরিদর্শন করে অভিযোগ করেন, কিছু ব্যক্তি মাজারের আয় নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে ব্যয় করেন। তবে মাজার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত খাদেমরা এ অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

এ বিতর্কের মধ্যেই জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মাজারে দান সংগ্রহের জন্য ব্যবহৃত কয়েকটি ডেগ বা বড় পাতিল সিলগালা করা হয়। পাশাপাশি নতুন একটি দানবাক্সও স্থাপন করা হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী এক মাস জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে ওয়াকফ এস্টেট ও মাজার কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ করবে। ঘটনার পর জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমের বদলিও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যদিও তার বদলির সঙ্গে মাজারসংক্রান্ত এ পদক্ষেপের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নয়।

সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সাঈদা পারভীন জানিয়েছেন, সম্প্রতি একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে এবং এখন থেকে মাজারে আসা অর্থ ব্যাংকে সংরক্ষণ করা হবে।

এসব ঘটনার পর মাজারের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশাসনের সিদ্ধান্তের পক্ষে ও বিপক্ষে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য সামনে এসেছে। একপক্ষের দাবি, মাজারে আসা বিপুল পরিমাণ দান কিছু ব্যক্তি নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেন। অন্যদিকে খাদেমদের বক্তব্য, এটি তাদের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদ এবং তারাই দীর্ঘদিন ধরে আয়-ব্যয়ের ব্যবস্থাপনা করে আসছেন। তাদের মতে, এ ব্যবস্থাপনায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই।

তবে এসব বিতর্কের মধ্যেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—মাজারে আসা দানের অর্থ আসলে কোথায় যায়?

শাহজালাল (রহ.) মাজারে এবারই প্রথম দানের ডেগ ও দানবাক্স খুলে প্রকাশ্যে অর্থ গণনার আয়োজন করে জেলা প্রশাসন। গত ২২ জুন অনুষ্ঠিত ওই গণনায় প্রায় সাড়ে ১৭ লাখ টাকা, কিছু বিদেশি মুদ্রা এবং স্বর্ণালংকার পাওয়া যায়। এর আগে ১৮ জুন মাজারে দান সংগ্রহের জন্য ব্যবহৃত বড় তিনটি ডেগ বা পাতিল সিলগালা করা হয়, যাতে সেখান থেকে অর্থ বের করা না যায়। একই সঙ্গে নতুন দানবাক্সও স্থাপন করা হয়। মাত্র চার দিনে সাড়ে ১৭ লাখ টাকা পাওয়ার পর মাজারে বছরে বা নিয়মিতভাবে কী পরিমাণ অর্থ দান আসে, তা নিয়ে আলোচনা আরও জোরদার হয়েছে।

আরও পড়ুন: দেশের কয়েকটি জেলায় টানা ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না আজ

মাজারের একজন খাদেম মুফতি রায়হান উদ্দিন মুন্না বলেন, ‘সাতশ বছর ধরে বংশপরম্পরায় আমরা মাজারের খাদেমের দায়িত্ব পালন করছি। হযরত শাহজালালের সঙ্গে আসা সঙ্গীদের পরিবারের উত্তরাধিকার আমরা। এই দরগা কোনো রাষ্ট্রীয় সম্পদ নয়। মাজারে যে দান আসে, তা এখানকার মেহমানদের সেবা ও ব্যবস্থাপনার কাজেই ব্যয় করা হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখানকার ব্যবস্থাপনা নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে পরিচালনা কমিটি, সিলেটের দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধি এবং খাদেম পরিবারগুলোর সঙ্গে বসে আলোচনা করা যেতে পারে। কিন্তু আমরা সেটি দেখতে পাচ্ছি না।’

মাজার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত খাদেম এবং সিলেটের ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় সাতশ বছর আগে আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব শাহজালাল (রহ.) কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে সিলেটে এসে ইসলাম প্রচার করেছিলেন।

প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, শাহজালাল (রহ.) অবিবাহিত ছিলেন। তবে তার সঙ্গে আসা সঙ্গীরা পরিবার-পরিজন নিয়ে সেখানে বসবাস করতেন। সে সময় থেকেই মানুষ নানা উপঢৌকন ও দান নিয়ে দরগায় আসত এবং শাহজালাল (রহ.) সেগুলো এসব পরিবারের মধ্যে বিতরণ করতেন।পরবর্তীকালে এসব পরিবারই মাজারের খাদেম বা সেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করে। সময়ের সঙ্গে এসব পরিবারের সংখ্যা বেড়ে বর্তমানে প্রায় ৩০০-তে পৌঁছেছে।

সিলেটের ইতিহাস ও ঐতিহ্য গবেষক আব্দুল করিম বলেন, দরগার আশপাশে হোটেল-রেস্তোরাঁ গড়ে ওঠার আগে শত শত বছর ধরে আগত দর্শনার্থীদের দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করতেন খাদেম পরিবারগুলো। সেই ধারাই এখনও চলমান রয়েছে।

মুফতি রায়হান উদ্দিন মুন্নার দাবি, মাজারে আসা অর্থ মাজারের সার্বিক ব্যবস্থাপনাতেই ব্যয় করা হয়।

তার ভাষায়, ‘এখানে ৩০ থেকে ৪০ জন চৌকিদার রয়েছে। প্রতিদিন লঙ্গরখানায় বহু মানুষ খাবার গ্রহণ করেন। রমজানে গণইফতারে অসংখ্য মানুষ অংশ নেয়। বার্ষিক ওরস আয়োজনেও বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। দরগার ভেতরে চারতলা মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে, নতুন ভবনও হয়েছে। এগুলো সরকার করেনি, মাজারের অর্থ থেকেই করা হয়েছে।’

তিনি আরও জানান, মাজারের দৈনন্দিন তত্ত্বাবধান, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ইমাম-মুয়াজ্জিনের বেতনসহ সব ব্যয় মাজারের আয় থেকেই মেটানো হয়।

আব্দুল করিমের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রচলিত নিয়মে একেকটি খাদেম পরিবার একেক দিন মাজার পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে।

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে প্রায় ৩০০ পরিবার রয়েছে। একটি পরিবার বছরে এক দিন দায়িত্ব পালন করে। তারা দিনের আয়ের একটি অংশ মাজার অফিসে জমা দেয় এবং বাকি অংশ নিজেরা গ্রহণ করে। এই অর্থ উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া তাদের আইনি অধিকার বলে তারা মনে করে।’

তবে মাজার ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে সরকার এবং সিটি করপোরেশনও বিভিন্ন সময়ে প্রকল্প গ্রহণ ও অর্থ ব্যয় করে থাকে।

শাহপরাণসহ অন্যান্য মাজারের অর্থ কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয়?

বাংলাদেশে কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদের দানবাক্সে জমা হওয়া অর্থ গণনার খবর প্রায়ই জাতীয় সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয়। ওই অর্থের তত্ত্বাবধান করে জেলা প্রশাসন। তবে বিভিন্ন মাজারে আসা বিপুল পরিমাণ দানের অর্থের ব্যবস্থাপনা সাধারণত সংশ্লিষ্ট খাদেম বা পরিচালনা কমিটির হাতেই থাকে।

এদিকে ওয়াকফ প্রশাসকের কার্যালয় থেকে দেশের সব মাজার, মসজিদ, কবরস্থান ও ঈদগাহকে ওয়াকফ হিসেবে নিবন্ধনের জন্য গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। বর্তমানে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শাহজালাল (রহ.) মাজারের অর্থ ব্যবস্থাপনার জন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হলেও শাহপরাণ (রহ.) মাজারের বিষয়ে এখন পর্যন্ত অনুরূপ কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়নি।

স্থানীয়দের মতে, শাহপরাণ (রহ.) মাজার ওয়াকফ এস্টেট হিসেবে ওয়াকফ নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হয়ে আসছে।

দেশের অনেক মাজারই ওয়াকফ সম্পত্তি হলেও বাস্তবে সেসব প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয় ও ব্যবস্থাপনায় প্রশাসন সরাসরি হস্তক্ষেপ করে না। সাধারণত খাদেম ও পরিচালনা কমিটিই এসব কার্যক্রম তদারকি করে থাকে।

বাগেরহাটের খান জাহান আলী (রহ.) মাজারের খাদেম ফকির তারিকুল ইসলাম এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে শুধু বলেন, ‘এখানে পরিচালনা কমিটি রয়েছে। এর বাইরে আমার আর কিছু বলার নেই।’

উল্লেখ্য, স্থানীয় জেলা প্রশাসক পদাধিকারবলে ওই পরিচালনা কমিটির সভাপতি।

তবে এসব মাজারে নগদ অর্থ ছাড়াও মানুষ গরু, ছাগল, মুরগিসহ বিভিন্ন ধরনের দান করে থাকে। কিন্তু এসব দানের ব্যবস্থাপনা কীভাবে হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো জাতীয় নীতিমালা নেই। স্থানীয় প্রশাসনও বিষয়গুলোকে স্পর্শকাতর বিবেচনা করে সাধারণত হস্তক্ষেপে অনাগ্রহী থাকে।

পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জের ইয়ারউদ্দিন খলিফা (রহ.) মাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. শহিদ মল্লিক জানান, সারাদেশে তাদের ৩৫ থেকে ৪০ হাজার দানবাক্স রয়েছে। মানুষের দান ও মানতই মাজারটির প্রধান আয়ের উৎস। এছাড়া বার্ষিক ওরসের সময় দানের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, এভাবে বছরে প্রায় তিন কোটি টাকা দান পাওয়া যায়। নব্বইয়ের দশকে মাজারটি পুরোপুরি ওয়াকফ এস্টেটের আওতায় আনা হয়। বর্তমানে জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে একটি কমিটি এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করছে।

মো. শহিদ মল্লিক জানান, মাজারটিতে একটি মাদ্রাসা ও মসজিদ রয়েছে। সেখানে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মচারী ও দুস্থ মানুষ মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ মানুষের তিন বেলার খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি মসজিদের ইমাম, মাদ্রাসার শিক্ষক, কর্মচারীদের বেতন এবং উন্নয়নমূলক কাজের ব্যয়ও এ তহবিল থেকেই নির্বাহ করা হয়।

শাহজালাল ও অন্যান্য মাজার কি ওয়াকফ সম্পত্তি?

বাংলাদেশ সরকারের ওয়াকফ প্রশাসক সাফিজ উদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, ‘শাহজালাল (রহ.) মাজার তালিকাভুক্ত ওয়াকফ সম্পত্তি।বাংলাদেশে যত মাজার, ঈদগাহ, কবরস্থান ও মসজিদ রয়েছে, সবই বাই ডিফল্ট ওয়াকফ। ১৯১৩ সালের আইন অনুযায়ী এগুলো ওয়াকফ হিসেবে নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক। এ বিষয়ে আমাদের একটি গণবিজ্ঞপ্তিও রয়েছে।’

তিনি জানান, ওয়াকফ সাধারণত তিন ধরনের—ওয়াকফ ফি লিল্লাহ, ওয়াকফ আলাল আওলাদ এবং ব্যবহারিক ওয়াকফ।

কোনো ব্যক্তি যখন কোনো সম্পদের মালিকানা আল্লাহর উদ্দেশ্যে দলিলের মাধ্যমে দান করেন, তখন তা ওয়াকফ ফি লিল্লাহ হিসেবে বিবেচিত হয়। আবার কেউ যদি সম্পদের আয় থেকে একটি অংশ উত্তরসূরিদের জন্য নির্ধারণ করে দেন, সেটি ওয়াকফ আলাল আওলাদ। অন্যদিকে কোনো মুসলিম ব্যক্তি ঈদগাহ, কবরস্থান বা মসজিদ প্রতিষ্ঠা করলে সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যবহারিক ওয়াকফ হিসেবে গণ্য হয়।

সাফিজ উদ্দিন আহমেদের মতে, শাহজালাল (রহ.) মাজার এ তিন ধরনের বৈশিষ্ট্যের আওতায়ই ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।

উল্লেখ্য, ওয়াকফ সম্পত্তির তদারকি ও ব্যবস্থাপনার জন্য সরকার ওয়াকফ প্রশাসক নিয়োগ করে থাকে। ওয়াকফ সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ‘মুতওয়াল্লি’ বলা হয়। তাকে মৌখিকভাবে কিংবা ওয়াকফ দলিল বা চুক্তির মাধ্যমে দায়িত্ব দেওয়া হয়ে থাকে।

তবে গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন জানিয়েছিলেন, ২০১৪ সালে ধর্ম মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির হিসাবে ওয়াকফ প্রশাসকের কার্যালয়ে নিবন্ধিত সম্পত্তির মধ্যে ৮৫ হাজার ৫৭২ একর ভূমি বেহাত হওয়ার তথ্য রয়েছে। এসব সম্পত্তি উদ্ধারে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে নিবন্ধিত ওয়াকফ এস্টেটের সংখ্যা প্রায় ২২ হাজার। এসব এস্টেটের অধীনে মোট জমির পরিমাণ ৪ লাখ ২৪ হাজার ৭৪ একর।