গনি মিয়ার হাট, মীর কাদিমের গরু ও পুরান ঢাকার কোরবানীর ঈদ
ঢাকার আকাশে তখনও ভোর পুরোপুরি নামেনি। বুড়িগঙ্গার জল ধোঁয়াটে কুয়াশায় ঢাকা। রহমতগঞ্জের দিকে ঢোলের শব্দ ভেসে আসছে। ঢুলিরা গাইছে, ‘ধার করো, কর্জ করো, গনি মিয়ার হাট ধরো।’ পুরান ঢাকার সরু গলিতে গলিতে তখন ঈদের আগমনী উত্তেজনা। কার বাড়িতে কেমন গরু উঠেছে, কার উঠানে এসেছে মীর কাদিমের ধবধবে সাদা ষাঁড়, তা দেখতে ছেলেরা ছুটে বেড়াচ্ছে মহল্লা থেকে মহল্লায়। যেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কোনো উপন্যাসের দৃশ্য, যেখানে শহর মানেই কেবল ইট-পাথরের নগর নয়, বরং স্মৃতি, গন্ধ, ভোজন আর মানুষের সম্পর্কের এক জীবন্ত জগৎ। এমনই ছিল পুরান ঢাকার কোরবানীর ঈদের অনুসঙ্গ। নানা ধরনের বিবর্তন, কোরবানীতে গরু নিষিদ্ধসহ নানা সংযমের মধ্যে পাড় হতে হয়েছে পুরান ঢাকাকে।
তবে পুরান ঢাকা কখনোই নিছক সংযমের শহর ছিল না। এটি ছিল রুচি, আভিজাত্য ও উৎসবের শহর। নাজির হোসেন তার ‘কিংবদন্তির ঢাকা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন রহমতগঞ্জের বিখ্যাত ‘গনি মিয়ার হাট’-এর কথা। নবাব খাজা আবদুল গনির নামানুসারে প্রতিষ্ঠিত এই হাট ছিল পুরান ঢাকার বনেদি মুসলমানদের কোরবানির কেন্দ্র। আর এই হাটের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল মুন্সিগঞ্জের মীর কাদিমের ধবল গরু।
মীর কাদিমের গরু যেন কেবল গরু নয়, পুরান ঢাকার আভিজাত্যের প্রতীক। শরীরের প্রতিটি পশম তুষারের মতো সাদা। চোখের পাপড়ি পর্যন্ত ধবধবে শুভ্র। এই গরু নিয়ে পুরান ঢাকার মানুষের আবেগ ছিল কিংবদন্তির মতো। বহু বনেদি পরিবার ঈদের আগেই মীরকাদিমে গিয়ে গরু পছন্দ করে বায়না দিয়ে আসতেন। পরে নির্দিষ্ট দিনে সেই গরু পৌঁছে যেত নবাবপুর, নাজিরাবাজার, ফরাশগঞ্জ কিংবা লালবাগের উঠানে।
শুধু সৌন্দর্য নয়, এই গরুর মাংসের স্বাদ নিয়েও ছিল আলাদা খ্যাতি। খৈল, ভুষি, বুট, খেসারি, গমের চূর্ণ আর মিষ্টি গুড় খাইয়ে বড় করা হতো এসব গরু। ফলে মাংস হতো নরম, তুলতুলে এবং সুগন্ধি। সাদ উর রহমান তার ‘ঢাকাই খাবার ও খাদ্য সংস্কৃতি’ বইয়ে লিখেছেন, পুরান ঢাকার ভোজনরসিকদের কাছে মীরকাদিমের গরু ছিল কোরবানির প্রথম পছন্দ।
তবে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, কোরবানির ঈদকে আজ আমরা যতটা জাঁকজমকের উৎসব হিসেবে দেখি, ইতিহাস থেকে জানা যায়, বাংলায় এর পথচলা ততটা সরল ছিল না। অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন তার ‘বাংলাদেশের উৎসব’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘আজকে আমরা যে ধুমধামের সঙ্গে ঈদ-উল-আজহা পালন করি, তা চল্লিশ-পঞ্চাশ বছরের ঐতিহ্যমাত্র।’ তার আগে এই ভূখণ্ডে ঈদুল আজহা পরিচিত ছিল ‘বকরি ঈদ’ নামে। কারণ, গরু কোরবানি ছিল বিরল, কখনো কখনো নিষিদ্ধও।
আবুল মনসুর আহমদ তার আত্মজীবনী ‘আত্মকথা’য় লিখেছেন, ‘বক্রা ঈদে গরু কোরবানি কেউ করিত না। কারণ জমিদারের তরফ হইতে উহা কড়াকড়িভাবে নিষিদ্ধ ছিল।’ ফলে বাংলার মুসলমানদের কোরবানি বলতে ছিল খাসি, ছাগল কিংবা বকরি। সেই থেকেই ‘বকরি ঈদ’ নামটির জন্ম।
মুঘল আমলেও এই অঞ্চলে গরু কোরবানি খুব বিস্তৃত ছিল না। ইতিহাসবিদ আহমদ হাসান দানী তার ‘উধপপধ: অ জবপড়ৎফ ড়ভ ওঃং ঈযধহমরহম ঋড়ৎঃঁহবং’ গ্রন্থে মুঘল ঢাকার সামাজিক বিন্যাস তুলে ধরতে গিয়ে দেখিয়েছেন, ধর্মীয় সহাবস্থান বজায় রাখতে শাসকেরা নানা বিষয়ে সতর্ক ছিলেন। সম্রাট আকবরের আমলে গরু জবাই নিরুৎসাহিত করার প্রসঙ্গও উঠে আসে ঐতিহাসিক আবুল ফজলের লেখায়। ফলে বাংলার মুসলমান সমাজে কোরবানির ঈদ দীর্ঘদিন ধরে ছিল অপেক্ষাকৃত সংযত ধর্মীয় আয়োজন।
ঈদের সপ্তাহখানেক আগে থেকেই শুরু হতো উৎসবের আমেজ। শিল্পপতি আনোয়ার হোসেন তার আত্মজীবনী ‘আমার সাত দশক’-এ লিখেছেন, ‘ঈদের তিন-চার দিন আগে থেকে দাবড়ে বেড়াতাম পুরো মহল্লায়, কে কত বড় আর সুন্দর গরু কিনল, দেখার জন্য।’ তখনকার ঢাকায় একটি বড় গরুর দাম ছিল চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ টাকা। কিন্তু গরুর আকারের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল তার ‘বংশ’। মীরকাদিমের গরু হলে তো কথাই নেই।
ঈদের সকালেও ছিল নিজস্ব ঐতিহ্য। পুরান ঢাকার বহু পরিবার ঈদের নামাজ শেষে সঙ্গে সঙ্গে কোরবানি দিত না। কেউ বিকেলে, কেউবা পরদিন সকালে দিতেন। কিন্তু মাংস বিতরণের রেওয়াজ ছিল অত্যন্ত আন্তরিক। গরুর পেছনের রান হাতের নকশা করা চাদরে ঢেকে পাঠানো হতো মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে। আবার সেখান থেকেও আসত আরেকটি রান। সম্পর্কের এই আদান-প্রদান ছিল ঢাকাই সংস্কৃতির এক অনন্য সৌন্দর্য।
খাবারের আয়োজনে পুরান ঢাকা ছিল অতুলনীয়। বটি কাবাব, কলিজি ভুনা, তিল্লি, গুরদা, নেহারি, কোফতা, শিক কাবাব, রেজালা, কোরমা, কালিয়া, বাকরখানির ঝুরা মাংস, সবকিছু মিলিয়ে যেন এক চলমান খাদ্যসভ্যতা। হাকিম হাবিবুর রহমান তার ‘ঢাকা: পঞ্চাশ বছর আগে’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘ঢাকায় যেভাবে কোফতা তৈরি হয়, তা অন্য কোথাও খুব কমই দেখা গেছে।’
ঈদের তৃতীয় দিনের শিক কাবাব ছিল আলাদা আনন্দ। পরিবারের কর্তারাই তখন বাবুর্চি। কেউ মসলা বেশি দিচ্ছেন, কেউ শিকে ঠিকমতো গাঁথতে না পেরে আগুনে ফেলে দিচ্ছেন মাংস। কেউ পোড়া, কেউ কাঁচা কাবাব নিয়ে হাসিঠাট্টা। এই উৎসব ছিল একান্ত পারিবারিক, অথচ মহল্লাজুড়ে তার আবহ ছড়িয়ে থাকত।
আজকের প্রজন্ম হয়তো কল্পনাও করতে পারবে না, একসময় ফ্রিজ ছাড়া কীভাবে এত মাংস সংরক্ষণ করা হতো। সাদ উর রহমান লিখেছেন, গরুর রান ও সিনা ঝুলিয়ে রাখা হতো সারা রাত। এরপর গলানো চর্বির মধ্যে মাংস ডুবিয়ে রাখা হতো। কখনো কখনো সেই মাংস মহররম পর্যন্ত টিকে যেত। জাহানারা ইমাম তার ‘অন্যজীবন’ স্মৃতিকথায় লিখেছেন, প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা বিশাল ডেকচিতে মাংস জ্বাল দেওয়া ছিল বাড়ির নারীদের বড় কাজ।
ঈদ ছিল কেবল কোরবানি নয়, সামাজিক মিলনের উপলক্ষও। ধোলাইখালে নৌকাবাইচ হতো। নারিন্দা, চকবাজার, সিদ্দিকবাজার, আলুবাজারে বসত মেলা। যাত্রাপালা, সিনেমা, নাটক, ঢাকাইয়া চুটকি, সব মিলিয়ে ঈদ ছিল এক সর্বজনীন নগর উৎসব। হিন্দু-মুসলমানের সহাবস্থানও ছিল ঈদের সৌন্দর্যের অংশ। পুরান ঢাকার প্রবীণদের স্মৃতিতে এখনও আছে, কোরবানির সকালে মুসলমানেরা হিন্দু প্রতিবেশীর বাড়িতে সেমাই পাঠাতেন, আর পূজার সময় সেখান থেকে আসত নাড়ু-মিষ্টি।
কিন্তু সময় বদলেছে। কোরবানির ঈদ এখন অনেকটাই কর্পোরেট উৎসব। পশুর হাটে আলোর ঝলকানি, বিশাল ব্যানার, স্পন্সরশিপ, অনলাইন কোরবানি, লাইভ স্ট্রিমিং, সবকিছু মিলিয়ে উৎসব যেন আরও বড় হয়েছে, অথচ কোথাও কোথাও ফাঁকা হয়ে গেছে তার প্রাণ। আগে যে ঈদে মহল্লা একসঙ্গে হাসত, এখন সেখানে শব্দদূষণ আর বিচ্ছিন্নতার দেয়াল।
সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো ঐতিহ্যের জায়গাতেই। মীরকাদিমের ধবল গরুর সংখ্যাও কমে এসেছে ভয়াবহভাবে। একসময় যেখানে শত শত খামারি ছিলেন, এখন আছেন হাতে গোনা কয়েকজন। খাদ্যের দাম বেড়েছে, শ্রমিক কমেছে, আর কৃত্রিম মোটাতাজাকরণের প্রতিযোগিতায় হারিয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিকভাবে লালন করা সেই ধবধবে ঐতিহ্য।
তবু এখনও ঈদের আগে পুরান ঢাকার কোনো গলিতে দাঁড়ালে হয়তো শোনা যায় বহু পুরোনো সেই ডাক। হয়তো কোনো বৃদ্ধ এখনও নাতিকে গল্প শোনান গনি মিয়ার হাটের। হয়তো কোথাও এখনও আগুনে ঝলসে নেওয়া কলিজার গন্ধে ভরে ওঠে উঠান। ইতিহাস আসলে পুরোপুরি হারায় না, শুধু একটু একটু করে মানুষের ভিড়ের আড়ালে সরে যায়।
মুনতাসীর মামুন তার ‘ঢাকা: স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী’ বইয়ে লিখেছিলেন, ঢাকা এক স্মৃতির শহর, যেখানে হারিয়ে যাওয়ার মধ্যেও টিকে থাকে অতীতের ছায়া। কোরবানির ঈদও তেমনই। আজকের ঝলমলে নগরে হয়তো আর দেখা যায় না মীরকাদিমের সারি সারি ধবল গরু, ঢোল পিটিয়ে মানুষ ডাকার সেই ঢুলি, কিংবা ঈদের মেলার জনারণ্য। কিন্তু পুরান ঢাকার ভেজা দেয়াল, সরু গলি আর পুরোনো বারান্দাগুলো এখনও যেন নিঃশব্দে বলে যায়, এই শহরে একসময় ঈদ মানে ছিল মানুষে মানুষে সম্পর্ক, আভিজাত্যের সঙ্গে মমতা, আর উৎসবের ভেতর ইতিহাসের দীর্ঘশ্বাস।
লেখক: শিক্ষক, বাংলাদেশ স্টাডিজ এন্ড জিওগ্রাফি, মানারাত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল কলেজ