১৮ মে ২০২৬, ১১:১৪

জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের বিশেষ ১০ আমল

শায়খ আহমাদুল্লাহ  © সংগৃহীত

পবিত্র জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনকে ইসলামে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ সময় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জনপ্রিয় ইসলামিক স্কলার ও আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেছেন, এই দশক শুধু কোরবানির পশু কেনাবেচার সময় নয়; বরং এটি ইবাদত, আমল ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের বিশেষ মৌসুম।

তিনি বলেন, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জিলহজের প্রথম ১০ দিনের নেক আমল আল্লাহর কাছে অন্য যেকোনো সময়ের আমলের চেয়ে বেশি প্রিয়। এমনকি অন্য সময়ের জিহাদও এই সময়ের নেক আমলের সমান মর্যাদাপূর্ণ নয়, তবে সেই ব্যক্তির কথা ভিন্ন, যে আল্লাহর পথে জান ও মাল কোরবানি করে ফিরে আসে না।

শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, কোরআন-হাদিস ও সালাফে সালেহিনদের জীবনে জিলহজের প্রথম ১০ দিনের গুরুত্ব ব্যাপকভাবে বর্ণিত হলেও সমাজে এ সময়ের ইবাদত নিয়ে মানুষের অবহেলা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। বর্তমানে মানুষ শুধু কোরবানির পশুর হাট ও কেনাবেচার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে। অথচ সাহাবায়ে কেরাম এই সময় ইবাদতে এত বেশি মশগুল থাকতেন যে বাজার-ঘাটেও তাদের আমলের প্রভাব দেখা যেত।

তিনি উল্লেখ করেন, সাহাবি আবু হুরায়রা (রা.)-সহ অনেক সাহাবি জিলহজের প্রথম দশকে বাজারে যেতেন তাকবির পাঠ করার উদ্দেশ্যে, যাতে সাধারণ মানুষ এই সময়ের ইবাদতের গুরুত্ব স্মরণ করতে পারে। তারা উচ্চারণ করতেন— ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ।’

আরও পড়ুন: সব মুসলিম দেশের ঈদ ২৭ মে হলেও বাংলাদেশে কেন ২৮ মে?

শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে জিলহজের প্রথম ১০ দিন ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও মার্কেটে মৃদু ভলিউমে তাকবির বাজানোর সংস্কৃতি রয়েছে। এর উদ্দেশ্য মানুষকে আল্লাহর জিকির ও এই সময়ের ইবাদতের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া।

তিনি বলেন, বর্তমান সমাজে এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে যে কেউ চায়ের দোকান বা বাজারে দাঁড়িয়ে তাকবির পাঠ করলে মানুষ তাকে অস্বাভাবিকভাবে দেখে। অথচ আল্লাহর জিকিরই হওয়া উচিত ছিল সবচেয়ে স্বাভাবিক বিষয়।

তিনি আরও বলেন, কোরবানির পশুর হাটে গান-বাজনা চালানোর সংস্কৃতি অত্যন্ত দুঃখজনক। কারণ কোরবানি একটি ইবাদত। সেই ইবাদতকেন্দ্রিক আয়োজনে হারাম মিউজিকের পরিবর্তে তাকবির ধ্বনি প্রচার করা উচিত। তিনি এ বিষয়ে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনারও আহ্বান জানান।

জিলহজের প্রথম ১০ দিনের ১০টি বিশেষ আমলের কথা তুলে ধরে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন

প্রথমত, বেশি বেশি নেক আমল করতে হবে। ফরজ নামাজ যথাসম্ভব জামাতের সঙ্গে আদায়, নফল নামাজ, তাহাজ্জুদ, ইশরাক, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকারসহ সব ধরনের ভালো কাজ বাড়িয়ে দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, সব ধরনের গুনাহ ও পাপ কাজ থেকে বিশেষভাবে বেঁচে থাকতে হবে। তিনি বলেন, হারাম কাজ সারা বছরই হারাম, তবে এই মর্যাদাপূর্ণ সময়ে তা আরও ভয়াবহ।

তৃতীয়ত, বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করতে হবে। বিশেষ করে তাকবির, তাহমিদ ও তাহলিল পাঠের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

চতুর্থত, যাদের হজ করার তৌফিক হয়েছে তারা হজ পালন করবেন।

পঞ্চমত, সামর্থ্যবানদের জন্য কোরবানি করা গুরুত্বপূর্ণ আমল। তিনি বলেন, কোরবানি করার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি না করার ব্যাপারে হাদিসে কঠোর সতর্কবার্তা এসেছে।

ষষ্ঠত, যারা কোরবানি করার নিয়ত করবেন তারা জিলহজের চাঁদ ওঠার পর থেকে কোরবানি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত চুল, নখ ও শরীরের অবাঞ্ছিত পশম কাটা থেকে বিরত থাকবেন।

সপ্তমত, দিন-রাত বেশি বেশি তাকবির, তাহমিদ ও তাহলিল পাঠ করতে হবে। তিনি বলেন, ঘর-বাড়ি, বাজার, যানবাহন ও বিভিন্ন স্থানে আল্লাহর জিকির ছড়িয়ে দিতে হবে।

অষ্টমত, আইয়ামে তাশরিক তথা ৯ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর তাকবিরে তাশরিক পাঠ করতে হবে।

নবমত, ৯ জিলহজ তথা আরাফার দিনের রোজা রাখতে হবে। তিনি বলেন, এই রোজার মাধ্যমে এক বছর আগের এবং এক বছর পরের সগিরা গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। অনেক আলেম ১ থেকে ৯ জিলহজ পর্যন্ত রোজা রাখাকেও মুস্তাহাব বলেছেন।

দশমত, ঈদের দিনের সুন্নতগুলো যথাযথভাবে পালন করতে হবে।

শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, রমজানের পর ইবাদতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো জিলহজের প্রথম ১০ দিন। তাই এই সময়কে কেবল পশু কেনাবেচার মৌসুম না বানিয়ে ইবাদত ও আমলের মৌসুমে পরিণত করতে হবে। তিনি সবাইকে নিজেদের পাশাপাশি অন্যদেরও এ বিষয়ে সচেতন করার আহ্বান জানান।