১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫:২০

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগে আইনি সেবা সহজীকরণের তরুনদের উদ্যোগ

লেক্স গ্লোভাল বিডি  © টিডিসি সম্পাদিত

বাংলাদেশের জটিল ও এনালগ আইনি সেবাকে প্রযুক্তির আওতায় এনে সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক নতুন প্রযুক্তি উন্মুক্ত করেছেন দুই তরুণ উদ্ভাবক। গত ১৫ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে প্ল্যাটফর্মটির সেবা চালু করা হয়। বর্তমানে গুগল প্লে স্টোরে অ্যাপের পাশাপাশি নিজস্ব ওয়েবসাইট ও ভেরিফাইড ফেসবুক পেজের মাধ্যমে সেবা প্রদান করা হচ্ছে।

এই প্রকল্পের মূল পরিকল্পনাকারী নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের ২৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ও এআই গবেষক মোহাম্মদ নাহিদ আলম জানান, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থীদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে প্রথম আইডিয়াটি মাথায় আসে। পরবর্তীতে ব্যক্তিগত কাজে থানা ও আদালতে দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে চরম ভোগান্তি ও দালাল চক্রের হাতে পড়ার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি এটি বাস্তবায়নে উদ্যোগী হন।

নাহিদ আলম জানান, থানায় একটি সাধারণ জিডি করতে গেলেও বাইরে থেকে ১০০ টাকা দিয়ে কম্পিউটারে টাইপ করে আনতে বলা হয়। অন্যদিকে আদালতে অভিজ্ঞ উকিল খুঁজে পাওয়া কঠিন, সেখানেও থার্ড পারসন বা দালালদের আধিপত্য। এতে যেমন সাধারণ মানুষের অর্থ ও সময় নষ্ট হয়, তেমনি দক্ষ আইনজীবীরাও সঠিক ক্লায়েন্ট পাওয়া থেকে বঞ্চিত হন। এসব সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যেই ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তারা মাঠপর্যায়ে জরিপ শুরু করেন।

নাহিদ আলমের নেতৃত্বে ৯ সদস্যের একটি সার্ভে টিম দেশের প্রায় ৭টি আদালত নিজে ঘুরে আইনজীবী ও ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে ডাটা সংগ্রহ করেন। টিমে আইন বিভাগের ৪ জন শিক্ষার্থী ছাড়াও রাজশাহী অঞ্চলের সমন্বয়ের জন্য বরেন্দ্র ইউনিভার্সিটির আবির মাহমুদ প্রীতম এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের দূরবর্তী কোর্ট পরিদর্শনের সুবিধার জন্য ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির শাপলা মনি সহায়তায় যুক্ত ছিলেন।

সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে থার্ড-পার্টি কোনো এআই প্রযুক্তি ব্যবহার না করে সম্পূর্ণ নিজস্ব ডিজাইনে মেশিন লার্নিং ও এআই প্রোগ্রামটি ট্রেন ও ডেভেলপ করা হয়েছে। তাদের তৈরি এই এআই মডেলের বেঞ্চমার্ক জেমিনি প্রো কিংবা ৩.৭ ফ্লাশ এর সমকক্ষ এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তির সাথে টক্কর দেওয়ার মতো বলে দাবি করেন উদ্ভাবকরা 

এই প্ল্যাটফর্মটি মূলত সাধারণ জনগণ, শিক্ষার্থী ও আইনজীবীদের জন্য একটি ডিজিটাল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করবে। এমনকি জরুরি পরিস্থিতিতে মোবাইলের পাওয়ার বাটনে ডাবল ক্লিক করলেই এআই নির্দেশ দেবে ঐ মুহূর্তে আইনজীবীর কাছে যাওয়া উচিত নাকি পুলিশের সহায়তা নেওয়া উচিত।

এই প্রযুক্তির নেপথ্যে নাহিদের পাশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন তার বন্ধু মোহাম্মদ রায়হান, যিনি যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যোবিপ্রবি) পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী। তিনি প্ল্যাটফর্মটির কারিগরি উন্নয়ন, আইপি অ্যাড্রেস সেটআপ ও ডেপুটি ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

আরও দেখুন: ব্র্যাকে দুই পদে চাকরি, আবেদন ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত

নিজের যুক্ত হওয়ার বিষয়ে মোহাম্মদ রায়হান জানান, তার পরিবারের সদস্য বা আত্মীয়রা যখন জমিজমা সংক্রান্ত ঝামেলায় কোর্টে গিয়ে মাসের পর মাস ভোগান্তি পোহাতেন, কিংবা সামান্য একটা জিডি প্রিন্ট করতে কম্পিউটারের দোকানে ৫ টাকার কালির জায়গায় ১০০ টাকা দাবি করা হতো তখন থেকেই তার মনে হয়েছিল এই ব্যবস্থার পরিবর্তন দরকার। অন্য ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থী হলেও বন্ধু নাহিদের চমৎকার আইডিয়া শুনে ও তার সহায়তায় কোডিং, এপিআই ইন্টিগ্রেশন থেকে শুরু করে বাগ ফিক্সিংয়ের সব টেকনিক্যাল কাজ শিখে দুই বন্ধু মিলে পুরো প্রজেক্টটি লাইভে আনতে সক্ষম হয়েছেন।

নতুন এই এআই প্রযুক্তি সম্পর্কে ইতিবাচক মতামত দিয়েছেন উত্তরাঞ্চলের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞ আইনজীবীরা। রাজশাহী কোর্টের আইনজীবী মামুনুর রশীদ জন বলেন, ‘সাধারণ মানুষ প্রায়শই আইনি জটিলতা ও সঠিক তথ্যের অভাবে বিভ্রান্ত হন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর এই প্রযুক্তি সাধারণ মানুষকে যেমন প্রাথমিক আইনি গাইডেন্স দেবে, তেমনি আদালত প্রাঙ্গণে দালালদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে বিচারপ্রার্থীদের সময় ও অর্থ বাঁচাবে।’

একই অভিমত ব্যক্ত করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ কোর্টের আইনজীবী মোঃ ওসমান গনী জানান, ডিজিটাল যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আইনি ব্যবস্থার এই আধুনিকায়ন অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এটি প্রযুক্তি ব্যবহারে অনভ্যস্ত সাধারণ নাগরিক ও নবীন আইনজীবীদের আইনি তথ্য ও নথিপত্র ব্যবহারে বড় ধরনের সহায়তা প্রদান করবে।

এদিকে নাটোর কোর্টের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘বিচারপ্রার্থী মানুষের কাছে আইনি সেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে। এই প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে আইনি সহায়তার ক্ষেত্র আরও স্বচ্ছ ও গতিশীল হবে।’

উদ্যোক্তারা জানান, উন্মুক্ত করার পর থেকেই প্ল্যাটফর্মটিতে অত্যন্ত ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। তাদের এই উদ্ভাবন। দেশের প্রথম আইনি প্রযুক্তি হিসেবে সাধারণ মানুষকে এতে অভ্যস্ত করতে কিছুটা সময় লাগলেও এটি দেশের আইনি সেবায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।