৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২:৫৯

ইইই-তে কমছে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ, প্রযুক্তির পরিবর্তনে বদলাচ্ছে কর্মক্ষেত্র

ইইই  © প্রতীকী ছবি

একসময় প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের পছন্দের শীর্ষ বিষয়গুলোর একটি ছিল ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই), শিক্ষার্থীদের কাছে যা ‘ট্রিপল ই (EEE)’ নামে পরিচিত। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিকস, শিল্পকারখানা, যোগাযোগব্যবস্থা ও বিভিন্ন প্রযুক্তিগত অবকাঠামোয় এ বিষয়ের প্রকৌশলীদের দীর্ঘদিনের চাহিদা রয়েছে। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনে প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের পছন্দেও পরিবর্তন এসেছে। কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসসি), সফটওয়্যার, ফ্রিল্যান্সিং, ডেটা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-নির্ভর প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ কম্পিউটারভিত্তিক বিষয়ে ঝুঁকছে। এতে কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইইই বিষয়ে শিক্ষার্থী ভর্তিতে চাপ তৈরি হয়েছে।

যদিও সব বিশ্ববিদ্যালয়ে চিত্র একই নয়। বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইইই-তে ভর্তি কমেছে,তবে কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ভর্তি বেড়েছে। ফলে ইইই-এর প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়ার পেছনে শিক্ষার্থীদের পছন্দের পরিবর্তনের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান, ল্যাব, শিক্ষক, পরিচালন ব্যয় এবং চাকরির বাজারের ধারণাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। দেশের কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং ইইই বিভাগের প্রধানদের সঙ্গে কথা বলে ইইই নিয়ে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

এআই-এর দ্রুত বিকাশকে ইইই-এর জন্য হুমকি হিসেবে দেখার কারণ নেই। প্রযুক্তির বিকাশে একটি বিষয় অন্য বিষয়কে পুরোপুরি সরিয়ে দেয় না বরং একাধিক প্রযুক্তি একসঙ্গে কাজ করে নতুন প্রযুক্তি তৈরি করে।— অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম, উপাচার্য, এআইইউবি

সিএসই’র উত্থানে ইইই-তে আগ্রহ কমছে?
সিএসইর উত্থানে ইইই বিভাগের প্রতি শিক্ষার্থীদের ভর্তি কিছুটা কমেছে রাজধানীর অন্যতম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটিতে। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম আর কবির দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, কম্পিউটার সায়েন্স আলাদা বিষয় হিসেবে ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চাহিদা অনেক বেশি ছিল। পরে ইলেকট্রিক্যালের সঙ্গে ইলেকট্রনিকস যুক্ত হয়ে ‘ইইই’ চালু হয়। এরপর কম্পিউটার সায়েন্স দ্রুত বিকশিত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের আগ্রহের বড় একটি অংশ ওই দিকে চলে যায়।

কোভিড-পরবর্তী সময়ে এই পরিবর্তন আরও তীব্র হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। কোভিডের আগে বাসা থেকে অনলাইন ক্লাস, অনলাইন কেনাকাটা কিংবা বিভিন্ন ডিজিটাল সেবার ব্যবহার এতটা ব্যাপক ছিল না। মহামারির সময় ও পরবর্তী সময়ে এসব কর্মকাণ্ড দ্রুত বাড়ে। ফলে আইটি খাতে ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটে এবং কম্পিউটারভিত্তিক বিষয়গুলোর চাহিদাও বেড়ে যায়। এর সঙ্গে এআই যুক্ত হওয়ায় এই প্রবণতা আরও শক্তিশালী হয়েছে বলেও মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, কোনো প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে সেই প্রযুক্তিকে ঘিরে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রও সম্প্রসারিত হয়। উচ্চশিক্ষার একটি বড় উদ্দেশ্য যেহেতু সমাজ ও শিল্পখাতের প্রয়োজন মেটানো, তাই শিক্ষার্থীদের বিষয় পছন্দেও তার প্রভাব পড়ে।

ইইই’র প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যাচ্ছে এমনটি মনে করেন না ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম আর কবির। তাঁর মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণের মতো মৌলিক ক্ষেত্রে ইইই-এর প্রয়োজন সবসময়ই থাকবে। তবে এসব ক্ষেত্রে চাহিদা এখন অনেকটা স্থিতিশীল।

সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, ‘মানুষের বসবাস ও অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন যতদিন থাকবে, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রয়োজনও থাকবে। কিন্তু একটি পর্যায়ের পর এ খাতের চাহিদা স্থিতিশীল হয়ে যায়। বিপরীতে প্রযুক্তির নতুন ব্যবহার তৈরি হওয়ায় কম্পিউটারভিত্তিক খাতে দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটছে।’

স্মার্ট হোম প্রযুক্তির উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন এমন ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে, যার মাধ্যমে বাসায় না থেকেও ঘরের লাইট বা বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালু আছে কি না জানা যায়। এমনকি স্মার্ট রেফ্রিজারেটরও কোন পণ্য শেষ হয়ে গেছে বা কী কী কিনতে হবে, সে বিষয়ে তথ্য দিতে পারে। মানুষের দৈনন্দিন জীবন যত প্রযুক্তিনির্ভর হচ্ছে, আইটি খাতের চাহিদাও তত বাড়ছে।’ শিক্ষার্থীদের একটি অংশের মধ্যে ইইই নিয়ে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে বিষয়টি পড়তে তুলনামূলক বেশি পরিশ্রম করতে হয়। এর কারণেও শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে বলে মনে করা হয়।

কম্পিউটার সায়েন্স আলাদা বিষয় হিসেবে ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চাহিদা অনেক বেশি ছিল। পরে ইলেকট্রিক্যালের সঙ্গে ইলেকট্রনিকস যুক্ত হয়ে ‘ইইই’ চালু হয়। এরপর কম্পিউটার সায়েন্স দ্রুত বিকশিত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের আগ্রহের বড় একটি অংশ ওই দিকে চলে যায়। কোভিড-পরবর্তী সময়ে এই পরিবর্তন আরও তীব্র হয়েছে। কোভিডের আগে বাসা থেকে অনলাইন ক্লাস, অনলাইন কেনাকাটা কিংবা বিভিন্ন ডিজিটাল সেবার ব্যবহার এতটা ব্যাপক ছিল না। মহামারির সময় ও পরবর্তী সময়ে এসব কর্মকাণ্ড দ্রুত বাড়ে। ফলে আইটি খাতে ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটে এবং কম্পিউটারভিত্তিক বিষয়গুলোর চাহিদাও বেড়ে যায়। এর সঙ্গে এআই যুক্ত হওয়ায় এই প্রবণতা আরও শক্তিশালী হয়েছে।—অধ্যাপক ড. এম আর কবির, উপাচার্য, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে কম পরিশ্রমে বেশি অর্থ উপার্জনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। ফলে এত কষ্ট করে পড়াশোনা করার প্রয়োজন কী—এ ধরনের মানসিকতা কাজ করছে।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টিকটকের মাধ্যমে সহজে অর্থ উপার্জনের বিভিন্ন উদাহরণও তরুণদের মধ্যে এ ধরনের আকর্ষণ তৈরি করছে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, এর সঙ্গে অভিভাবকদের ধারণারও কিছুটা সম্পর্ক রয়েছে। তবে ইইই যে চাহিদাহীন বিষয়, তা মনে করেন না তিনি। বরং বিশ্বব্যাপী এ বিষয়ের চাহিদা রয়েছে এবং বাংলাদেশে ইলেকট্রনিকস ও প্রযুক্তিখাতের সম্প্রসারণের সঙ্গে ইইই গ্র্যাজুয়েটদের প্রয়োজন বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, বুয়েট ও কুয়েট-এ  ইইই এখনো শিক্ষার্থীদের প্রথম পছন্দের বিষয়গুলোর একটি। তাঁর মতে, মূল সমস্যা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি অংশের মানসিকতায়। নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরিস্থিতির উদাহরণ দিয়ে স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই উপাচার্য বলেন, সেখানে বরং ইইই-তে শিক্ষার্থী বাড়ছে। আমার যোগদানের আগে একটি ভর্তি পর্বে ইইই-তে ১২ থেকে ১৪ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিল। এবার সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৬০ জন হয়েছে।

পড়ুন: শেষ ৩ সেমিস্টারে একজনও ভর্তি হয়নি ইউআইটিএসের ইইইতে, বিভাগের মোট শিক্ষার্থী ৮-১০ জন

সিএসই’র উত্থানে ইইই-তে আগ্রহ কমছে, এমন ধারনা অনেকের

এআই কী দখলে নেবে
এআই যুগে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায় নি জানিয়ে আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ এর উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এআই-এর দ্রুত বিকাশকে ইইই-এর জন্য হুমকি হিসেবে দেখার কারণ নেই। প্রযুক্তির বিকাশে একটি বিষয় অন্য বিষয়কে পুরোপুরি সরিয়ে দেয় না বরং একাধিক প্রযুক্তি একসঙ্গে কাজ করে নতুন প্রযুক্তি তৈরি করে।’

তিনি জানান, ১৯৭৫ সালে তিনি যখন শিক্ষকতা শুরু করেন, তখন কম্পিউটার ইলেকট্রিক্যাল বিভাগের একটি বিষয় হিসেবেই পড়ানো হতো। ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে কম্পিউটার বিভাগ ইলেকট্রিক্যাল বিভাগ থেকে আলাদা হতে শুরু করে। এরপর কম্পিউটার বিজ্ঞান, মেশিন লার্নিং, ডিপ লার্নিং ও এআই দ্রুত বিকশিত হয়েছে। তবে এর ফলে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়নি। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও ব্যবহার ছাড়া আধুনিক অর্থনীতি পরিচালনা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, যানবাহন, অবকাঠামো এবং বিভিন্ন শিল্পব্যবস্থায় ইইই-এর প্রয়োজন রয়েছে।

ট্রেনের ব্রেকিং সিস্টেম, হাইব্রিড গাড়ি ও মেট্রোরেলের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘আধুনিক প্রযুক্তিতে ইইই, কম্পিউটার, অ্যালগরিদম ও গণিত পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। ট্রেনের ব্রেকিং ব্যবস্থা আরও নিখুঁত ও স্বয়ংক্রিয় করতে কম্পিউটার অ্যালগরিদম ব্যবহৃত হচ্ছে। হাইব্রিড গাড়িতে বৈদ্যুতিক ও কম্পিউটার প্রযুক্তির সমন্বয় রয়েছে। মেট্রোরেলের ক্ষেত্রেও বিদ্যুৎ, চুম্বকত্ব ও ম্যাগনেটিজমের সঙ্গে কম্পিউটার অ্যালগরিদম ও গণিতের ব্যবহার হচ্ছে।’

তাঁর মতে, এআই যত উন্নত হবে, এর পেছনে তত বেশি বিদ্যুৎ, হার্ডওয়্যার ও ইলেকট্রনিক অবকাঠামোর প্রয়োজন হবে। তাই এআই ও ইইই-কে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার পরিবর্তে পরস্পর-সম্পর্কিত প্রযুক্তি হিসেবে দেখা উচিত। তিনি আরও বলেন, ‘ইইই পড়ে পরবর্তী সময়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান বা সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রেও যাওয়া সম্ভব। তাঁর অনেক শিক্ষার্থী পরে কম্পিউটার বিষয়ে পিএইচডি করেছেন।’

একটি বিভাগের শিক্ষক, ল্যাব, অবকাঠামো, পরিচালনা পদ্ধতি ও শিক্ষার মান—সবকিছুর ওপর ভর্তির আগ্রহ নির্ভর করতে পারে। ফলে ইইই-তে শিক্ষার্থী আগ্রহ ধরে রাখতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্ষমতার বিষয়টি তুলে ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইইই বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল আলম বলেন, ‘একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আগের শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার ও কর্মক্ষেত্রের সাফল্য পরবর্তী সময়ে নতুন শিক্ষার্থীদের ভর্তির সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা আগে ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যারা পড়াশোনা করেছেন, তাঁদের কর্মজীবনের অবস্থান ও অভিজ্ঞতা বিবেচনা করেন। ফলে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইইই গ্র্যাজুয়েটরা ভালো অবস্থানে যেতে না পারলে সেই তথ্য পরবর্তী শিক্ষার্থীদের মধ্যেও নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে। ফলে নতুন শিক্ষার্থীদের একটি অংশ সেখানে ভর্তি হতে আগ্রহী নাও হতে পারেন।’

গ্রিন ইউনিভার্সিটির অভিজ্ঞতা অনুযায়ী সেখানে মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ২৩ শতাংশ নারী হলেও ইইই বিভাগে ছিল মাত্র ৪ শতাংশ। এর পেছনে ইইই পেশা সম্পর্কে প্রচলিত সামাজিক ধারণার ভূমিকা। অনেক নারী শিক্ষার্থী মনে করেন, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের কারখানায় বা বাইরে কাজ করতে হয় এবং পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে কাজ করতে হয়। বিপরীতে CSE-এর কাজ ঘরে বসেও করা যায়—এমন ধারণা তাঁদের CSE-এর দিকে ঠেলে দেয়। তবে চিপ ডিজাইন, স্মার্ট গেট সিস্টেম, অপটিমাইজেশন ও ডিজাইনের মতো EEE-এর অনেক আধুনিক কাজ দূর থেকেই করা সম্ভব।— অধ্যাপক ড. এএসএম শিহাবুদ্দিন, চেয়ারম্যান, ইইই, ইউল্যাব

ইইই-তে নারী শিক্ষার্থীদের কম অংশগ্রহণকেও বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন ইউল্যাবের ইইই বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ এস এম শিহাবুদ্দিন। গ্রিন ইউনিভার্সিটিতে তাঁর অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ২৩ শতাংশ নারী হলেও ইইই বিভাগে তাঁদের হার ছিল মাত্র ৪ শতাংশ। এর পেছনে ইইই পেশা সম্পর্কে প্রচলিত সামাজিক ধারণার ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। অনেক নারী শিক্ষার্থী মনে করেন, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের কারখানায় বা বাইরে কাজ করতে হয় এবং পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে কাজ করতে হয়। বিপরীতে CSE-এর কাজ ঘরে বসেও করা যায়—এমন ধারণা তাঁদের CSE-এর দিকে ঠেলে দেয়। তবে চিপ ডিজাইন, স্মার্ট গেট সিস্টেম, অপটিমাইজেশন ও ডিজাইনের মতো EEE-এর অনেক আধুনিক কাজ দূর থেকেই করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

ব্যয়বহুল বিভাগ ইইই
ইইই পরিচালনার একটি বড় চ্যালেঞ্জ এর অবকাঠামোগত ব্যায়। ইউল্যাব-এর ইইই বিভাগের চেয়ারম্যান ড. শিহাবুদ্দিননের তথ্য অনুযায়ী, একটি মানসম্মত ইইই ল্যাব স্থাপনে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকা ব্যয় হতে পারে। একটি পূর্ণাঙ্গ ইইই বিভাগে ১০ থেকে ১২টি ল্যাব প্রয়োজন হলে শুধু ল্যাব স্থাপনেই প্রায় সাত থেকে আট কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে। এর সঙ্গে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও যন্ত্রপাতি আধুনিকায়নের ব্যয় রয়েছে। এ কারণে শিক্ষার্থী কম থাকলে ইইই বিভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।

ইউল্যাবের ইইই বিভাগের চেয়ারম্যান ড. শিহাবুদ্দিনের ভাষায়, এখানে ‘ডিম আগে না মুরগি আগে’ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়—শিক্ষার্থী আসবে কি না নিশ্চিত না হয়েও আগে ল্যাব তৈরি করতে হয়। আবার শিক্ষার্থী বাড়ার পর ল্যাব তৈরি করতে গেলে মানসম্মত শিক্ষা দেওয়া কঠিন।

ইইই বিভাগের প্রতি শিক্ষার্থীদের আস্থা তৈরি করতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজনীয়তা জানিয়ে ঢাবি অধ্যাপক শফিকুল  বলেন, ‘ইইই একটি ব্যবহারিক ও প্রযুক্তিনির্ভর বিষয়। ফলে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক ল্যাবরেটরি ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিসহ পর্যাপ্ত অবকাঠামো থাকা প্রয়োজন। এসব সুবিধা না থাকলে শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত জ্ঞান ও ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। এসবের মাধ্যমে দক্ষ প্রকৌশলী তৈরি হলে তাঁদের সাফল্যই পরবর্তী সময়ে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইইই বিভাগের প্রতি নতুন শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়াতে পারে।‘

প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইইই বিভাগের চেয়ারম্যান মো. সালেহীন ফেরদৌস কাদের বলেন, আমাদের এই বিভাগটিতে আধুনিক ল্যাবরেটরি সুবিধা রয়েছে। দেশের ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কারিকুলামও তৈরি করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

শিল্পখাতের সঙ্গে সংযোগের ক্ষেত্রে আবুল খায়ের গ্রুপের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা জানান তিনি। এর ফলে ভালো মানের ল্যাব রয়েছে। এসব সুবিধা শিক্ষার্থীদের জন্য ভালো কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে সুবিধা হচ্ছে বলে তাঁর দাবি।

‘ইইই একটি ব্যবহারিক ও প্রযুক্তিনির্ভর বিষয়। ফলে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক ল্যাবরেটরি ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিসহ পর্যাপ্ত অবকাঠামো থাকা প্রয়োজন। এসব সুবিধা না থাকলে শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত জ্ঞান ও ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। এসবের মাধ্যমে দক্ষ প্রকৌশলী তৈরি হলে তাঁদের সাফল্যই পরবর্তী সময়ে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইইই বিভাগের প্রতি নতুন শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়াতে পারে।— অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল আলম, চেয়ারম্যান, ইইই বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ইইই পরিচালনায় দক্ষ শিক্ষক ও মানসম্মত ল্যাবের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরেন উপাচার্যরা। এআইইউবি উপাচার্যের মতে, ভালো ইইই প্রোগ্রামের জন্য যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে এবং তাদের যথাযথ পারিশ্রমিক দিতে হবে। ভালো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি ও ভালো একাডেমিক ফলাফলসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি তাদের পড়ানোর সক্ষমতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। কম খরচে শিক্ষক নিয়োগের চেষ্টা করলে শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় ইইই বিভাগ পরিচালনাই কঠিন হয়ে পড়ছে বলেও জানান তিনি।

ঢাবি অধ্যাপক শফিকুল আলমের মতে, শুধু শিক্ষার্থী ভর্তি করানোই একটি ইইই বিভাগের সাফল্যের মাপকাঠি নয় বরং দক্ষ প্রকৌশলী তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভালো শিক্ষক ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে দক্ষ জনবল তৈরি করতে না পারলে একপর্যায়ে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইইই গ্র্যাজুয়েটদের চাকরির বাজারে চাহিদাও কমতে পারে।

নর্দান ইউনিভার্সিটির ইইই বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ফিরিয়ে আনতে শুধু ইইই-এর প্রচলিত বিষয়গুলো পড়ানো যথেষ্ট নয়। বরং নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে এর সম্পর্কও স্পষ্ট করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘আমরা ইইই-কে একটু নতুন করে সাজানোর চেষ্টা করছি। ল্যাবগুলোতে কম্পিউটার সায়েন্স-রিলেটেড কিছু কোর্স, ন্যানোটেকনোলজি ও রোবটিকসের কোর্স যুক্ত করছি। কারিকুলামকে এআই-এর সঙ্গে ইন্টিগ্রেটেড করে নতুনভাবে ডেভেলপ করার চেষ্টা করছি, যেন শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই আগ্রহ তৈরি হয় যে ইইই  পড়লেও এআই নিয়ে কাজ করা সম্ভব।’

অধ্যাপক মিজানুর রহমানের মতে, ইইই-তে শিক্ষার্থী কমার অন্যতম কারণ বিষয়টির বহুমুখী কর্মক্ষেত্র সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাব।

তিনি বলেন, ‘সমস্যা হচ্ছে, ইইই-র ক্যারিয়ার সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতনতা তৈরি হয়নি। তারা জানে না, এটা এমন একটা সাবজেক্ট যেখান থেকে চাইলে বিভিন্ন ধরনের উইংয়ে যাওয়া সম্ভব। স্যাটেলাইট সেক্টরে কাজ করা যায়, এনার্জি কমিশনে কাজ করা যায়। যত ধরনের পাওয়ার সেক্টর আছে, ইলেকট্রনিকস কোম্পানি আছে, মোবাইল কোম্পানি আছে এমন  সব জায়গাতেই চাকরি আছে। এমনকি একটি গার্মেন্টসেও দরকার হয়।’

উপাচার্য এবং বিভাগীয় প্রধানদের ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতার মধ্যেও একটি বিষয় স্পষ্ট  একদিকে সিএসই ও এআই শিক্ষার্থীদের কাছে দ্রুত দৃশ্যমান নতুন কর্মক্ষেত্র ও আয়ের সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে ইইই পড়তে প্রয়োজন তুলনামূলক বেশি ল্যাব, যন্ত্রপাতি ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যও এ বিভাগ পরিচালনা ব্যয়বহুল। ফলে পর্যাপ্ত শিক্ষক ও আধুনিক ল্যাব ছাড়া ইইই-এর মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন।

ইইই পাঠে ব্যস্ত শিক্ষার্থীরা। ছবি: ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি

চাকরির বাজার
ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদন, সরবরাহ, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির নকশা, উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করা একটি প্রযুক্তিনির্ভর প্রকৌশল শাখা। এ বিষয়ে পড়াশোনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পাওয়ার সিস্টেম, হার্ডওয়্যার, টেলিকমিউনিকেশন, মাইক্রোইলেকট্রনিকসসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জ্ঞান ও ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করেন। ফলে ইইই গ্র্যাজুয়েটদের বিদ্যুৎ, ইলেকট্রনিকস ও হার্ডওয়্যারভিত্তিক বিভিন্ন শিল্পে কাজের সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো খাতে ইইই গ্র্যাজুয়েটদের দীর্ঘদিনের কর্মক্ষেত্র রয়েছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডব্লিউডি), পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি), বিভিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিষ্ঠান এবং টেলিকম অপারেটরসহ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এ বিভাগের গ্র্যাজুয়েটরা কাজ করছেন। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাড়ায় পাওয়ার গ্রিড, সোলার ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবস্থার নকশা, স্থাপন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণেও ইইই প্রকৌশলীদের কাজের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে।

শুধু প্রচলিত বিদ্যুৎ খাতেই নয়, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রও বিস্তৃত। পাওয়ার সিস্টেম, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, রোবোটিকস, মাইক্রোইলেকট্রনিকস, ইলেকট্রনিকস ডিজাইন ও হার্ডওয়্যার প্রযুক্তিতে বিশেষায়িত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে এসব বিষয়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগও রয়েছে। ফলে হার্ডওয়্যার, ইলেকট্রনিকস, বিদ্যুৎব্যবস্থা কিংবা আধুনিক জ্বালানি প্রযুক্তিতে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য ইইই-এর কর্মক্ষেত্র একক কোনো খাতে সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে এর কাজের ক্ষেত্রও বদলাচ্ছে এবং নতুন নতুন ক্ষেত্র যুক্ত হচ্ছে।

ইইই পড়ে ইলেকট্রনিকস, কমিউনিকেশন, পাওয়ার সিস্টেম, বায়োমেডিকেল, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ন্যানোটেকনোলজিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। এমনকি ইইই পড়েও কম্পিউটার সায়েন্স, প্রোগ্রামিং ও কোডিংয়ের ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব।

ইউল্যাবের ইইই বিভাগের চেয়ারম্যান ড. শিহাবুদ্দিনের মতে, ইইই এর ভবিষ্যৎ প্রচলিত বিদ্যুৎ খাতের বাইরেও বিস্তৃত হচ্ছে। তাইওয়ান, চীনসহ বিভিন্ন দেশে প্রসেসর ও অন্যান্য হার্ডওয়্যার তৈরির প্রতিযোগিতার সঙ্গে ইইই সরাসরি যুক্ত। প্রসেসর ডিজাইন ও তৈরিতে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এছাড়াও নবায়নযোগ্য জ্বালানিকেও সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে দেখছেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করলেই কাজ শেষ হয় না। এর দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ, ত্রুটি নির্ণয়, সমস্যা সমাধান ও আপগ্রেডেশনের জন্য প্রকৌশলী প্রয়োজন। এছাড়াও জ্বালানি নিরাপত্তা একটি দেশের অর্থনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সঙ্গেও যুক্ত। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তারের সঙ্গে ইইই-এর কর্মক্ষেত্রও বাড়তে পারে।’

নর্দান ইউনিভার্সিটির ইইই বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, ‘ইইই পড়ে ইলেকট্রনিকস, কমিউনিকেশন, পাওয়ার সিস্টেম, বায়োমেডিকেল, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ন্যানোটেকনোলজিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। এমনকি ইইই পড়েও কম্পিউটার সায়েন্স, প্রোগ্রামিং ও কোডিংয়ের ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব।’

তাঁর ভাষায়, ক্যারিয়ার অনেক বিস্তৃত। কিন্তু আমাদের শিক্ষার্থীরা এই জিনিসগুলো বোঝে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পরে হয়তো বুঝতে পারে। কিন্তু তার আগে থেকেই তাদের মধ্যে একটা ধারণা তৈরি হয়ে যায় যে এআই পড়তে হবে, কম্পিউটার সায়েন্স পড়তে হবে।