০৯ মার্চ ২০২৬, ১৮:৫১

কারণে-অকারণে বন্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অপূরণীয় ক্ষতি পোষাবে কে?

কারণে-অকারণে বন্ধ হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান  © ফাইল ছবি

দেশ-বিদেশের প্রাকৃতিক কিংবা মানবসৃষ্ট দুর্যোগ, মহামারি কিংবা বিক্ষোভ— সবার আগে বন্ধ হয় বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ২০২০ সালের করোনা মহামারির পর থেকে কারণে-অকারণে স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে আসছে। বাদ যায়নি ভূমিকম্পের মত পূর্বানুমান-অযোগ্য বিষয় নিয়েও আতঙ্ক। সর্বশেষ ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রেক্ষিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের কারণ দেখিয়ে দীর্ঘ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তবে শিক্ষাবিদরা বলছেন, বিভিন্ন সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে ‘রাজনৈতিক কারণ’। এতে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় হচ্ছে অপূরণীয় ক্ষতি।

২০২০ পরবর্তী বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের টাইমলাইন অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখা হয়। কোভিড-১৯ মহামারীর প্রাদুর্ভাবে ওই বছরের ১৭ মার্চ একযোগে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। জুলাইয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পরে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান অনলাইনে ক্লাস নেওয়া শুরু করে। করোনার প্রকোপ কিছুটা কমলে প্রায় দেড় বছর পর ধাপে ধাপে খোলা শুরু হয়। এক হিসাবে ওই সময় প্রায় ৪ কোটি শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এরপর ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে তীব্র তাপপ্রবাহ শুরু হলে ২১ এপ্রিল থেকে ৩ মে পর্যন্ত স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখা হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগে বন্ধের আরেকটি উদাহরণ গত বছরের ২১ নভেম্বর হওয়া ভূমিকম্প। ওই দিনের তীব্র কম্পনের পর প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পরে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ওই সময়ে অর্ধ-মাস বন্ধ ছিল।

এসব দুর্যোগ ছাড়াও বন্যা ও ঘুর্ণিঝড়ে স্কুল বন্ধ থাকা নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে দুর্যোগকালে দুর্যোগের কারণে বন্ধের পাশাপাশি বিদ্যালয়গুলোও আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়া প্রতি বছর রমজান ও ঈদ উপলক্ষে লম্বা ছুটি থাকে। এ ছাড়া নির্বাচনে বিদ্যালয়গুলো ব্যবহার হয় ভোটগ্রহণ কেন্দ্র হিসেবে, এতেও বন্ধ থাকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

বিদ্যুতের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করা হয়েছে, এটা আমার কাছে খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। আমার কাছে মনে হয়েছে ক্যাম্পাসগুলোর পলিটিক্যাল যে অবস্থা, যেমন ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে যে পরিস্থিতি— সবকিছু মিলিয়ে এটা বন্ধ করা হয়েছে। এর আগে ভূমিকম্পের সময় বন্ধ দিল, সেটারও একটা পলিটিক্যাল রিজন ছিল— অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এসবের বাইরে ছাত্র আন্দোলন একটি বড় কারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করেন শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া আন্দোলন দমনেও বন্ধ করা হয় প্রতিষ্ঠান। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমনে ১৭ জুলাই সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়, যা খোলে এক মাস পর ১৮ আগস্টে। শিক্ষকদের আন্দোলনেও ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধের নজির কম নেই। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে সর্বজনীন পেনশন স্কিম বাতিলের দাবিতে টানা ৮ দিন ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা। এ ছাড়া গত বছরের নভেম্বরেও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা বেতন স্কেল উন্নীত করার দাবিতে টানা কয়েকদিন ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করেন।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, নানা বাহানায় বারবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার কারণে শিক্ষার্থীরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা থেকে পিছিয়ে পড়ছেন। এ ছাড়া প্রতিবার বন্ধের সময় সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহল থেকে এই ঘাটতি পূরণের আশ্বাস দেওয়া হয়। কিন্তু কখনোই এই ঘাটতি পূরণে সরকারি নির্দেশনা কিংবা কোনো উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়নি।

আরও পড়ুন: সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ, ব্যতিক্রম বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে কর্মরত কারিগরি ও ডিজিটাল শিক্ষা এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ড. মো. আকতারুজ্জামান বলেন, বিদ্যুৎ খরচ কমানোর জন্যে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ‌ করা ভুল সিদ্ধান্ত। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকরা ক্লাস না নিলেও বেতন ভাতা পাবেন, কিন্তু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে তো শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন দেওয়া কঠিন হবে।

তিনি বলেন, এছাড়া শিক্ষার্থীরা তাদের ডিগ্রি সময়মত শেষ করতে পারবে না। করোনা পরবর্তী সময়ে আমরা যদি ব্লেন্ডেড শিক্ষায় গুরুত্ব দিতাম, একদিনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে হত না।

নানা বাহানায় বারবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার কারণে শিক্ষার্থীরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা থেকে পিছিয়ে পড়ছেন। এ ছাড়া প্রতিবার বন্ধের সময় সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহল থেকে এই ঘাটতি পূরণের আশ্বাস দেওয়া হয়। কিন্তু কখনোই এই ঘাটতি পূরণে সরকারি নির্দেশনা কিংবা কোনো উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়নি।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের পেছনে রাজনীতিকে অনুঘটক হিসেবে দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে তিনি বলেন, আমাদের যেকোনো ডিজাস্টার (দুর্যোগ) আসবেই— ভূমিকম্প, খরা, দুর্যোগ এগুলো আসতেই পারে। কিন্তু এইযে প্রথমেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটাকে মনে করে যে নিরীহ, এটাকে বন্ধ রাখতে হবে। মনে করে— অসুবিধা নাই, এটা এডজাস্ট করে নেওয়া যাবে। কিন্তু আসলে এডজাস্ট করে না। বলা হচ্ছে যে বিদ্যুতের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করা হয়েছে, এটা আমার কাছে খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। আমার কাছে মনে হয়েছে ক্যাম্পাসগুলোর পলিটিক্যাল যে অবস্থা, যেমন ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে যে পরিস্থিতি— সবকিছু মিলিয়ে এটা বন্ধ করা হয়েছে। এর আগে ভূমিকম্পের সময় বন্ধ দিল, সেটারও একটা পলিটিক্যাল রিজন ছিল।

আরও পড়ুন: ছুটির আগেই বাড়ি যাওয়ার ‘ট্রেন্ড’ মেডিকেল শিক্ষার্থীদের, কঠোর হচ্ছে স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রশাসন

প্রাকৃতিক দুর্যোগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের বিষয়ে তিনি বলেন, দুর্যোগকালে যেমন খরা, বন্যা, ঝড়, বৃষ্টি, প্রচণ্ড শীত বা প্রচন্ড গরমে বিষয়টিকে কিভাবে ম্যানেজ করবে তার অল্টারনেটিভ কোনো প্ল্যান আমাদের নাই। কোভিডের পরে আমরা একটা হঠাৎ ধাক্কা খেলাম, এরপরে যে এটাকে আসলে দাঁড় করানো দরকার, সে প্ল্যান নেওয়া হয়নি। কিছু একটা হলেই বলে জুমে ক্লাস কর, আর গুগল মিটে আসো। এটা তো সমাধান না। অর্থাৎ সরকারেরও প্রস্তুতি নাই, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরও কোন প্রস্তুতি নাই। সুতরাং, কী করা যায়? ঝামেলা হচ্ছে, সবার আগে এটা (শিক্ষা প্রতিষ্ঠান) বন্ধ করে দিই। যেমন শপিং মল চলছে, সেখানে কারেন্ট চলছে, এসি চলছে, সবই চলছে। কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সমস্যা।

শিক্ষার্থীরা তাদের ডিগ্রি সময়মত শেষ করতে পারবে না। করোনা পরবর্তী সময়ে আমরা যদি ব্লেন্ডেড শিক্ষায় গুরুত্ব দিতাম, একদিনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে হত না— ড. মো. আকতারুজ্জামান, কারিগরি ও ডিজিটাল শিক্ষা এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, অস্ট্রেলিয়া

এভাবে বন্ধের ফলে শিক্ষা ব্যবস্থার অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন অধ্যাপক মজিবুর রহমান। বলেন, প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিলে বিকল্প যে পরিকল্পনা রাখা দরকার, সেই প্ল্যানগুলো না রেখে যদি বন্ধ করি, তাহলে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হব। এমনিতেই আমরা লার্নিং গ্যাপের মধ্যে আছি। এই লার্নিং গ্যাপ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদের আরও ভালভাবে ক্লাস, ল্যাব, গবেষণা এবং লাইব্রেরি খোলা রাখা দরকার। ঠিক আছে, একটা ক্রাইসিস আসছে, বন্ধ করে দিলাম। কিন্তু এর যে  ক্ষতি তা পুষিয়ে নিতে যে সমাধান করে দেওয়ার উদ্যোগটা থাকা লাগবে সব পক্ষ থেকে। সেটি হলে বন্ধ করাটা মেনে নেওয়া যায়।