২৯ অক্টোবর ২০২৬, ২১:৪৮

‘ফায়ার ফাইটের জন্য’ জানালায় গ্রিল না থাকা সেই ভবনের ৫ সিঁড়ির তিনটিই ‘দখলে’

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সি ব্লক ভবন  © টিডিসি

অগ্নিদুর্ঘটনায় দ্রুত মোকাবিলার অজুহাতে জানালায় কোনো নিরাপত্তাবেষ্টনী না রাখা বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সি ব্লক ভবনটির ভেতরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় উল্টো চিত্র দেখা গেছে। ফায়ার এক্সিট ও জরুরি চলাচলের পথ তো নেই-ই, বরং মোট ৫টি সিঁড়ির ৩টিই রাখা হয়েছে বন্ধ। সিঁড়িগুলোর কোনো অংশে কর্মচারীদের অফিস অথবা কোনো অংশে কর্মচারীদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কোনো কোনো অংশে রাখা হয়েছে পরিত্যক্ত সামগ্রী।

এ ছাড়া ভবনটির তিনটি লিফটের দুটিই চিকিৎসক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সংরক্ষিত। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের অন্যতম ব্যস্ত এই ইনডোর ভবনটিতে ওঠানামায় বেশ দুর্ভোগে পড়তে হয় রোগী ও স্বজনদের। একই সাথে নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা অগ্নিকাণ্ডের সময় রোগীর স্বজন ও চিকিৎসকদের জীবন চরম ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মত সংশ্লিষ্টদের।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ তলা ভবনটিতে মোট ৫টি সিঁড়ি। দক্ষিণমুখী এই ভবনের প্রবেশপথেই দু’পাশে দুটি সিঁড়ি নির্মাণ করা হয়েছিল। একই সাথে উত্তরাংশের মাঝ বরাবর একটি এবং উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিম কোণে আরও দুটি সিঁড়ি নির্মাণ করা হয়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রবেশপথের ডানপাশের সিঁড়িটি উন্মুক্ত থাকলেও তা অত্যন্ত সংকীর্ণ। তবে বাম পাশে কোনো সিঁড়ি দেখা যায়নি। বরং এখানে সিঁড়ি দখল করে হাসপাতাল শাখার কর্মচারীদের জন্য একটি কক্ষ বানানো হয়েছে। ওপরের বিভিন্ন ফ্লোরে এই সিঁড়ির অস্তিত্ব থাকলেও সেগুলো ব্যবহার-উপযোগী নয়। অনেকগুলো ফ্লোরেই এই সিঁড়িতে অব্যবহার্য এবং পরিত্যক্ত সামগ্রী রাখা হয়েছে।

নিচ তলায় উত্তর-পূর্ব কোণের দৃশ্য—সিঁড়ি দখল করে একটি রুম বানানো হয়েছে

নিচ তলায় উত্তর-পূর্ব কোণের সিঁড়িটিও তালা দেওয়া। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, এই অংশটি হাসপাতালের কোনো কর্মচারী দখল করে রেখেছেন। ওপরের বিভিন্ন ফ্লোর থেকে এই সিঁড়িটিতে পরিত্যক্ত চেয়ার-টেবিল রাখতে দেখা গেছে। একই চিত্র উত্তর-পশ্চিম কোণের সিঁড়িটিতে। নিচতলাসহ কয়েকটি ফ্লোরে এই সিঁড়ি দখল করে হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের করা হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে ভবনটির একমাত্র ব্যবহার-উপযোগী সিঁড়ি উত্তর দিকের মাঝ বরাবর থাকা বিশাল সিঁড়িটি।

সিঁড়িগুলোতে খুব বাজে অবস্থা। কোথাও ময়লা-আবর্জনা ফেলা, কোথাও আসবাবপত্র, কোথাও দখল করে রুম বানানো। সিঁড়ি যা আছে, তাও রোগীবান্ধব না। অপরিকল্পিত নির্মাণ। আল্লাহ না করুক, বড় ভূমিকম্প বা অগ্নিদুর্ঘটনার মতো দুর্যোগ আসলে জীবন নিয়ে বের হওয়াই মুশকিল হয়ে যাবে— তারেক আহমেদ

অপরদিকে ভবনের প্রবেশপথের ডান পাশে একটি এবং মাঝ বরাবর উত্তর-দক্ষিণমুখী করিডোরের মাঝের অংশে দুটি লিফট রয়েছে। এর মধ্যে প্রবেশপথের লিফটটি বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসকসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত। একই ভাবে পাশাপাশি থাকা দুটি লিফটের একটিও সংরক্ষিত রাখা হয়েছে।

প্রবেশপথের বাম পাশের সিঁড়ি, ওপর থেকে তোলা

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৭টি বিভাগের মধ্যে ১২টিরই কার্যক্রম চলে এই ভবনের ১০টি ফ্লোরে। এ ছাড়া দুটি ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট এবং ৬টি অপারেশন থিয়েটার আছে এই ভবনে। এ ছাড়া ভবনটিতে পরিচালক (হাসপাতাল) অফিস, ওয়ার্ড মাস্টার অফিস, কনফারেন্স রুম, মুক্তিযোদ্ধা সেল, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ এবং মেডিকেল গ্যাস প্লান্ট কন্ট্রোল রুমও আছে।

আরও পড়ুন: উন্মুক্ত জানালা ঘেঁষে রোগীর শয্যা/ দত্তক নেওয়া মেয়েকে হারিয়ে আরও একবার নিঃসন্তান নুরুন্নবী-পারুল দম্পতি

ভবনে থাকা ক্লিনিক্যাল বিভাগগুলো হলো—ফিজিক্যাল মেডিসিন, শিশু বিভাগ, নিওনেটোলজি, চর্ম ও যৌন রোগ, ল্যাবরেটরি মেডিসিন, নেফ্রোলজি, ইউরোলজি, নিউরো সার্জারি, শিশু সার্জারি, নাক-কান-গলা, হেপাটোবিলিয়ারি সার্জারি, কলোরেক্টাল সার্জারি, চক্ষু বিজ্ঞান, কমিউনিটি অফথালমোলজি, অবস্ এন্ড গাইনী, ফিটোম্যাটার্নাল মেডিসিন, জেনারেল সার্জারি এবং অ্যানেস্থেসিওলজি। অপারেশন থিয়েটারগুলো হলো—চর্ম ও যৌন, ইউরোলজি মাইনর, নিউরোসার্জারি, সিজার, ইউরোলজি এবং জেনারেল সার্জারি। আর ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট দুটি হলো আইসিইউ ও এনআইসিইউ।

উত্তর-পশ্চিম কোণের সিঁড়িটি এই ফ্লোরে স্বাভাবিক মনে হলেও নিচের অংশ দখল হয়ে আছে

এ সব মিলিয়ে প্রতিদিন হাজারো রোগী এই ভবনে ভর্তি থাকেন। সঙ্গে অবস্থান ও আনাগোনা থাকে তাদের আত্মীয়-স্বজন ও স্বাস্থ্যকর্মীদের। ফলে যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনায় ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারে ভবনটিতে।

ভবনটির নবম তলায় জেনারেল সার্জারি বিভাগের সামনে শিহাব উদ্দিন নামে একজনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি তার অসুস্থ ভাইয়ের জন্য এখানে এসেছিলেন। তিনি বলেন, এখানে এতগুলো সিঁড়ি আছে জানতাম না। তবে যদি ভবনের সিঁড়ি ও জরুরি যাতায়াত ব্যবস্থা এমন অনিরাপদ থাকে, তাহলে দুর্ঘটনার সময় বড় বিপর্যয় ঘটতে পারে। এটা সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে হেয়ালি ছাড়া কিছু না।

৬ষ্ঠ তলায় নাক, কান ও গলা বিভাগের সামনে গোলাম মর্তুজা নামে এক ব্যক্তি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ওয়ার্ডের সামনেই সিঁড়ি। কিন্তু নামতে গিয়ে দেখি এটি ব্যবহার উপযোগী নয়। বিভিন্ন পরিত্যক্ত আসবাব রাখা হয়েছে। ৫টি সিঁড়ির তিনটিই যদি এভাবে ব্লক করে রাখা হয়, তাহলে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করে। এ ছাড়া মাত্র একটি লিফট ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। এতে অনেক সময় লম্বা সিরিয়াল হয়, দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়।

ভবনটিতে অনেকগুলো সিঁড়ি আছে, কিন্তু কেউ রুম বানিয়েছে, কেউ বন্ধ করে রেখেছে। আমরা সিঁড়িগুলোর এক্সেস ঠিক করার কাজটা নিয়েছি— ডা. হাসনাত আহসান সুমন, উপপরিচালক (হাসপাতাল), বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

তারেক আহমেদ নামে এক রোগীর স্বজন বলেন, এটি বাংলাদেশের এক নম্বর বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতাল, জনগণের কষ্টার্জিত টাকায় এই হাসপাতাল পরিচালিত হয়। সারাদেশ থেকে উন্নত চিকিৎসার আশায় সাধারণ মানুষ এ হাসপাতালে আসেন। যদিও অভিযোগ আছে সরকারি হলেও এই হাসপাতালে সব সময় ভিআইপিদের জন্য রিজার্ভ করে রাখা হয়। সাধারণ মানুষ অবহেলার শিকার হয়। তারপরেও মানুষ এখানে আসতে বাধ্য হয়।

উত্তর-পূর্ব কোণের সিঁড়ি

তিনি বলেন, নানা ভোগান্তি পেরিয়ে কেউ যদি এখানে চিকিৎসার সুযোগ পায়ও, তারপরও হাসপাতালে চরম অব্যবস্থাপনার কারণেও রোগীরা নানা দুর্ভোগের শিকার হন। এই ভবনটিরও একই অবস্থা। সামনের দিকের কোনো জানালায় গ্রিল নেই। যে থাই ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলোর ছিটকিনিও ঠিকঠাক কাজ করে না। এ ছাড়া সিঁড়িগুলোতে খুব বাজে অবস্থা। কোথাও ময়লা-আবর্জনা ফেলা, কোথাও আসবাবপত্র, কোথাও দখল করে রুম বানানো। সিঁড়ি যা আছে, তাও রোগীবান্ধব না। অপরিকল্পিত নির্মাণ। আল্লাহ না করুক, বড় ভূমিকম্প বা অগ্নিদুর্ঘটনার মতো দুর্যোগ আসলে জীবন নিয়ে বের হওয়াই মুশকিল হয়ে যাবে।

আরও পড়ুন: পদ না থাকলেও পদোন্নতি/ ১৪-১৬তম থেকে সোজা ১০ম গ্রেডের অ্যাডমিন অফিসার ২০ কর্মচারী

এ বিষয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হাসপাতাল শাখার উপপরিচালক ডা. হাসনাত আহসান সুমন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ভবনটিতে অনেকগুলো সিঁড়ি আছে, কিন্তু কেউ রুম বানিয়েছে, কেউ বন্ধ করে রেখেছে। আমরা সিঁড়িগুলোর এক্সেস ঠিক করার কাজটা নিয়েছি।

অনেক দিন থেকেই সিঁড়িগুলো উদ্ধারের চেষ্টা চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, রেজিস্ট্রার অফিস থেকে অনেক আগে একটা কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি প্রতিবেদনও দিয়েছে। এই ভবনের সিঁড়ির এক্সেস নিশ্চিতের পাশাপাশি অন্যান্য ভবনের ক্ষেত্রেও বন্ধ থাকা বিভিন্ন এক্সিট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।