স্তন ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণে প্রতিরোধ ও সামাজিক সচেতনতার বিকল্প নেই: ঢামেক পরিচালক
স্তন ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধকেই মূল উপায় হিসেবে উল্লেখ করে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. একেএম ফরহাদ হোসাইন। তিনি বলেছেন, ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসার চেয়ে এটি যেন না হয় কিংবা শুরুর দিকেই ধরা পড়ে, সে জন্য প্রাথমিক সচেতনতা, আত্মপরীক্ষা (সেলফ টেস্ট) ও স্ক্রিনিংয়ের বার্তা পরিবার থেকে শুরু করে পুরো সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
আজ সোমবার (২৬ অক্টোবর) বেলা ১২টায় হাসপাতালে ডিরেক্টরস ট্রেনিং কমপ্লেক্সের ২য় তলায় রেডিওথেরাপি বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পরিচালক এসব কথা বলেন। স্তন ক্যান্সার সচেতনতা মাস অক্টোবর উপলক্ষে ‘ব্রেস ক্যান্সার অ্যাওয়ারনেস অ্যান্ড স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম’ শিরোনামে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ বছর ‘এভরি স্টোরি ইজ ইউনিক, এভরি জার্নি ম্যাটারস’ প্রতিপাদ্যে মাসটি উদযাপিত হচ্ছে।
রেডিওথেরাপি বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. নাজিরুম মুবিন ও ফেইজ বি রেসিডেন্ট ডা. ফারিহা নাজ মাহমুদের সঞ্চালনায় এতে সভাপতিত্ব করেন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. আলীয়া শাহনাজ। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সহযোগী অধ্যাপক ডা. মেহের জাবীন। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সাদিয়া সাজমিন সিদ্দিকা ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. ইব্রাহীম খলিল, শিশু গ্যাস্ট্রো এন্টারোলজি ও নিউট্রিশন বিভাগের অধ্যাপক ডা. কানিজ সুলতানা এবং ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. আন্দালিব মোস্তফা ইকবাল ইরা।
এ সময় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ঢামেক হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. একেএম ফরহাদ হোসাইন বলেন, কেন ব্রেস্ট ক্যান্সার হচ্ছে, এটার স্ক্রিনিং প্রোগ্রামগুলো কী, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কী আছে, কীভাবে ব্রেস্ট অটো ডায়াগনোসিস করা যায়, সেলফ টেস্ট করা যায় এবং হওয়ার পরে কী করতে হবে, কোথায় যেতে হবে—এই জিনিসগুলো জানা এবং বোঝার খুবই প্রয়োজন। এজন্য এই ম্যাসেজটা আমরা আমাদের পরিবার, সমাজ, বন্ধু-বান্ধব, রাষ্ট্র, দেশ-বাড়ি, গ্রাম যা আছে, সবার কাছে যদি ছড়িয়ে দিতে পারি, কিছু সংখ্যক হলেও এটার অ্যাওয়ারনেস ডেভেলপ করবে।
এ সময় তিনি স্মরণ করিয়ে দেন—‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিওর’; অর্থাৎ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম। একই সাথে মেডিকেলের রেডিওথেরাপি বিভাগের সার্বিক উন্নয়নে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে পরিচালক বলেন, আমি যতদিন থাকি চেষ্টা করব রেডিওথেরাপি ডিপার্টমেন্ট যেন উন্নত থেকে আরও উন্নত করা যায়। একই সাথে আমি সরকারের কাছেও আপিল করব।
আরও পড়ুন: রেডিওথেরাপির সিরিয়াল সাড়ে ৭ হাজার, অনেকের চিকিৎসা মিলবে ২০২৮ সালে
সভাপতির বক্তব্যে রেডিওথেরাপি বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ডা. আলীয়া শাহনাজ ব্রেস্ট ক্যান্সারের চিকিৎসার সংকট তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ব্রেস্ট ক্যান্সারের ক্ষেত্রে চারটি স্টেজ রয়েছে এবং রোগী আর্লি স্টেজ, মধ্যম বা শেষ পর্যায়ে যেটাই আসুক, রোগের পর্যায় অনুযায়ী চিকিৎসা নেন। এই চিকিৎসায় সার্জারি, কেমোথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি, রেডিওথেরাপি, হরমোন ও ইমিউনো-থেরাপির মতো অনেকগুলো পদ্ধতির সমন্বয় প্রয়োজন হয়। এগুলোর অনেক চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় বেশিরভাগ রোগীর পক্ষেই তা নেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না, কারণ সরকার থেকে কেমোথেরাপি ও ইমিউনোথেরাপি সীমিত পরিমাণে সরবরাহ করা হয়।
ডা. আলীয়া শাহনাজ বলেন, রেডিওথেরাপির ডেট যদি তিন বা ছয় মাস পরে পাওয়া যায়, তবে সেই ট্রিটমেন্টে কোনো ভালো রেসপন্স বা রোগী ভালো হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। ঢাকা মেডিকেল কলেজে ১০০ জনের বেশি কেমোথেরাপি পেলেও রেডিওথেরাপির ক্ষেত্রে কোবাল্ট মেশিন ব্যবহারের ফলে ব্রেস্ট ক্যান্সারে ভালো রেজাল্ট পাওয়া যায় না, এজন্য আধুনিক প্রযুক্তির লিনিয়ার এক্সিলারেটর মেশিন অত্যন্ত প্রয়োজন।
ব্রেস্ট ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্রেস্ট ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের সবার অবস্থা একরকম নয়। রোগের ধরণ, রোগীর প্রকৃতি, পারিপার্শ্বিক, মানসিক ও পারিবারিক অবস্থা এবং আর্থিক স্বচ্ছলতা একেক জনের ক্ষেত্রে একেক রকম। আর্থিক অবস্থা ভালো হলেও রোগীর সঙ্গে কে আসবে তা একটি বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ রোগীর সঙ্গে যিনি আসবেন তাকে সমস্ত কাজ বাদ দিয়ে আসতে হয়। তাছাড়া চিকিৎসা দীর্ঘ ও সময়সাপেক্ষ হওয়ায় বারবার আসার জন্য শুধু একজন মানুষের পক্ষে সম্ভব হয় না, ফলে পুরো পরিবার ও আশপাশের লোকজন এর সাথে যুক্ত হয়ে যায়। রোগীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দায়িত্ববোধের তারতম্যের কারণে প্রতিটি রোগীর গল্প ও চিকিৎসার যাত্রা ভিন্ন ও অনন্য।
স্ক্রিনিংয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করে এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, দেরিতে বা যেকোনো পর্যায়ে আসুক না কেন, রোগীদের সার্জারি, প্যাথলজি, রেডিওলজি ও অনকোলজি বিভাগের সমন্বিত চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে আর্লি ডায়াগনোসিস ও সফল চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে ক্যান্সারের বাড়তি রোগীর চাপ বা লোড কমে যাবে এবং বিদ্যমান অভিজ্ঞ ম্যানপাওয়ার দিয়েই চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে।
আরও পড়ুন: দুই বছরের মধ্যে জেলা পর্যায়ে রেডিওথেরাপি মেশিন স্থাপন করা হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
সম্প্রতি প্রকাশিত ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর ক্যান্সার রিসার্চের গবেষণার বরাত দিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ পরমাণু চিকিৎসা কেন্দ্রের (ইনমাস) পরিচালক অধ্যাপক ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস বলেন, ২০২২ সালে বাংলাদেশে নতুন ব্রেস্ট ক্যান্সার রোগী শনাক্ত হয়েছে প্রায় ১৩ হাজার। দেশে সঠিক রেজিস্ট্রি বা পরিসংখ্যানের অভাবে অনেক সময় প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায় না উল্লেখ করে তিনি প্রতি ইনস্টিটিউটে নিজস্ব পরিসংখ্যান রাখার ওপর জোর দেন। এছাড়া তিনি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) ‘ক্যান্সার কেয়ার ফর অল’ স্লোগানের আওতায় এবং ইম্প্যাক্ট মিশনের মাধ্যমে বাংলাদেশসহ স্বল্প ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ইমেজিং, রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপির সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন।
রোগীর কাউন্সেলিং ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্ব দিয়ে ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস বলেন, ব্রেস্ট ক্যান্সার চিকিৎসার ক্ষেত্রে কাউন্সেলিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। জাপানের টার্মিনাল স্টেজেও রোগীদের মানসিক শান্তি ও সুস্থতা বজায় রাখতে কনসার্ট বা বিশেষ আয়োজনের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু অনেক সময় ভুল বা অপরিকল্পিত উপায়ে রোগীর কাছে রোগ প্রকাশ করায় তাদের মানসিক অবস্থা ভেঙে পড়ে এবং রোগ আরও দ্রুত অবনতির দিকে যায়। তাই ক্যান্সার রোগীর ক্ষেত্রে সঠিক কাউন্সেলিং ও গোপনীয়তা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
তিনি বলেন, বিদেশে জেনেটিক কাউন্সেলিং র্যান্ডমলি করা হলেও বর্তমানে বাংলাদেশে আইসিডিডিআর,বি (আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ), বারডেম এবং নিনমাসের (ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস, বিএমইউ) মতো প্রতিষ্ঠানে কম খরচে এই সেবা চালু হয়েছে।