০৫ জুন ২০২৬, ১৯:২৪

সন্তান পেতে শারীরিক সম্পর্কে আগ্রহ তীব্র হয় নারীদের, পুরুষের বাড়ে ‘যৌন সমস্যা’: গবেষণা

বন্ধ্যাত্বের কারণে দাম্পত্য বোঝাপড়া ও সম্পর্কগত সমস্যার সৃষ্টি হয়  © এআই দিয়ে তৈরিকৃত

সন্তান না হওয়ার নেপথ্যে নারীর ভূমিকাকেই বড় অংশে দায়ী করা হলেও পুরুষের বন্ধ্যাত্ব সমস্যা নতুন নয়। তবে গবেষণা বলছে, বন্ধ্যাত্বের সমস্যা নির্ণয়ের পর স্বামী-স্ত্রীর আচরণ যেমন বদলে যেতে থাকে, যৌন জীবনেও পড়ে এর বিপ্রতীপ প্রভাব। বন্ধ্যা নারীরা যেখানে সন্তান লাভের আশায় ‘ভালো লাগা’র ঊর্ধ্বে উঠে যৌন সম্পর্কে আরও আগ্রহী হয়ে ওঠেন, সেখানে আক্রান্ত পুরুষ আগ্রহ তো হারানই— এমনকি দ্রুত বীর্যপাত এবং উত্থানদুর্বলতার মতো যৌন সমস্যায় ভুগতে শুরু করেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, গর্ভনিরোধক ব্যবহার ছাড়া টানা এক বছর শারীরিক সম্পর্কের পরও সন্তান না হলে সেটিকে বন্ধ্যাত্ব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তথ্য বলছে, বিশ্বব্যাপী ৮ থেকে ১০ শতাংশ দম্পতি বন্ধ্যাত্ব সমস্যায় ভোগেন।

বিভিন্ন বৈশ্বিক গবেষণায় বন্ধ্যাত্বের কারণগুলোকে সমান চার ভাগে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে ২৫ শতাংশ ক্ষেত্রে সমস্যাটি চিকিৎসাগতভাবে শুধু পুরুষের, ২৫ শতাংশ ক্ষেত্রে শুধু নারীর, ২৫ শতাংশ ক্ষেত্রে স্বামী এবং স্ত্রী উভয়েরই কোনো না কোনো ছোট-বড় সমস্যা আছে এবং ২৫ শতাংশ ইডিওপ্যাথিক বা কারণ অজানা। আমেরিকান সোসাইটি ফর রিপ্রোডাক্টিভ মেডিসিন (এএসআরএম) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনেক গবেষণায় আবার তিন ভাগের এক ভাগের হিসাব বহুল ব্যবহৃত। অর্থাৎ বন্ধ্যাত্বের জন্য পুরুষ ৩৩ শতাংশ, নারী ৩৩ শতাংশ, ‍উভয় অথবা কারণ অজানা ৩৩ শতাংশ।

তবে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) গবেষকরা এবার গুরুত্ব দিয়েছেন বন্ধ্যাত্ব নির্ণয়ের পর নারী-পুরুষের মানসিক অবস্থা ও দাম্পত্য সম্পর্কের ওপর। এতদিন মনে করা হত, বন্ধ্যাত্ব সমস্যার পর নারীরাই নানা সামাজিক প্রতিবন্ধকতা এবং মানসিক সমস্যায় পতিত হন। তবে বিএমইউর এক গবেষণায় দেখা গেছে, বন্ধ্যাত্ব নির্ণয়ের পর আক্রান্ত পুরুষদের ৩৭.৫ শতাংশই নানা যৌন সমস্যায় ভোগেন। এর মধ্যে উত্থানজনিত সমস্যা এবং দ্রুত বীর্যপাত সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া দাম্পত্য বোঝাপড়া ও সম্পর্কগত সমস্যার সম্মুখীনও বেশি হন তারা।

বিশেষ করে সন্তান ধারণে ব্যর্থতার অনুভূতি তাদের আত্মমর্যাদা, পুরুষত্ববোধ এবং সামাজিক পরিচয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা তাদের যৌন জীবন ও দাম্পত্য সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

আরও পড়ুন: এআই ব্যবহার করে টিকা উদ্ভাবন করলেন কেমব্রিজ গবেষকেরা

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ‘সেক্সুয়াল মেডিসিন’ জার্নালে এই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। যৌনস্বাস্থ্য, প্রজননস্বাস্থ্য এবং দাম্পত্য সম্পর্কবিষয়ক গবেষণার অন্যতম স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সাময়িকী এটি। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) মনোরোগবিদ্যা বিভাগের তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠানটির গাইনি ও ইনফার্টিলিটি বিভাগ এবং বারডেম উইমেন্স অ্যান্ড চিলড্রেন হাসপাতালের ইনফার্টিলিটি বিভাগের ৬৫৮ জন বন্ধ্যাত্বে আক্রান্ত ব্যক্তির ওপর এই গবেষণা পরিচালিত হয়। গবেষণার প্রধান গবেষক ছিলেন বিএমইউর মনোরোগবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শামসুল আহসান।

তথ্যমতে, গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৩২০ জন পুরুষ ও ৩৩৮ জন ছিলেন নারী। গবেষণাটিতে বন্ধ্যাত্বজনিত সমস্যার কারণে মানসিক স্বাস্থ্য, দাম্পত্য সম্পর্ক এবং যৌন জীবনের উপর প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়।

ছেলেদের যখন ডায়াগনোসিস হয়, তারপরে তাদের সেক্সুয়াল ফ্রিকোয়েন্সি কমে যায়। এর কারণ হচ্ছে তাদের ম্যারিটাল ডিসফাংশন বেড়ে যায়। তারা তখন মনে করে যে আমি তো সমাজের কাছে পিন পয়েন্টেড হয়ে গেলাম যে— আমি অক্ষম। এই অক্ষমতার কারণে দাম্পত্য জীবন এবং শারীরিক সম্পর্কে তাদের একটা অনীহা চলে আসে। তখন তাদের মধ্যে ভীতিটা বেড়ে যায়— ডা. মোহাম্মদ শামসুল আহসান, প্রধান গবেষক ও সহযোগী অধ্যাপক, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

গবেষণায় দেখা গেছে, নারীদের তুলনায় পুরুষ বন্ধ্যাত্ব রোগীরা যৌন সমস্যায় (সেক্সুয়াল ডিসফাংশন) উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি আক্রান্ত। প্রায় ৩৭.৫ শতাংশ পুরুষ (১২০ জন) কোনো না কোনো যৌন সমস্যায় ভুগছিলেন, যেখানে নারীদের মধ্যে যৌন সমস্যার হার ছিল ১৩.৯ শতাংশ। বিশেষ করে উত্থানজনিত সমস্যা (ইরেক্টাইল ডিসফাংশন) এবং দ্রুত বীর্যপাত (প্রি-ম্যাচিউর ইজ্যাকুলেশন) পুরুষদের মধ্যে নতুনভাবে দেখা দেওয়া প্রধান যৌন সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

দেখা গেছে, ৩৩.৭ শতাংশ পুরুষের উত্থানজনিত সমস্যা রয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগের সমস্যাই ছিল মৃদু, আর সামান্য কিছু মানুষের সমস্যা ছিল মাঝারি ধরনের। দ্রুত বীর্যপাতের সমস্যা পাওয়া গেছে ১৩.১% পুরুষের। এ ছাড়া ৯.৩৭ শতাংশ পুরুষের একই সাথে দুটি সমস্যাই পাওয়া গেছে।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, বন্ধ্যাত্ব নির্ণয়ের পর পুরুষরা নারীদের তুলনায় দাম্পত্য বোঝাপড়া ও সম্পর্কগত সমস্যার সম্মুখীন হন বেশি। সন্তান ধারণে ব্যর্থতার অনুভূতি পুরুষদের আত্মমর্যাদা, পুরুষত্ববোধ এবং সামাজিক পরিচয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যা পরবর্তীতে তাদের যৌন জীবন ও দাম্পত্য সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অন্যদিকে অনেক নারী বন্ধ্যাত্বের প্রেক্ষাপটে যৌন আকর্ষণের তুলনায় প্রজনন সক্ষমতাকে অধিক গুরুত্ব দিতে শুরু করেন, ফলে দাম্পত্য সম্পর্কে নতুন ধরনের চাপ ও দূরত্ব সৃষ্টি হতে পারে।

ইনফার্টিলিটি চিকিৎসা খুব ব্যয়বহুল (এক্সপেন্সিভ)। এজন্য যখন বন্ধাত্ব্যের চিকিৎসা করবেন, তখন তাদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং যৌন স্বাস্থ্যের দিকেও বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। সেক্ষেত্রে তাদের রেগুলার স্ক্রিনিং করা, তাদের কোনো ধরনের কোন সমস্যা আছে কিনা দেখা এবং তার উপযুক্ত চিকিৎসা করা জরুরি— ডা. মোহাম্মদ শামসুল আহসান, প্রধান গবেষক ও সহযোগী অধ্যাপক, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

এদিকে গবেষণায় অংশ নেওয়া পুরুষ এবং নারীদের বয়স ও পেশার মধ্যে বেশ বড় রকমের অমিল বা পার্থক্য দেখা গেছে। বন্ধ্যাত্ব সমস্যায় আক্রান্ত নারীদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি, অর্থাৎ ৬৬.৩% নারীর বয়সই ছিল ৩০ বছর বা তার কম। আক্রান্ত পুরুষদের বয়স কোনো একটি নির্দিষ্ট অংশে বেশি ছিল না, বরং বিভিন্ন বয়সী পুরুষের সংখ্যা সমানভাবে বিন্যস্ত বা ছড়ানো ছিল। তবে এর ৩৩.৮ শতাংশেরই বয়স ৩০ বছরের নিচে।

গবেষণায় নারীদের খুব কম বয়সে বিয়ে হওয়ার প্রবণতা বেশি এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রাথমিক বন্ধ্যাত্ব বা ‘প্রথম থেকেই সন্তান না হওয়ার’ সমস্যাটি বেশি দেখা গেছে। এর হার ৭৯.৭ শতাংশ। উল্লেখযোগ্য আরেকটি বিষয় হলো— স্ত্রীর বন্ধ্যাত্ব ধরা পড়লে দম্পতিদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্কের আগ্রহ বা হার ততটা কমে না, যতটা স্বামীর বন্ধ্যাত্ব ধরা পড়লে কমে যায়।

গবেষকরা বলছেন, বন্ধ্যাত্ব কেবল একটি প্রজননসংক্রান্ত সমস্যা নয়; এটি একটি জটিল মানসিক, সামাজিক ও দাম্পত্য সমস্যা। তাই সফল বন্ধ্যাত্ব ব্যবস্থাপনার জন্য প্রজনন চিকিৎসার পাশাপাশি যৌন চিকিৎসা (সেক্সুয়াল মেডিসিন) এবং কাউন্সেলিংকে সমন্বিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। এই সমন্বিত পদ্ধতি দম্পতিদের জীবনমান উন্নয়ন, দাম্পত্য সম্পর্কের স্থিতিশীলতা এবং চিকিৎসার সামগ্রিক সফলতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আরও পড়ুন: গরমে রক্তচাপ ওঠানামা: কারণ, নিয়ন্ত্রণ ও করণীয় জানালেন চিকিৎসক

এই গবেষণার প্রধান গবেষক ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শামসুল আহসান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, বন্ধ্যাত্বের পর মেয়েদের জন্য মেইন ইস্যুটা হয়ে যায় সন্তান ধারণ। স্বামী-স্ত্রীর যে পারস্পরিক ভালো লাগার অনুভূতি, তার থেকে মেয়েদের কাছে বেশি জরুরি হয়ে যায় কিভাবে সন্তান পাওয়া যায়। যে কারণে তাদের যৌন সমস্যাগুলো উপেক্ষিত থাকে। আর পুরুষদের ক্ষেত্রে পৌরুষের অহমিকা থাকে যে— আমি একটা পুরুষ, আমাকে স্বাবলম্বী হতে হবে, শক্তিশালী হতে হবে। এটা খুব আঘাত করতে থাকে। তখন তাদের মধ্যে যৌন সমস্যা বাড়ে, ম্যারিটাল এডজাস্টমেন্ট বা দাম্পত্য সম্পর্কে বোঝাপড়া করতেও সমস্যা হয়।

তিনি বলেন, আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, মহিলাদের বন্ধত্ব ডায়াগনোসিস হওয়ার আগে তাদের স্বামী-স্ত্রী মেলামেশার যে হার ছিল, ডায়াগনোসিস হওয়ার পরে এই হার বেড়ে যায়। তাদের সেক্সুয়াল ফ্রিকোয়েন্সি ছেলেদের তুলনায় বেড়ে যায়। কারণ সন্তান ধারণের তীব্র ইচ্ছা তাদের মধ্যে বাড়তে থাকে। একই সাথে ব্যর্থতার কারণে ডিপ্রেশন (বিষণ্ণতা), এনজাইটি (উদ্বেগ) এবং স্ট্রেস (চাপ) মেয়েদের বেশি হয়।

ডা. মোহাম্মদ শামসুল আহসান বলেন, ছেলেদের যখন ডায়াগনোসিস হয়, তারপরে তাদের সেক্সুয়াল ফ্রিকোয়েন্সি কমে যায়। এর কারণ হচ্ছে তাদের ম্যারিটাল ডিসফাংশন বেড়ে যায়। তারা তখন মনে করে যে আমি তো সমাজের কাছে পিন পয়েন্টেড হয়ে গেলাম যে— আমি অক্ষম। এই অক্ষমতার কারণে দাম্পত্য জীবন এবং শারীরিক সম্পর্কে তাদের একটা অনীহা চলে আসে। তখন তাদের মধ্যে ভীতিটা বেড়ে যায়।

আরও পড়ুন: বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট ও সেল থেরাপির খসড়া নীতিমালা দুই মাসের মধ্যে, প্রণয়নে কমিটি গঠন

এজন্য ইনফার্টিলিটি বা বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসার ক্ষেত্রে রোগীর মানসিক ও যৌন স্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্বারোপ করেন এই গবেষক। তিনি বলেন, ইনফার্টিলিটি চিকিৎসা খুব ব্যয়বহুল (এক্সপেন্সিভ)। এজন্য যখন বন্ধাত্ব্যের চিকিৎসা করবেন, তখন তাদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং যৌন স্বাস্থ্যের দিকেও বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। সেক্ষেত্রে তাদের রেগুলার স্ক্রিনিং করা, তাদের কোনো ধরনের কোন সমস্যা আছে কিনা দেখা এবং তার উপযুক্ত চিকিৎসা করা জরুরি।

উল্লেখ্য, এই গবেষণার সহ-গবেষক ছিলেন বিএমইউর গাইনি ও ইনফার্টিলিটি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফারজানা দীবা, বারডেম উইমেন্স অ্যান্ড চিলড্রেন হাসপাতালের ইনফার্টিলিটি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. নুসরাত মাহমুদ, বিএমইউর মনোরোগবিদ্যা বিভাগের ডা. লিউজা মুবাসসারা, ডা. সামিনা আক্তার, ডা. মো. আল-আমিন খান, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ডা. আহসান আজিজ সরকার এবং ইতালির ইউনিভার্সিটি অব রোম টর ভার্গাটার বন্ধ্যাত্ব গবেষক ড. আন্দ্রেয়া সানসোনে।