মায়ের পেটে গুলিবিদ্ধ শিশুর অস্ত্রোপচার করা সেই অধ্যাপককে সরিয়ে প্রধান হলেন ৮ ব্যাচ জুনিয়র ড্যাব নেতা
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের একটি ইউনিটের প্রধান পদে পদায়ন নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে ইউনিট প্রধান নির্ধারণ করা হয়ে থাকলেও এবার জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করেছে এই পদে বসানো হয়েছে ৮ ব্যাচ জুনিয়র এক কর্মকর্তাকে। পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটির মুখে গত ২৪ মে এক অফিস আদেশের মাধ্যমে এই ঘটনা ঘটেছে।
সরিয়ে দেওয়া ওই চিকিৎসক ১৭তম বিসিএসের কর্মকর্তা ও ইউনিট-৬ এর এতদিনের প্রধান অধ্যাপক ডা. শফিউর রহমান। ২০১৫ সালের ২৩ জুলাই মাগুরায় মায়ের পেটে গুলিবিদ্ধ শিশু সুরাইয়ার সফল অস্ত্রোপচার করে আলোচনায় আসেন তিনি। তাকে বাদ দিয়ে এই পদে বসানো হয়েছে সহযোগী অধ্যাপক ও বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-কন্টিনিউ মেডিকেল এডুকেশন সম্পাদক ডা. আহমেদ সামি-আল-হাসানকে। তিনি ২৫তম বিসিএসের কর্মকর্তা। মাত্র ২ মাস আগে সহকারী অধ্যাপক থেকে পদোন্নতি পেয়ে সহযোগী অধ্যাপক হয়েছেন তিনি।
বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) স্নাতকোত্তর চিকিৎসা বিজ্ঞান ও গবেষণা অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন হিসেবে কর্তব্যরত রয়েছেন তিনি। গত ৩১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে এই পদে নিয়োগ দেয়। ঢামেক চিকিৎসকদের অভিযোগ, এখানেও প্রায় সাত বছরের জ্যেষ্ঠ একজন অধ্যাপককে অতিক্রম করে দায়িত্ব লাভ করেছেন ডা. আহমেদ সামি-আল-হাসান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢামেক হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে মোট ৬টি ইউনিট রয়েছে। বিভাগে অধ্যাপক পদেও ৬ জনই কর্মরত রয়েছেন। এতদিন এই ৬ জন ইউনিটগুলোর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। অপর ৫ ইউনিট প্রধান হলেন, ইউনিট ১-এ বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সালমা সুলতানা, ইউনিট ২-এ অধ্যাপক ডা. ইমতিয়াজ ফারুক, ইউনিট ৩-এ অধ্যাপক ডা. সাদিয়া সাজমিন সিদ্দিকা, ইউনিট ৪-এ অধ্যাপক ডা. জাহাঙ্গীর হোসেন ভূঁইয়া ও ইউনিট ৫-এ অধ্যাপক ডা. নাদিম আহম্মদ।
গত ২৪ মে বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সালমা সুলতানা স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে বলা হয়, পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত ২৪ থেকে সহযোগী অধ্যাপক ডা. আহমেদ সামি-আল-হাসানকে ইউনিট ৬-এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করা হলো। একই সাথে অধ্যাপক ডা. মো. শফিউর রহমানকে সার্জারি ইউনিট-১ এ ন্যস্ত করা হলো।
ঢামেকের একাধিক জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, একসাথে কয়েকজন চিকিৎসক থাকলে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে ইউনিট প্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। কেউ নিজ থেকে দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানালে ভিন্ন কথা। এমনকি প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, জুনিয়র একজন দায়িত্ব পালনকালে সিনিয়র ইউনিটে যোগদান করলে সেই সিনিয়রই দায়িত্ব পাবেন। এটিই নিয়ম। এতদিন এভাবেই হয়ে আসছে।
আরও পড়ুন: আবারও স্ল্যাটশেমিংয়ের শিকার মাহমুদা মিতু, অভিযোগ বিএনপিপন্থী চিকিৎসকের বিরুদ্ধে
তারা বলছেন, এমনকি অফিস আদেশের ‘বিতরণ’ অংশেও অন্যান্য ইউনিট প্রধানদের বিতরণের ক্ষেত্রে শুধু ‘ইউনিট প্রধান’ না লিখে ‘অধ্যাপক ও ইউনিট প্রধান’ লেখা হয়েছে। কারণ সাধারণত অধ্যাপকদের কাছেই ইউনিট প্রধানের দায়িত্ব ন্যস্ত থাকে। এমন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা, অভিজ্ঞতা ও প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত নীতিমালা অনুসরণ করা উচিত। অন্যথায় এর প্রভাব বিভাগীয় কার্যক্রম ও কর্মপরিবেশের ওপর পড়তে পারে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন অধ্যাপক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, সিনিয়র নতুন আসলে জুনিয়র তাকে দায়িত্ব দিয়ে দেওয়ার কথা। এটিই নিয়ম। এতদিন এটিই হয়ে এসেছে। অথচ এখানে একজন সিনিয়র আগে থেকে আছেন। কোনো সুস্পষ্ট প্রশাসনিক কারণ বা গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা ছাড়াই এই দায়িত্ব পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অধ্যাপক শফিউর রহমানকে সরিয়ে তার থেকে অন্তত ৮ ব্যাচ জুনিয়রকে ইউনিটের দায়িত্ব দেওয়া ‘ফ্যাসিস্ট’ আচরণের অংশ।
তবে ভিন্ন কথাও বলছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের একটি অংশ। তারা বলছেন, ইউনিটটির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এর প্রধান হয়ে আসছেন একজন সহযোগী অধ্যাপক। এমনকি অধ্যাপক শফিউর রহমানও সহযোগী অধ্যাপক হিসেবেই ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ওই বছরের ৪ সেপ্টেম্বর তিনি অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পান।
আরও পড়ুন: বহিরাগত নিয়ে হলের তালা ভেঙে ৬ কক্ষ দখলের চেষ্টা বিএনপিপন্থীদের
এ বিষয়ে জানতে সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সালমা সুলতানার মুঠোফোনে দুদিনে বেশ কয়েকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে ক্ষুদেবার্তা পাঠালেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. আসাদুজ্জামান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানান, এটি মেডিকেল কলেজের বিষয়। এখানে পরিচালকের করণীয় কিছু নেই।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. মাজহারুল শাহীন দুপুরে একটি সভায় রয়েছেন জানিয়ে কল কেটে দেন। পরবর্তীতে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মুসাররাত সুলতানা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, তিনি একাডেমিক বিষয়গুলো দেখাশোনা করেন। এ বিষয়টি অধ্যক্ষের দপ্তরের।