গলায় খাবার বা মাংস আটকে গেলে যেভাবে বের করবেন
পবিত্র ঈদুল আজহায় কোরবানির মাংস খেতে গিয়ে হঠাৎ কেউ তীব্র কাশি শুরু করলেন, গলায় হাত দিয়ে শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছেন, চোখ-মুখ লাল হয়ে যাচ্ছে—এমন পরিস্থিতিকে সাধারণভাবে ‘বিষম খাওয়া’ বা ‘চোকিং’ বলা হয়। অনেক সময় এই ঘটনা প্রাণঘাতীও হয়ে উঠতে পারে। তাই গলায় খাবার বা অন্য কোনো বস্তু আটকে গেলে কী করতে হবে, তা জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসকদের মতে, খাওয়ার সময় তাড়াহুড়ো করা, বড় লোকমা খাওয়া বা খাবার ঠিকমতো চিবিয়ে না খাওয়ার কারণে গলায় খাবার আটকে যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই এ ধরনের ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। ১৯৬০ সালে ভারতের বিমানবাহিনীর প্রথম বাঙালি এয়ার মার্শাল সুব্রত মুখোপাধ্যায় জাপানের টোকিওর একটি রেস্তোরাঁয় খাওয়ার সময় গলায় খাবার আটকে মারা যান। একইভাবে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশও একবার গলায় খাবার আটকে প্রায় মৃত্যুর মুখে পৌঁছে গিয়েছিলেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শ্বাসনালিতে খাবার বা অন্য কোনো বস্তু আটকে গেলে ফুসফুসে অক্সিজেন সরবরাহ ব্যাহত হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এ অবস্থাকে বলা হয় ‘অ্যাসফিক্সিয়া’। শ্বাসনালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে হৃদ্যন্ত্র ও মস্তিষ্কে অক্সিজেন পৌঁছায় না এবং তারা কাজ করা বন্ধ করে দিতে পারে। এই সংকটজনক অবস্থাকে বলা হয় ‘অ্যানোক্সিয়া’। তাই গলায় খাবার আটকে যাওয়ার বিষয়টিকে কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।
আরও পড়ুন: ৬ নবজাতকের মৃত্যু: আদ-দ্বীন হাসপাতালে পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে নির্মাণ ক্রুটি মিলেছে
খাবার বা অন্য কোনো বস্তু শ্বাসনালিতে আটকে গেলে প্রথমেই শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। পাশাপাশি কাশি, বুকের ভেতরে শোঁ-শোঁ শব্দ, বমি বমি ভাব, কথা বলতে না পারা, ঠোঁট নীল হয়ে যাওয়া কিংবা জ্ঞান হারানোর মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, ৭ থেকে ১২ মিনিটের মধ্যে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু না হলে রোগীকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে
বয়স্ক ব্যক্তি ও ছোট শিশুদের গলার প্রতিক্রিয়াশীল ক্ষমতা তুলনামূলক কম থাকায় তাদের ক্ষেত্রে গলায় খাবার আটকে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। অতিরিক্ত মদ্যপানকারীদের ক্ষেত্রেও এমন সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এছাড়া পারকিনসনস রোগ, স্মৃতিভ্রংশজনিত রোগ কিংবা স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীদের খাবার গিলতে সমস্যা হওয়ায় তাদের মধ্যে চোকিংয়ের ঝুঁকি বেশি থাকে। পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীদের ক্ষেত্রেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে।
অনেক সময় বড় লোকমা খাওয়ার কারণে খাবার পুরোপুরি চিবানোর সুযোগ হয় না। ফলে বড় টুকরা খাবার গলায় আটকে যায়। আবার বাদামের মতো ছোট আকারের খাবারও সহজেই শ্বাসনালিতে প্রবেশ করে চোকিং সৃষ্টি করতে পারে।
খাবারের প্রতি মনোযোগের অভাবও এ সমস্যার অন্যতম কারণ। বিশেষ করে শিশুরা খাওয়ার সময় খেলাধুলা, দৌড়াদৌড়ি বা টেলিভিশন দেখলে ঝুঁকি বেড়ে যায়। একইভাবে খাওয়ার সময় অন্য কাজে ব্যস্ত থাকলেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে। ভাজাপোড়া শক্ত খাবার, চুইংগাম, ক্যান্ডি, বাদাম, পনির, পপকর্ন, মুদ্রা, কাঁচা সবজি ইত্যাদি থেকেও অসাবধানতাবশত চোকিং হতে পারে।
তাৎক্ষণিক করণীয়
গলায় খাবার আটকে গেলে অনেকেই পিঠে চাপড় দেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর চেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো ‘হেইমলিচ ম্যানিউভার’।
মার্কিন বক্ষশল্যবিদ হেনরি জে. হেইমলিচ ১৯৭৪ সালে এই পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। এটি এমন একটি জরুরি চিকিৎসা পদ্ধতি, যার মাধ্যমে শ্বাসনালিতে আটকে থাকা খাবার বা বস্তু বের করে রোগীর প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব।
এই পদ্ধতি প্রয়োগের জন্য আক্রান্ত ব্যক্তির পেছনে দাঁড়িয়ে তাকে জড়িয়ে ধরতে হবে। এরপর পেট ও পাঁজরের সংযোগস্থলের ঠিক নিচে দুই হাত রেখে ভেতরের দিকে এবং ওপরের দিকে জোরে চাপ দিতে হবে। এতে শ্বাসনালিতে আটকে থাকা বস্তু মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে।
যদি কোনো ব্যক্তিকে এমন অবস্থায় দেখা যায়, তাহলে দ্রুত এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা যেতে পারে। আটকে থাকা বস্তু বের না হওয়া পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে এবং একই সঙ্গে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স ডেকে নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
খুব ছোট শিশুর ক্ষেত্রে তাকে কোলে নিয়ে হাতের ওপর উপুড় করে শুইয়ে পিঠে চাপড় দিতে হবে। তবে এক বছরের কম বয়সী শিশু এবং গর্ভবতী নারীর ওপর কখনোই হেইমলিচ ম্যানিউভার প্রয়োগ করা যাবে না। তাদের ক্ষেত্রে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ ব্যবস্থা।
রোগীর জ্ঞান কমে যাচ্ছে কি না কিংবা হৃদ্যন্ত্র বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কি না, সেটিও পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। হৃদ্যন্ত্র বন্ধ হয়ে গেলে দ্রুত বুকে চাপ দেওয়ার মাধ্যমে জীবনরক্ষাকারী প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু করতে হবে।
যেভাবে প্রতিরোধ করবেন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাওয়ার সময় প্রতিটি খাবারের প্রতি পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া উচিত। ছোট ছোট গ্রাসে ধীরে ধীরে খাবার খেতে হবে এবং খাওয়ার সময় কথা বলা কমাতে হবে।
বাড়িতে দেড় থেকে দুই বছরের শিশু থাকলে তাদের নাগালের মধ্যে ছোট বস্তু রাখা উচিত নয়। শিশুদের খাওয়ানোর সময় তাড়াহুড়ো করা যাবে না এবং জোর করে মুখে খাবার গুঁজে দেওয়া থেকেও বিরত থাকতে হবে।
এছাড়া অসুস্থ ও বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাবার সরবরাহ ও খাওয়ানোর ব্যবস্থা করলে গলায় খাবার আটকে যাওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
ডিসক্লেমার: এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র জনসচেতনতার জন্য। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন বা নিকটস্থ হাসপাতালে যোগাযোগ করুন।