ক্যানসার নিয়ন্ত্রণে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে মূল ভিত্তি হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ
ক্যানসার প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা (প্রাইমারি হেলথকেয়ার) ব্যবস্থাকে মূল ভিত্তি ধরে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত। গতকাল শনিবার (১৭ মে) সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ হেলথ কো-অর্ডিনেশন ফোরামের উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে তিনি এই তথ্য জানান। ‘কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোতে ক্যানসার চিকিৎসা’ শীর্ষক এই বৈঠকে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধি, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং নীতি-নির্ধারকরা অংশ নেন।
বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য দেওয়ার সময় স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা (ইউএইচসি) নিশ্চিত করতে এবং একটি শক্তিশালী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বর্তমান সরকার প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে দেশের সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে ক্যানসার চিকিৎসা সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও জনবান্ধব করতে একে তৃণমূলের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর সঙ্গে একীভূত করা অপরিহার্য বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বক্তব্যে দেশের ক্যানসার পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী জানান, ২০২২ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক মানুষ এই মারণব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং ১ লাখ ১৬ হাজারের বেশি মানুষ ক্যানসারে প্রাণ হারাচ্ছেন। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার সুযোগের অভাব এবং মাত্রাতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে এই সংকট আরও প্রকট হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আরও পড়ুন: ইবোলার সংক্রমণ: বিশ্বে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করল ডব্লিউএইচও
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে ড. এম এ মুহিত বলেন, দেশীয় প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ‘জাতীয় ক্যানসার ব্যবস্থাপনা গাইডলাইন’ এবং ‘সমন্বিত এনসিডি (অসংক্রামক ব্যাধি) কৌশল’ প্রণয়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি তথ্যভিত্তিক সঠিক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার জন্য দেশের হাসপাতালগুলোতে ক্যানসার রেজিস্ট্রি বা তথ্যভাণ্ডার ক্রমান্বয়ে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
নারীদের জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিরোধে সরকারের বড় সাফল্যের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশজুড়ে লাখ লাখ কিশোরীকে লক্ষ্য করে বড় পরিসরে এইচপিভি (হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস) টিকাদান কর্মসূচি সফলভাবে চালু করা হয়েছে। এছাড়া জরায়ুমুখ, স্তন এবং মুখের ক্যানসার স্ক্রিনিং ও প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তের জন্য কমিউনিটিভিত্তিক বিভিন্ন উদ্যোগ আরও জোরদার করা হচ্ছে।
অবশ্য স্বাস্থ্য খাতের বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা ও অন্তরায়গুলোর কথাও অকপটে স্বীকার করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিশেষায়িত অবকাঠামোর ঘাটতি, দক্ষ জনবলের অভাব, অসমান সেবা বণ্টন এবং পকেট থেকে অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয়ের (আউট অব পকেট এক্সপেনডিচার) মতো বড় বড় চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। এই সমস্যা সমাধানে দেশের প্রধান শহরগুলোর বাইরে ক্যানসার চিকিৎসাকে বিকেন্দ্রীকরণ করা হচ্ছে এবং প্যাথলজি ও অনকোলজি খাতের সামগ্রিক উন্নয়নে কাজ চলছে।
পরিশেষে, ক্যানসার নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির জোর আহ্বান জানান বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের এই নেতা। তিনি বলেন, দক্ষ জনবল তৈরি, ক্যানসার গবেষণা, ডিজিটাল হেলথ এবং স্ক্রিনিং কার্যক্রম জোরদারে কমনওয়েলথ দেশগুলোর একসঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনে কমনওয়েলথ সদস্য রাষ্ট্র, উন্নয়ন সহযোগী ও সুশীল সমাজের সঙ্গে একযোগে কাজ করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি।