বয়স কি শুধুই সংখ্যা, নারী-পুরুষের সম্পর্ক নিয়ে নতুন গবেষণায় চমক
প্রথম দেখাতেই প্রেম হয়নি। জনপ্রিয় রিয়েলিটি-টিভি তারকা নিক ভিয়াল যখন ন্যাটালি জয়ের সঙ্গে প্রথম দেখা করেন, তখন তিনি সোজাসাপটা জানিয়ে দিয়েছিলেন, তাদের সম্পর্ক হওয়ার প্রশ্নই আসে না। কারণ, তাদের বয়সের পার্থক্য ১৮ বছর, যা প্রায় এক প্রজন্মের সমান। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলেছে অবস্থান।
২০২৪ সালে তারা বিয়ে করেন। এবার তারা একসঙ্গে হাজির হচ্ছেন নতুন একটি ডেটিং শোতে, যেখানে খতিয়ে দেখা হবে বয়স কি সত্যিই শুধু একটি সংখ্যা? পর্দার গল্প হলেও, বাস্তবের পরিসংখ্যান বলছে বয়সের ব্যবধান নিয়ে আমাদের সামাজিক উদ্বেগ অনেকটাই অতিরঞ্জিত।
বয়সে মিল-তবু পুরুষই সাধারণত বড়
গবেষণায় দেখা যায়, মানুষ সাধারণত নিজের বয়সের কাছাকাছি সঙ্গী বেছে নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি আটটি দম্পতির একটি প্রায় সমবয়সী, আর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ দম্পতির বয়সের পার্থক্য এক বছরের বেশি নয়। শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের সমবয়সী পরিবেশ এই প্রবণতাকে জোরদার করে। তবে বৈশ্বিকভাবে অধিকাংশ বিবাহে স্বামীই বয়সে বড়।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে স্বামী-স্ত্রীর গড় বয়সের ব্যবধান ৪ দশমিক ২ বছর, উত্তর আমেরিকায় ২ দশমিক ২ বছর, ইউরোপে ২ দশমিক ৭, এশিয়া-প্যাসিফিকে ৪ এবং সাব-সাহারান আফ্রিকায় সর্বোচ্চ ৮ দশমিক ৬ বছর। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায়ও একই প্রবণতা লক্ষণীয়-যদিও শহুরে মধ্যবিত্ত সমাজে বয়সের ফারাক ধীরে ধীরে কমছে।
বিবর্তন, অর্থনীতি ও সামাজিক বাস্তবতা
বয়সের ব্যবধানের পেছনে একটি বহুল আলোচিত ব্যাখ্যা হলো বিবর্তনবাদী তত্ত্ব। ধারণা করা হয়, পুরুষেরা তুলনামূলক কম বয়সী, প্রজননক্ষম সঙ্গী পছন্দ করেন; অন্যদিকে নারীরা এমন সঙ্গী চান যিনি আর্থিকভাবে স্থিতিশীল। যেহেতু নারীর উর্বরতা কম বয়সে বেশি এবং পুরুষেরা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সম্পদ অর্জন করেন, তাই সামান্য বয়সের ফারাক সন্তান জন্মদানে সহায়ক হতে পারে।
২০০৭ সালে ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, সুইডেনে যেসব দম্পতির স্বামী স্ত্রীর চেয়ে প্রায় পাঁচ বছর বড়, তাদের সন্তান সংখ্যা সমবয়সী দম্পতির তুলনায় ৫ শতাংশ বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের তথ্যেও একই প্রবণতা দেখা যায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দরিদ্র দেশে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় বয়সের ব্যবধান সেখানে বেশি হতে পারে।
কেবল জীববিজ্ঞান নয়, সামাজিক মানদণ্ডও বড় ভূমিকা রাখে। অনেকেই বয়সে অনেক বড় বা ছোট কাউকে পছন্দ করলেও সামাজিক সমালোচনার ভয়ে সমবয়সী সঙ্গী বেছে নেন। প্রশ্ন ওঠে- ২০ বছর ছোট কাউকে কি সহজে পরিবারের সামনে নেওয়া যায়? এই দ্বিধাই অনেক সম্পর্ককে আড়ালে রাখে।
সময়ের সঙ্গে বদল
বয়সের ব্যবধান যে কমছে, তা ইতিহাসই বলে। ১৯২০ সালে আমেরিকায় স্বামী গড়ে স্ত্রীর চেয়ে ৪ দশমিক ৫ বছর বড় ছিলেন। বর্তমানে তা নেমে এসেছে ২ দশমিক ২ বছরে। এক সময় উচ্চ আয়ের পুরুষদের তরুণী স্ত্রী`, যাদের ‘ট্রফি ওয়াইফ’ বলা হতো, এখন এতটাই বিরল যে পরিসংখ্যানে আলাদা করে ধরা পড়ে না।
আরও পড়ুন: এখনো নিজেদের সবচেয়ে আধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করেনি ইরান
চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনেও পরিবর্তন স্পষ্ট। ১৯৪০ থেকে ৫০-এর দশকে পর্দায় নায়ক-নায়িকার বয়সের ফারাক প্রায় ২০ বছর পর্যন্ত হতো। এখন গড়ে তা ছয় বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বরং সাম্প্রতিক সময়ে উল্টো চিত্রও দেখা যাচ্ছে বয়স্ক নারী ও তরুণ পুরুষের সম্পর্ককে সামনে আনা হচ্ছে, যা প্রচলিত ধারা ভাঙার ইঙ্গিত দেয়।
সম্পর্ক কি কম টেকসই?
সমাজে প্রচলিত ধারণা বয়সের বড় ব্যবধানে আগ্রহ, মূল্যবোধ ও জীবনদৃষ্টিতে অমিল দেখা দিতে পারে। ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে, বিশেষ করে বড় বয়সী সঙ্গী অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলে। অনেকে মনে করেন, ছোট সঙ্গী হয়তো আর্থিক নিরাপত্তা বা অভিভাবকসুলভ কাউকে খুঁজছেন।
কিন্তু গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। ২০০২ সালে মাস্ট্রিখট বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা যায়, বয়সের বড় ব্যবধান থাকা দম্পতিরা তুলনামূলক বেশি জীবনসন্তুষ্টি অনুভব করেন। ব্রিটেনের অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিসটিকস বয়সের পার্থক্য ও বিবাহবিচ্ছেদের মধ্যে শক্ত কোনো সম্পর্ক খুঁজে পায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের তথ্য বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, পাঁচ বছরের বয়সের ব্যবধান সম্পর্কের স্থায়িত্ব গড়ে আরও ছয় সপ্তাহ বাড়াতে পারে। অর্থাৎ বয়সের পার্থক্য সম্পর্কের স্থায়িত্ব নির্ধারণে প্রধান নিয়ামক নয়।
কিছু ঝুঁকি, তবে বিরল
ঝুঁকি একেবারেই নেই এমন নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, যখন পুরুষ সঙ্গী নারী থেকে অন্তত ১৬ বছর বড় (বা নারী সঙ্গী পুরুষ থেকে অন্তত ১০ বছর বড়), তখন অন্তরঙ্গ সঙ্গী-হত্যার ঘটনা কিছুটা বেশি দেখা যায়। যদিও এমন ঘটনা সামগ্রিকভাবে বিরল এবং অধিকাংশ সম্পর্কেই বয়স নয়, বরং ব্যক্তিত্ব, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও যোগাযোগের মানই বড় ভূমিকা রাখে।
সম্পর্কের সাফল্য নির্ভর করে বোঝাপড়া, মূল্যবোধের মিল, আবেগগত পরিপক্বতা ও পারস্পরিক সম্মানের ওপর। দুই বছরের ফারাক হোক বা ১০ বছরের, শুধু বয়স দিয়ে সম্পর্কের অবস্থা বিচার করা কঠিন।
সমাজের চোখে বয়সের পার্থক্য হয়তো এখনও আলোচনার বিষয়। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে বয়সের ব্যবধান নিজে থেকে সম্পর্ককে দুর্বল করে না। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ শিখছে, ভালোবাসা ও সামঞ্জস্যের কাছে বয়স অনেক সময়ই গৌণ হয়ে যায়। খবর: ইকোনমিস্ট.কম।