০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৩২

খাওয়াতে বা কাঁদলেই শিশুর হাতে স্মার্টফোন, অজান্তেই যেসব ঝুঁকিতে ফেলছেন আদরের সন্তানকে

শিশুর হাতে স্মার্টফোন দিলে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে  © সংগৃহীত

সন্তানকে খাওয়ানো কিংবা কান্না করলে শান্ত রাখতে অনেক মা-বাবা তার হাতে তুলে দেন স্মার্টফোন। কখনো কার্টুন, কখনো গেম, আবার কখনো ইউটিউবের ভিডিও- এভাবেই শিশুর প্রতিদিনের জীবনের অংশ হয়ে উঠছে মোবাইল ফোনের পর্দা। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে কাছ থেকে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার অভ্যাস শিশুর চোখের ওপর কী প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে কি সচেতন অভিভাবকেরা?

চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, দীর্ঘ সময় ডিজিটাল পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখে সাময়িক অস্বস্তি, শুষ্কতা, ঝাপসা দেখা ও মাথাব্যথার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি শিশুদের দূরের দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ার সমস্যা বা মায়োপিয়ার সঙ্গেও দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহারের সম্পর্ক পাওয়া গেছে বিভিন্ন গবেষণায়।

দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকলে কী হয়?
যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব অফথ্যালমোলজি (এএও) বলছে, দীর্ঘ সময় মোবাইল, কম্পিউটার কিংবা অন্য কোনো ডিজিটাল পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখের স্বাভাবিক পলক ফেলার হার কমে যায়। ফলে চোখের আর্দ্রতা কমে গিয়ে শুষ্কতা, চুলকানি, জ্বালাপোড়া, ঝাপসা দেখা এবং মাথাব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

বাড়তে পারে দূরের দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ার ঝুঁকি
শিশুদের চোখের অন্যতম সমস্যা মায়োপিয়া। এ সমস্যায় কাছের বস্তু স্পষ্ট দেখা গেলেও দূরের বস্তু ঝাপসা দেখায়। সাধারণত চোখের আকার স্বাভাবিকের তুলনায় সামনের-পেছনের দিকে বেশি লম্বা হয়ে গেলে কিংবা চোখের কর্নিয়ার বাঁক বেশি হলে এমনটি ঘটে।

গত বছর জামা নেটওয়ার্ক ওপেন-এ প্রকাশিত একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও মেটা-বিশ্লেষণে ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে মায়োপিয়ার সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, প্রতিদিন ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহারের সময় এক ঘণ্টা বাড়ার সঙ্গে মায়োপিয়ার সম্ভাবনা ২১ শতাংশ বেশি থাকার সম্পর্ক রয়েছে।

যদিও গবেষকেরা এটিকে সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেননি। ফলে স্মার্টফোন ব্যবহারই যে সরাসরি মায়োপিয়ার কারণ, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। বরং দীর্ঘ সময় কাছের বস্তুতে মনোযোগ দেওয়া এবং বাইরে কম সময় কাটানোর মতো বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখতে হবে।

স্মার্টফোন বাদ দিয়ে খেলাধুলায় মনোযোগী কেন জরুরি
শিশুর চোখের স্বাভাবিক বিকাশে বাইরের পরিবেশে সময় কাটানো গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে, বাইরে বেশি সময় কাটানো শিশুদের মায়োপিয়া হওয়ার ঝুঁকি কম থাকতে পারে। আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব অফথ্যালমোলজির তথ্য অনুযায়ী, শুধু ডিজিটাল পর্দা নয়, দীর্ঘ সময় বই পড়া কিংবা ঘরের ভেতরে কাছের কাজে ব্যস্ত থাকাও চোখের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। তাই শিশুর দৈনন্দিন জীবনে ঘরের বাইরের খেলাধুলা ও শারীরিক কার্যক্রমের সুযোগ রাখা প্রয়োজন।

কোন বয়সে কতক্ষণ স্ক্রিন ব্যবহার করা উচিত?
শিশুদের স্ক্রিন ব্যবহারের বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বয়সভিত্তিক নির্দেশনা দিয়েছে। সংস্থাটির ২০১৯ সালের নির্দেশিকা অনুযায়ী—এক বছরের কম বয়সী শিশুর জন্য স্ক্রিনভিত্তিক বসে থাকার সময় সুপারিশ করা হয়নি। এক বছর বয়সী শিশুর জন্যও স্ক্রিন দেখা সুপারিশ করা হয়নি।

দুই বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে দিনে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা স্ক্রিন ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। এর চেয়ে কম হলে ভালো। তিন থেকে চার বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রেও দিনে এক ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব পেডিয়াট্রিকসের নির্দেশনায় ১৮ থেকে ২৪ মাসের কম বয়সী শিশুদের ভিডিও কল ছাড়া ডিজিটাল মিডিয়া ব্যবহার এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে। দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জন্য দিনে এক ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহার না করার পরামর্শ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষামূলক ও মানসম্মত কনটেন্ট বেছে নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

চোখের সুরক্ষায় অভিভাবকদের করণীয়
শিশুর চোখের সুরক্ষায় প্রথমেই প্রয়োজন স্ক্রিন ব্যবহারের সময় নিয়ন্ত্রণ করা। শিশুকে দীর্ঘ সময় একটানা মোবাইল দেখতে না দিয়ে মাঝেমধ্যে বিরতি দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এ ছাড়া কয়েকটি বিষয় মেনে চলা যেতে পারে।

১. নিয়মিত বিরতি: দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহারের পরিবর্তে নির্দিষ্ট বিরতি দিতে হবে। প্রতি ২০ মিনিট পর অন্তত ২০ সেকেন্ডের জন্য প্রায় ২০ ফুট দূরের কোনো বস্তুর দিকে তাকাতে উৎসাহিত করতে হবে।

২. যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রাখা: স্মার্টফোন বা অন্য ডিভাইস শিশুর চোখের একেবারে কাছে রাখা উচিত নয়। সম্ভব হলে হাতের দৈর্ঘ্য পরিমাণ দূরত্ব বজায় রেখে বড় পর্দার ডিভাইস ব্যবহার করতে হবে।

আরও খবর: অন্ধকার হলেই ভূতের ভয় কি শুধু মনেই, আতঙ্কে শরীরে কী কী পরিবর্তন ঘটে?

৩. বাইরে খেলাধুলার সুযোগ: প্রতিদিন শিশুকে বাইরে খেলাধুলা ও শারীরিক কার্যক্রমের সুযোগ দিতে হবে। এতে স্ক্রিনের সামনে কাটানো সময় কমানোর পাশাপাশি চোখের স্বাস্থ্যের জন্যও উপকার পাওয়া যেতে পারে।

৪. ঘুমের আগে স্ক্রিন বন্ধ: ঘুমানোর আগে স্মার্টফোন বা ট্যাবলেট ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে হবে। বিশেষ করে রাতে দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকলে ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত হতে পারে।

৫. চোখের অস্বস্তি উপেক্ষা নয়: শিশু বারবার চোখ কচলালে, চোখে ব্যথা বা মাথাব্যথার কথা বললে কিংবা দূরের বস্তু দেখতে অসুবিধা হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। প্রয়োজনে চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।

কখন চক্ষুবিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেবেন
শিশু বারবার চোখ কচলালে, চোখের খুব কাছে বই বা মোবাইল ধরলে, দূরের লেখা দেখতে অসুবিধা হলে, ঘন ঘন মাথাব্যথা হলে কিংবা চোখ ট্যারা করে তাকালে চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে পূর্ণাঙ্গ চক্ষু পরীক্ষার মাধ্যমে শিশুর হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়ার আগে তার বয়স, প্রয়োজন এবং ব্যবহারের সময় বিবেচনা করা জরুরি। 

প্রযুক্তি থেকে শিশুদের পুরোপুরি দূরে রাখা সম্ভব না হলেও এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা অভিভাবকদের দায়িত্ব। মনে রাখতে হবে, শিশুর সুস্থ শৈশবের জন্য স্মার্টফোনের পর্দার চেয়ে খেলাধুলা, ঘুম, পরিবার ও প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।