শিশুদের দাঁতে পোকা বা ক্যাভিটি রোধে যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে
শিশুদের দাঁতে পোকা বা ক্যাভিটি হওয়া খুবই সাধারণ একটি সমস্যা। দাঁতে কালচে দাগ, ছোট গর্ত, দাঁতের সংবেদনশীলতা কিংবা খাবার খাওয়ার সময় ব্যথা এসব লক্ষণ দেখা দিলে অনেক অভিভাবক বিষয়টিকে সাময়িক সমস্যা মনে করে গুরুত্ব দেন না। অথচ সময়মতো যত্ন না নিলে দাঁতের ক্ষয় বাড়তে পারে এবং শিশুর খাওয়া, ঘুম ও দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে।
শিশুদের দাঁতের ক্যাভিটি মূলত দাঁতের ওপর থাকা জীবাণু, খাবারের চিনি ও মুখের ভেতরের পরিবেশের পারস্পরিক ক্রিয়ার ফলে তৈরি হয়। মুখের ব্যাকটেরিয়া খাবারের চিনি ও শর্করা ভেঙে অ্যাসিড তৈরি করে। এই অ্যাসিড বারবার দাঁতের সংস্পর্শে এলে ধীরে ধীরে দাঁতের শক্ত আবরণ ক্ষয় হতে থাকে। একপর্যায়ে দাঁতে গর্ত তৈরি হয়, যাকে সাধারণভাবে ক্যাভিটি বা দাঁতে পোকা বলা হয়।
শিশুদের দাঁত সুস্থ রাখতে তাই ছোটবেলা থেকেই নিয়মিত পরিচর্যার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। শুধু দাঁত ব্রাশ করলেই হবে না, শিশুর খাবারের অভ্যাস, ব্রাশ করার পদ্ধতি এবং নিয়মিত দাঁতের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার বিষয়েও অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে।
দাঁত ওঠার পর থেকেই পরিচর্যা
শিশুর মুখে প্রথম দাঁত ওঠার পর থেকেই দাঁতের যত্ন শুরু করা উচিত। দাঁত ওঠার আগে পরিষ্কার নরম কাপড় বা গজ দিয়ে শিশুর মাড়ি আলতোভাবে পরিষ্কার করা যেতে পারে। দাঁত ওঠার পর বয়স উপযোগী নরম ব্রাশ দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করার অভ্যাস করাতে হবে।
শিশু নিজে ব্রাশ করতে শিখলেও শুরুতে অভিভাবকের সহযোগিতা প্রয়োজন। কারণ ছোট শিশুরা সাধারণত দাঁতের সব অংশ ভালোভাবে পরিষ্কার করতে পারে না। তাই শিশুকে ব্রাশ করতে দেওয়ার পাশাপাশি অভিভাবকেরও নিশ্চিত করা উচিত যে দাঁতের সব অংশ ঠিকভাবে পরিষ্কার হয়েছে।
দিনে দুইবার দাঁত ব্রাশ
শিশুর দাঁত পরিষ্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাসগুলোর একটি হলো নিয়মিত ব্রাশ করা। সকালে নাশতার পর এবং রাতে ঘুমানোর আগে দাঁত ব্রাশ করার অভ্যাস করানো ভালো। বিশেষ করে রাতে দাঁত ব্রাশ করার পর আর মিষ্টি বা চিনিযুক্ত খাবার খাওয়া উচিত নয়। ঘুমের সময় মুখে খাবারের অবশিষ্টাংশ থাকলে দাঁতের ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্ট ব্যবহার
শিশুর বয়স অনুযায়ী উপযুক্ত পরিমাণ ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্ট ব্যবহার করা দাঁতের ক্ষয় প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে টুথপেস্টের পরিমাণ ও ব্যবহারের পদ্ধতি শিশুর বয়স অনুযায়ী হওয়া উচিত। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে বেশি পরিমাণ টুথপেস্ট ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই। অভিভাবকের উচিত শিশুকে টুথপেস্ট গিলে না ফেলার বিষয়টি শেখানো এবং ব্রাশ করার সময় নজর রাখা।
মিষ্টি ও চিনিযুক্ত খাবার কমাতে হবে
শিশুদের দাঁতে ক্যাভিটি হওয়ার অন্যতম বড় ঝুঁকি হলো অতিরিক্ত মিষ্টি ও চিনিযুক্ত খাবার। চকলেট, ক্যান্ডি, মিষ্টি, বিস্কুট, কেক, মিষ্টি পানীয়সহ বিভিন্ন খাবারে থাকা চিনি দাঁতের ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তবে শুধু কতটা চিনি খাচ্ছে সেটিই নয়, দিনে কতবার এসব খাবার খাচ্ছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বারবার অল্প অল্প করে মিষ্টি বা চিনিযুক্ত খাবার খেলে দাঁত দীর্ঘ সময় অ্যাসিডের সংস্পর্শে থাকতে পারে। তাই শিশুকে ঘন ঘন মিষ্টি খাবার দেওয়ার অভ্যাস এড়িয়ে চলা উচিত।
বোতলে দুধ বা মিষ্টি পানীয় দিয়ে ঘুম পাড়ানো ঠিক নয়
অনেক অভিভাবক শিশুকে দুধের বোতল বা মিষ্টি পানীয় দিয়ে ঘুম পাড়ান। বিশেষ করে বোতল মুখে নিয়ে দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে পড়লে দাঁতের ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে। ঘুমানোর আগে শিশুর দাঁত পরিষ্কার করে দেওয়ার অভ্যাস করা জরুরি। বোতলে করে দুধ বা অন্য কোনো পানীয় দেওয়ার পর শিশুর দাঁত ও মুখ পরিষ্কার রাখার দিকেও নজর দিতে হবে।
খাবারের পর পানি খাওয়ার অভ্যাস
মিষ্টি বা খাবার খাওয়ার পর পানি পান করার অভ্যাস শিশুর মুখ পরিষ্কার রাখতে সহায়ক হতে পারে। এতে মুখে লেগে থাকা খাবারের কিছু অংশ দূর হয় এবং মুখের ভেতরের পরিবেশও স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। তবে পানি পান করা কখনোই দাঁত ব্রাশের বিকল্প নয়। নিয়মিত ব্রাশ করার অভ্যাস বজায় রাখতে হবে।
দাঁতের ফাঁক পরিষ্কার করাও জরুরি
শিশুর দাঁত পাশাপাশি ঘনভাবে থাকলে শুধু ব্রাশ দিয়ে দাঁতের মাঝের অংশ পুরোপুরি পরিষ্কার করা কঠিন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে বয়স ও দাঁতের অবস্থার ভিত্তিতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফ্লস বা দাঁতের ফাঁক পরিষ্কারের উপযুক্ত পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। দাঁতের মাঝখানে খাবার আটকে থাকলে সেখানে জীবাণুর কার্যক্রম বাড়তে পারে এবং ক্যাভিটি হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে।
শিশুর দাঁতেও নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন
অনেক অভিভাবকের ধারণা, দুধ দাঁত তো পরে পড়ে যাবে, তাই এতে ক্যাভিটি হলেও চিকিৎসার প্রয়োজন নেই। এই ধারণা ঠিক নয়। দুধ দাঁত শিশুর খাওয়া, কথা বলা এবং স্থায়ী দাঁতের স্বাভাবিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই শিশুর দাঁতে ব্যথা, কালো বা বাদামি দাগ, গর্ত, ঠান্ডা-গরমে সংবেদনশীলতা, মাড়ি ফুলে যাওয়া কিংবা মুখ থেকে দুর্গন্ধের মতো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত দন্ত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
আরও দেখুন: একসঙ্গে ১৭ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠাল বিএসইসি
নিয়মিত দাঁতের পরীক্ষা করানো ভালো
শিশুর দাঁতে কোনো সমস্যা দেখা দেওয়ার অপেক্ষা না করে নিয়মিত দাঁতের পরীক্ষা করানোর অভ্যাস গড়ে তোলা ভালো। এতে ক্যাভিটি বা দাঁতের অন্য কোনো সমস্যা শুরুতেই শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। বিশেষ করে যেসব শিশুর মিষ্টি খাওয়ার প্রবণতা বেশি, দাঁত ঘনভাবে অবস্থান করে বা আগে থেকেই দাঁতের ক্ষয়ের ইতিহাস রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত পরীক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ।
অভিভাবকদের যা মনে রাখা দরকার
শিশুর দাঁতের যত্ন শুধু শিশুর দায়িত্ব নয়। ছোট বয়সে দাঁত ব্রাশ করা, টুথপেস্টের সঠিক ব্যবহার এবং খাবারের পরিমাণ ও সময় নিয়ন্ত্রণে অভিভাবকের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। শিশুকে ভয় দেখিয়ে নয়, বরং খেলাচ্ছলে দাঁত ব্রাশের অভ্যাস করানো হলে সে সহজে নিয়মটি মেনে চলতে পারে।
দাঁতে ইতোমধ্যে গর্ত তৈরি হয়ে গেলে শুধু নিয়মিত ব্রাশ করলেই সেটি আগের অবস্থায় ফিরে আসে না। তাই ক্যাভিটির লক্ষণ দেখা দিলে ঘরোয়া উপায়ে সময় নষ্ট না করে দন্ত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ। নিয়মিত পরিচর্যা, চিনিযুক্ত খাবার সীমিত রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ এই তিনটি বিষয় মেনে চললে শিশুদের দাঁতের ক্ষয় অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব।