০৩ জুন ২০২৬, ০৯:২৪

সন্তানকে মানসিকভাবে শক্তিশালী করতে ছোট থেকেই গড়তে হবে যে ৭ অভ্যাস

শিশুর স্বাভাবিক বিকাশে বাবা-মায়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে  © এআই সৃষ্ট ছবি

বাবা-মার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার সন্তান। জন্মের পর তাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব সন্তানকে আদর্শবান হিসেবে গড়ে তোলা। এজন্য তার ভালো স্কুল, ভালো পোশাক কিংবা নিরাপত্তার কথা যতটা চিন্তা থাকে, তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত তাদের মানসিক বিকাশ। কারণ জীবনের প্রতিটি ধাপে মানুষকে নানা ধরনের চাপ, হতাশা, ব্যর্থতা এবং অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হয়। 

এসব পরিস্থিতিতে যে শিশু নিজেকে সামলে নিতে শেখে, নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং সমস্যা থেকে পালিয়ে না গিয়ে সমাধানের পথ খোঁজে, সেই শিশুই বড় হয়ে মানসিকভাবে শক্তিশালী মানুষে পরিণত হয়। আমরা বহু মানুষকে হতাশ হয়ে আত্মহত্যার পথ বেঁচে নিতে দেখি। একজন সন্তান মানসিকভাবে শক্তিশালী হলে সে এসব কাজ থেকে বিরত থাকবে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, মানসিক দৃঢ়তা বা রেজিলিয়েন্স জন্মগত কোনো গুণ নয়। এটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে পরিবার, পরিবেশ, অভিজ্ঞতা এবং অভিভাবকের সঠিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে। দ্য প্যারেন্টজ.এআই (TheParentZ.ai)-এর নিউট্রিশনিস্ট ও মেন্টাল হেলথ কোচ কিরণ মীনা শিশুদের মানসিকভাবে শক্তিশালী করে তুলতে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাসের কথা বলেছেন।

১. আবেগ চিনতে ও প্রকাশ করতে শেখান
রাগ, ভয়, দুঃখ, হতাশা, উদ্বেগ কিংবা আনন্দ সবই মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি। কিন্তু অনেক শিশুই নিজের অনুভূতির নাম জানে না, ফলে তারা কী অনুভব করছে সেটাও প্রকাশ করতে পারে না। অভিভাবকদের উচিত ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে বিভিন্ন আবেগ সম্পর্কে জানানো এবং সেগুলো প্রকাশ করার জন্য উৎসাহ দেওয়া। 

শিশু যদি বলতে শেখে, ‘আমি কষ্ট পেয়েছি’, ‘আমি ভয় পাচ্ছি’ বা ‘আমি রেগে আছি’, তাহলে তার মানসিক চাপ অনেকটাই কমে যায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আবেগ চেপে রাখার প্রবণতা ভবিষ্যতে উদ্বেগ, হতাশা এবং আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি তৈরি করতে পারে।

২. কঠিন পরিস্থিতিতে নিজেকে শান্ত রাখতে শেখান
অনুভূতি প্রকাশের পাশাপাশি আবেগ নিয়ন্ত্রণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সমস্যা হলেই কান্নাকাটি, চিৎকার বা ভেঙে পড়ার পরিবর্তে কীভাবে নিজেকে সামলে নিতে হয়, তা শিশুদের শেখাতে হবে। এই শিক্ষা মুখে বলে যতটা দেওয়া যায়, তার চেয়ে বেশি শেখে তারা অভিভাবকদের আচরণ দেখে। 

তাই দৈনন্দিন জীবনের চাপ, কর্মব্যস্ততা বা পারিবারিক সমস্যার সময় আপনি কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন, সেদিকে খেয়াল রাখুন। মনে রাখবেন, সন্তান আপনার কথা যতটা শোনে, তার চেয়েও বেশি অনুসরণ করে আপনার আচরণ।

৩. সমস্যার সমাধান খুঁজতে উৎসাহ দিন
অনেক সময় সন্তানকে অতিরিক্ত সুরক্ষা দিতে গিয়ে অভিভাবকেরা তার সব সমস্যার সমাধান নিজেরাই করে দেন। কিন্তু এতে শিশুর আত্মনির্ভরশীলতা কমে যায়। বয়স অনুযায়ী ছোটখাটো দায়িত্ব দিন। কোনো সমস্যায় পড়লে সঙ্গে সঙ্গে সমাধান না বলে বরং জিজ্ঞেস করুন, ‘তোমার কী মনে হয়, এটা কীভাবে সমাধান করা যায়?’ এভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাস গড়ে উঠলে শিশু আত্মবিশ্বাসী হয় এবং ভবিষ্যতে জটিল পরিস্থিতিতেও বিচলিত না হয়ে সমাধানের পথ খুঁজতে শেখে।

৪. ব্যর্থতাকে শিক্ষা হিসেবে শেখান
জীবনে সব সময় জয় আসবে না। পরীক্ষায় কম নম্বর, খেলায় হার, কাঙ্ক্ষিত কিছু না পাওয়া এসবই জীবনের অংশ। অনেক অভিভাবক সন্তানের ব্যর্থতাকে ব্যক্তিগত অপমান হিসেবে নেন কিংবা অতিরিক্ত সমালোচনা করেন। এতে শিশুর আত্মবিশ্বাস নষ্ট হতে পারে। বরং তাকে বোঝান, ব্যর্থতা মানেই শেষ নয়। বরং প্রতিটি ব্যর্থতা নতুন কিছু শেখার সুযোগ। যে শিশু ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিতে শেখে, সে ভবিষ্যতে বড় চ্যালেঞ্জের মুখেও সহজে ভেঙে পড়ে না।

৫. নিয়মিত রুটিনের অভ্যাস গড়ে তুলুন
খাওয়া, ঘুম, পড়াশোনা, খেলাধুলা এবং স্ক্রিন ব্যবহারের জন্য একটি সুষম রুটিন শিশুর মানসিক স্থিতিশীলতা বাড়ায়। তবে রুটিন মানেই কঠোর নিয়ম নয়। মাঝে মাঝে ছোটখাটো পরিবর্তনের সুযোগও রাখতে হবে। কারণ বাস্তব জীবন সব সময় পরিকল্পনা অনুযায়ী চলে না। নিয়মের মধ্যে থেকে পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার অভ্যাস শিশুকে নমনীয় ও অভিযোজনক্ষম করে তোলে, যা মানসিক দৃঢ়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

৬. মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি গুরুত্ব দিন
সন্তানের শারীরিক সুস্থতার মতো মানসিক সুস্থতার দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত শরীরচর্চা মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। পাশাপাশি সন্তানের মনের খবর নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

আরও পড়ুন: আদালতে রামিসা হত্যার নৃশংসতা বর্ণনা করতেই কেঁদে ফেলেন পুলিশ কর্মকর্তা

স্কুলে কী হয়েছে, বন্ধুর সঙ্গে সম্পর্ক কেমন, কোনো বিষয়ে মন খারাপ কি না এসব নিয়ে নিয়মিত কথা বলুন। সন্তান যেন বুঝতে পারে, তার অনুভূতিগুলো গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজন হলে সে আপনার কাছে নির্ভয়ে আসতে পারে।

৭. সন্তানের পাশে থাকুন, শুধু নিয়ন্ত্রণ করবেন না
শুধু শাসন, বকাঝকা কিংবা সব সময় নির্দেশনা দিয়ে সন্তানকে বড় করা যায় না। একজন শিশুর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার নিরাপদ সম্পর্ক। সন্তানকে বোঝান, ভুল করলে আপনি তাকে শাসন করতে পারেন, কিন্তু তাকে ছেড়ে যাবেন না। তার কথা মন দিয়ে শুনুন, মতামতকে গুরুত্ব দিন এবং প্রয়োজনের সময় পাশে থাকুন।

এ ছাড়া শিশুর মানসিক বিকাশে খেলাধুলা এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর গুরুত্বও অপরিসীম। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাবা-মায়ের সঙ্গে নিয়মিত খেলাধুলা ও ইতিবাচক সময় কাটানো শিশুদের উদ্বেগ, বিষণ্নতা, আক্রমণাত্মক আচরণ এবং ঘুমের সমস্যার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। খেলাধুলা শিশুদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা গড়ে তোলে এবং কঠিন আবেগগুলো প্রকাশ করার সুযোগ তৈরি করে। (সূত্র: এই সময়)